বীর মুক্তিযোদ্ধা অনাঃ ক্যাপ্টেন (অবঃ) এস, কে আব্দুল লতিফ। দেশ স্বাধীন হবার পর এলাকায় লোকের মুখে মুখে খবর ছড়িয়ে পড়ে লতিফ আর নেই। যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তিন মাস পর এক বৃষ্টিভেজা রাতে তিনি ফিরে এলেন বটিয়াঘাটা উপজেলার ভাণ্ডারকোট গ্রামের জীর্ণ কুটিরে। চারদিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা লতিফ ফিরে এসেছেন। আশপাশের গ্রামের শত শত নারী পুরুষ ছুটে আসে তাকে একনজর দেখার জন্য। বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে সবাই আবেগ ব্যক্ত করছে। লতিফ তার গুলিবিদ্ধ বাম হাত আর কোমরের ক্ষত স্থান সকলকে দেখান। প্রকৃত এক মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে দেখে খুশিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে সবার মুখ।
গত ১০ মার্চ দুপুরে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জানা গেল, মাত্র ৩দিন আগে স্ট্রোকের আঘাত সহ্য করেছেন তিনি। ফলে কথা কিছুটা জড়িয়ে গেছে। একটু মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে চাইলে তিনি একটু থেমে শুরু করেন। লতিফ জানালেন, ১৯৬৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী ১৮ বছর বয়সে তিনি যোগ দেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। এর ৬ বছর পরেই শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল পদাতিক বাহিনীর সৈনিক আব্দুল লতিফ তখন ওয়ারেন্ট অফিসার। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন আন্দোলন শুরু হয় তিনি তখন ভাওয়াল রাজার বাড়ী সেনা ক্যাম্পে ছিলেন। ২৩ মার্চ টিক্কা খান নির্দেশ দেন অস্ত্র জমা দেয়ার জন্য। কিন্তু কোন বাঙালি সৈনিক তাতে রাজি না হলে ক্যাম্পের ভিতর খাদ্য, বিদ্যূত্, পানি সহ সব কিছুই বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন ৩ হাজার বাঙ্গালী সৈনিক ছিল ক্যাম্পের ভিতরে। ক্যাম্পে এসে ২৫ মার্চ টিক্কা খান আবারও অস্ত্র জমা দিতে বলেন। কোন সৈনিক তাতে কর্ণপাত করেনি। তিনি বেরিয়ে যাবার সময় স্থানীয় লোকজন সংবাদ পেয়ে রাজপথের উপর গাছের গুড়ি ফেলে সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এসময় এক বাঙালি সৈনিকের পিঠে বুট দিয়ে লাথি মেরে রাস্তা পরিষ্কার করতে বলেন টিক্কা খান। মুহুর্তের মধ্যে বিদ্রোহ দানা বেধে ওঠে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। উপায় না দেখে দেহরক্ষীদের নির্দেশ দেন ব্র্যাশফায়ারের। কয়েকশ’ নিরস্ত্র বাঙ্গালী রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। লাশের উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে টিক্কা খান ঢাকা সেনানীবাসে চলে যান।
এমন বহু কাহিনী একের পর এক তিনি শুনিয়ে চলেন গড়গড় করে। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আমরা শুধু তাজা রক্ত ঝরিয়েছি। কিন্তু ফল ভোগ করছে সুবিধাবাদীরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এলে তার বডিগার্ড হিসেবেও দায়ীত্ব পালন করেছেন বলে জানান লতিফ। বঙ্গবন্ধুর সাথে থাকার সময়কার কিছু স্মৃতির কথাও তুলে ধরেন। জীবন হাতের মুঠোয় রেখে যুদ্ধ করা এই মুক্তিযোদ্ধা জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে হূদরোগে আক্রান্ত। বাস্তবে হোক বা না হোক, তিনি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন, বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সুচিকিত্সা, আর তিন বেলা তিন মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা দেবে রাষ্ট্র।
