বাংলার ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল গণতান্ত্রিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল প্রাচীনকালেই। বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন শশাঙ্ক যিনি ৬০৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর তাঁর রাজ্যের পতন ঘটে এবং বাংলায় এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয় যাকে ‘মাত্স্যন্যায়’ বলা হয়। এসময় বাংলার মানুষ পাল বংশের প্রথম রাজা গোপালকে তাদের রাজা হিসেবে নির্বাচিত করে। এভাবে বাংলার মানুষ দেশের অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সচেতনতার ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল। সুতরাং বাঙালি জাতি উন্নত রাজনৈতিক আদর্শকে অতি প্রাচীনকাল থেকেই লালন করে আসছে।
গত শতকে বাঙালি জাতি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে চরম উন্নতি লাভ করেছিল। উনিশ শতকের শুরুতে পূর্ব বাংলার মানুষ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ইস্যু নিয়ে যথেষ্ট রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দেয়। ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৭ সালের নির্বাচন,পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালের ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাছাড়া পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি সবসময়ই জেগে উঠেছে। ৫২,৬৬,৬৯,৭১ বাঙালি জাতির রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসের সাক্ষী।
কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে রাজনীতি সুস্থ পরিবেশে অগ্রসর হতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার চেতনা বাধাগ্রস্ত হয়। ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এক চক্র বাংলার রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়। ৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে দেশি ও বিদেশি একটি চক্র সুপরিকল্পিতভাবে বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে গলা টিপে হত্যা করে। যার ফলে পঁচাত্তরের মতো নির্মম এক বছর বাঙালি জাতিকে অবলোকন করতে হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯০ সালের বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশ সেনাশাসকদের অধীনে কথিত গণতান্ত্রিক তথা স্বৈরতান্ত্রিকতার চাদরে আবৃত থাকে। ফলে বিশ্বের বেশিরভাগ অনুন্নত দেশ যে সময়টাতে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের কাতারে দাঁড়িয়েছে ঠিক সে সময়টাতে বাংলাদেশ সেনা সমর্থিত শাসকদের অরাজনৈতিক শাসনে একটি অতি দরিদ্র রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
১৯৯০ সালের পর বাংলাদেশ সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে। এ সময় থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চে স্বাধীনতার সপক্ষের দল হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হয়। দীর্ঘদিন সেনা শাসকদের ছাতার নিচে ধীরে ধীরে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রও ফুলে ফেঁপে অতিকায় রূপ ধারণ করে। সব মিলিয়ে বাঙালি জাতি অল্প সময়েই পুনরায় আশাহত হয়েছে। কেননা গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি অল্প সময়েই প্রতিহিংসার রাজনীতির রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেইসঙ্গে যে দল ক্ষমতা লাভ করেছে সেই দলই তার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য যা খুশি করেছে। এক কথায় বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষমতা আর ভোটের রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই ঘটছে জটিলতা। এর মূল কারণ এক দলের প্রতি আরেক দলের আস্থাহীনতা।
প্রধান দুটি দলের মধ্যে এ আস্থাহীনতা ও প্রতিহিংসা একদিনে জন্মলাভ করেনি বরং এর উত্পত্তিস্থল ৭০ দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মাঝে খুঁজতে হবে। এক কথায় এহেন পরিস্থিতি কোনো আকস্মিকতা থেকে নয় মূলত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সেইসঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী ও সপক্ষের শক্তিদ্বয়ের মধ্য এক তুমুল সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ সমস্যা সমাধান করে সুস্থ রাজনৈতিক ধারায় ফিরে আসা প্রধান দুটি দলের পক্ষে জটিল থেকে জটিলতর শুধু নয়, অনেকটা অসম্ভব হয়ে গেছে।
জামায়াত ইসলামী দলটা কখনো স্বাধীনতার চেতনা লালন করে না। কেননা সামপ্রদায়িকতামুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তাদের কাম্য নয়। আর এজন্য তারা কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের ছাতার নিচে থেকে শক্তি সঞ্চয়ের পথ অবলম্বন করেছে। তারা ভবিষ্যত্ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নামক মুক্তিযুদ্ধের পতাকাবাহী দুটি দলের কোনোটারই অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না।
তাই বলা যায় যে, যদি বর্তমান দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল পূর্বের সকল অসন্তোষ ভুলে গিয়ে কেবলমাত্র স্বাধীনতার চেতনায় এক মেরুতে অবস্থান করে, তবেই উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির সূচনা বাংলাদেশে ঘটতে পারে। অন্য কোনো উপায়ে কিংবা শত শত বার সংলাপেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্য কোনো স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব নয়। ভুলে গেলে চলবে না যে, তারাই এ জাতির ভাগ্যবিধাতা ও চালিকা শক্তি। রক্তে গড়া দেশটার কথা চিন্তা করে আধপেটা ও অনাহারী মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্য তীব্র অসন্তুষ্টির বরফ খুব শীঘ্রই গলবে, এটাই আমাদের কামনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
