হরতাল-ভয়তাল

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৩, ২০:৪৪
বাংলাদেশে ‘হরতাল’ শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি। তত্কালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রতিবাদ এবং তার পদত্যাগের দাবিতে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ লাগাতার আন্দোলন করে। ঘন ঘন আহ্বান করা হয় হরতাল। জনগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে। সেই সময় এরশাদের অন্যতম সহযোগী এবং তাঁর জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও মন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বিভিন্ন জনসভায় বলে বেড়াতেন ‘ভাই, এটা তো হরতাল নয়, এটা আসলে হাসিনা-খালেদার ভয়তাল’। বাংলাদেশে হরতাল ডাকা ডালভাতের মতো। ইস্যু যাই হোক, জনগণের সমর্থন থাকুক বা না থাকুক ‘জনজীবন স্তব্ধ’ করে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো, রাজনীতি আশ্রিত ট্রেড ইউনিয়নগুলো কিংবা নানা ধরনের রাজনীতিপুষ্ট সংগঠন কখনও পরিকল্পনা করে কখনও বা আকস্মিকভাবে হরতাল বা ধর্মঘট ডেকে বসে। হরতাল বা ধর্মঘট এখন প্রতিবাদের বা রাজনৈতিক কর্মসূচির ভোঁতা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই রাজনৈতিক কর্মসূচিটির আর আগের মতো আবেদন নেই। ‘হরতাল’ কর্মসূচি শুধু জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি ছাড়া আর কিছু যে করতে পারে না, তা যেমন জানে সাধারণ মানুষ,তেমনি রাজনৈতিক দলের নেতারাও তা জেনে গেছেন। তবে আরামপ্রিয়, কর্মবিমুখ বাঙালি হরতালে খুশিই হয়। আত্মঘাতী বাঙালি একথা ভাবে না যে ক্ষত ও ক্ষতির পরিমাণ কতটা বাড়িয়ে তোলে একটা কর্মহীন দিন। হরতালে ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, উত্পাদন তথা অর্থনীতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে এ সংক্রান্ত চুলচেরা বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যান আছে। হরতাল এখন মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কিছু করতে পারে না। হরতালে ক্ষতি হয় রাষ্ট্রীয় সম্পদের। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এই নিরাপত্তা বিধান করতে গেলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী হরতাল সমর্থকদের আক্রমণের শিকার হয়। হরতাল আহ্বান করা যে কোনো রাজনৈতিক দলের অধিকার। এই অধিকার তারা প্রয়োগ করতেই পারে। আবার হরতাল না মানাও যে কোনো নাগরিকের অধিকার। ইদানিং দেখা যায়, হরতালের আগের সন্ধ্যা বা রাতে গাড়ি ভাংচুর করা ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার মারাত্মক প্রবণতা । গত তিন মাসে ৭৫০টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। গত ১৭ মার্চ বিএনপির ৩৬ ঘণ্টার হরতাল শুরুর আগের রাতে ককটেল বিস্ফোরণে তিনজন চিকিত্সক মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বনাশা হরতালের বিরোধিতা করে আসছেন। যদিও তাঁর দল আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় হরতালবাজিতে কম যায়নি। কিন্তু সরকারে এসে শেখ হাসিনা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন হরতালের কুফল কতটা মারাত্মক। ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অঙ্গ। আমরা আশা করবো—রাজনৈতিক দলগুলো সেদিকে দৃষ্টি দেবে। রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষের কল্যাণ সাধন করা, তাহলে রাজনীতি কেন মানুষের জানমালের হুমকি হবে, ধ্বংসাত্মক হবে? গাইবান্ধা