সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ার ডাক দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষকরা। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ঠেকাতে গতকাল সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এক সংহতি সমাবেশে তারা এই আহ্বান জানান। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলার ঘটনার প্রতিবাদে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, সাম্প্রদায়িক হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, কারা তাদের পরিচর্যা করছে সে সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ নই। পরিচর্যা পেয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যু তুলে আক্রমণ করেছে। হিন্দুদের উপর হামলার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। হিন্দুরা এদেশ ছেড়ে চলে গেলে বাংলাদেশ হবে পাকিস্তান আদলের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। কিন্তু ঐক্যবদ্ধভাবে এ চেষ্টা বানচাল করতে হবে। গতকালের সমাবেশের ধারাবাহিকতায় আগামী ২৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সুধী সমাবেশ আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্র সংখ্যালঘুদের যথাযথ নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ বজায় রেখে সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ করা সম্ভব নয়। সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক কেএম সা’দ উদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত সাম্প্রদায়িক হামলা চালিয়েছিল। আমরা তখন অস্ত্রহাতে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। তারা এখন যে হামলা চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে এই ৭৭ বছর বয়সেও প্রয়োজনে অস্ত্র কাঁধে নেব। সংহতি সমাবেশে আসা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ বলেন, জাতীয় ঐক্য এবং মুক্তির পথ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা ও হামলার কারণে। সমাবেশের তিনটি পর্বে শিক্ষকদের পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্তে সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিরোধকারীরা বক্তব্য দেন।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, ৫০ বছর পর আমাদের আগামী প্রজন্ম এ কথা শুনে হাসবে যে, এ দেশে এক সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ছিল। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে মানবাধিকার রক্ষা করা হচ্ছে না বলে যেসব মানবাধিকার সংগঠন প্রশ্ন তুলছেন, তারা কেন সাম্প্রতিক হামলার অমানবিকতা ও মানবাধিকার লংঘন বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন না।
সমাবেশের ঘোষণাপত্রে সরকার ও জনগণের উদ্দেশ্যে বলা হয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলাকারীদের প্রতিহত করুন। এদের চিহ্নিত করুন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে সোপর্দ করুন, আইনী প্রক্রিয়ায় এদের বিচার করুন। এদের সামাজিকভাবে বয়কট করুন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের যেসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে সেগুলো পুনরায় নির্মাণের জন্য সরকার ও সকল বিবেকবান মানুষ এগিয়ে আসুন। সাম্প্রদায়িক আক্রমণ প্রতিরোধে গ্রামগঞ্জে, হাটে-বাজারে, পাড়া-মহল্লায়, নগরে-বন্দরে স্থানীয় উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির নেতৃত্বে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলুন। ১৯৭১ সালে যেসব চিহ্নিত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সংগঠন মানবতা বিরোধী অপরাধ করেছে তাদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করুন। শিশু-কিশোরদের স্বাধীনতা বিরোধীদের হাত থেকে নিরাপদে রাখুন। প্রশাসনের ভেতরে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক কেউ থাকলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশের সঞ্চালনায় সমাবেশের প্রথম পর্বে বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্ত ও প্রতিরোধকারীদের মধ্যে বক্তব্য দেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কাজী নূর মোহাম্মদ, বগুড়ার ধুনটের মেয়র এজিএম বাদশা, নোয়াখালীর রাজগঞ্জের মোজাম্মেল হোসেন, সাতক্ষীরায় নিহত ছাত্রলীগ নেতা মামুনের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস তিন্নি, গাইবান্ধার কলেজ শিক্ষক সুনীল কুমার বর্মণ, সাতক্ষীরার মোস্তফা লুত্ফুল্লাহ, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের বিমল কান্তি দাস ও গাইবান্ধার হাফিজা বেগম কাকলী।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মীজানুর রহমান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউআইটিএস’র ভিসি অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর উদ্দিন খান মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এম অহিদুজ্জামান, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক আবম ফারুক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী।
