দেশে বছরে এক হাজার কোটি টাকার খেজুরের গুড় তৈরি হয়

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৩, ২০:৪৬
দেশে বছরে এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ ২৫ হাজার টন খেজুর গুড়-পাটালী উত্পাদন হয়। কিন্তু অনেক পুরানো এ পণ্যের মান উন্নয়নে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ নেই। গাছিরা সেই অনাদীকাল থেকে একই পদ্ধতিতে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও রস জ্বালিয়ে গুড়-পাটালি তৈরি করে আসছে। খেজুরে গুড়-পাটালী একটি রপ্তানি পণ্য হতে পারে। প্রবাসী বাঙালিদের কাছে ব্যাপক চাহিদা আছে। আজ থেকে সোয়া দু’শ’ বছর আগে চিনি শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল যশোর। আর এ চিনি উত্পাদিত হত খেজুর গুড় থেকে। এ চিনি শিল্পের কেন্দ্র ছিল ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর। তখনও আখ থেকে বৃহত্ শিল্পে সাদা চিনির উত্পাদন শুরু হয়নি। তাই এ চিনির চাহিদা ছিল ইউরোপে। কলকাতা বন্দর দিয়ে চালান যেত। খেজুর গুড় হতে চিনি তৈরির ইতিহাস থেকে জানা যায়, দেশীয় ময়রারা এ চিনি তৈরির পথিকৃত ছিল। নদীয়ার দৌলতগঞ্জের রাম সেন ও বর্ধমানের সাতগাছিয়ার দশরথ ও ভগবান দেও যশোর থেকে খেজুরে গুড় নিয়ে যেয়ে চিনি তৈরি করত। তারা ভাল লাভ করত। ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলার ক্ষমতা দখলের পর দলে দলে সাহেব বিলেত থেকে এদেশে আসতে খাকে। মিঃ বালকে নামে এক সাহেব চিনি তৈরির ব্যবসায়ে নামেন। তিনি বর্ধমান জেলার (বর্তমানে ভারত) ধোবাতে একটি বড় ধরনের চিনি কারখানা স্থাপন করেন। যশোর থেকে খেজুরে গুড় নিয়ে চিনি তৈরি শুরু করেন। খরচ বেশি পড়ায় তিনি ধোবাও সুগার কোম্পানি গঠন করে কোটচাঁদপুর ও ত্রিমোহনীতে দুটি বড় চিনি ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। ১৮৮২ সাল পর্যন্ত মিঃ বাকলে সাহেবের কারখানা দুটো ভাল চলে। এরপর লোকসানের পালা শুরু হয়। নিউ হাউজ নামে এক ইংরেজ সাহেব কোটচাঁদপুর ফ্যাক্টরি কিনে নেন। পরে সেইনটস ব্যারি নামে আরেক সাহেব ত্রিমোহনী ফ্যাক্টরি কিনে নেন। যশোর ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে বর্ণিত তথ্যে জানা যায়, ১৮৪২ সালে কলকাতায় বসবাসরত সাহেবগণ গ্লাডস্টোন এন্ড কোম্পানি গঠন করে চিনি ব্যবসায়ে নামেন। তারা চৌগাছাতে একটি বড় চিনি ফ্যাক্টারি স্থাপন করেন। এ ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ছিলেন মিঃ স্মিথ নামে এক বিলেতি সাহেব। পরে ম্যাকলিউড নামে আরেক সাহেব ম্যানেজার হন। ম্যাকলিউড পরিবারের অনেক স্মৃতি এখনও কোটচাঁদপুরে আছে। কোটচাঁদপুর ছাড়াও ঝিকরগাছা, ত্রিমোহনী, চৌগাছা, নারকেলবাড়িয়াতে এ কোম্পানির আরো চিনি ফ্যাক্টরি ছিল। ৩-৪ বছর এ সব ফ্যাক্টরি ভাল চলে। পরে লোকসান শুরু হতে থাকে। ১৮৫০ সালের পরও কোটচাঁদপুর ও চৌগাছার ফ্যাক্টরি দুটো চালু ছিল। ১৮৫৩ সালে মিঃ নিউ হাউজ তাহেরপুরে একটি বড় আকারের ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। ৩-৪ বছর চলার পর লোকসান শুরু হয়। পরে চিনি তৈরি বন্ধ করে এ কারখানাতে ‘রাম’ মদ তৈরি হত। মিঃ এলএসএস ওম্যালি কর্তৃক প্রকাশিত যশোর ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, সাহেবদের চেয়ে দেশীয় ময়রাদের কারখানায় উত্পাদিত চিনির মান ভাল থাকায় চাহিদাও বেশি ছিল। আখ থেকে উত্পাদিত সাদা চিনির আমদানি শুরু হলে খেজুর গুড় হতে তৈরি চিনি শিল্পে বিপর্যয় ঘটে। ১৮৯০ পর যশোর অঞ্চলে গড়ে উঠা দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি চিনি বাজার হারায়। যশোর জেলাতে গড়ে উঠা চিনি ফ্যাক্টারিগুলো বন্ধ হতে থাকে। একমাত্র কোটচাঁদপুর ও আশেপাশের এলাকাতে ছোটবড় প্রায় ৫শ’ চিনি ফ্যাক্টরি ছিল। তবে ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ারে চিনির উত্পাদন সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য আছে। ১৮৭৪ সালে কোটচাঁদপুরের ৬৩টি ফ্যাক্টরিতে এক লাখ ৫৬ হাজার ৪শ’ ৭৫ মণ চিনি উত্পাদন হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। এ চিনি তৈরিতে এক ধরনের শেওলা ব্যবহার করা হত। কপোতাক্ষ নদে প্রচুর পাটা শেওলা মিলত। গুড়ের ভাড় ভেঙ্গে অন্ধকার ফ্যাক্টরির ভিতর ঝুড়িতে রাখা হত। ঝুড়ির উপর শেওলা বিছিয়ে দেওয়া হত। রস ঝরে পড়ে চিনি হত। রোদে শুকিয়ে বস্তা ভর্তি করে চালান পাঠানো হত বিভিন্ন স্থানে। প্রথম বারে উত্পাদিত চিনির মান ভাল হত। বলা হত নালুয়া চিনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিনির ব্যবসা শুরু করেছিল। ১৭৭৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতা বন্দর দিয়ে এক হাজার ৯শ’ টন চিনি রপ্তানি করেছিল। এ থেকে শতকরা ৫০ ভাগ মুনাফা হয়েছিল। ১৮০০ সালে কোম্পানি ৫৭ হাজার টন এবং ১৮০৫ সালে দু ’ লাখ ১৬ হাজার টন চিনি রপ্তানি করে ছিল বাংলা থেকে। যার সিংহভাগ ছিল যশোর অঞ্চলে উত্পাদিত। ১৯০১ সালে যশোর অঞ্চলে চিনি ফ্যাক্টরির সংখ্যা কমে একশ’ ১৭টিতে নেমে আসে। ১৯২৪ সালে আরো কমে ৫০টিতে নেমে এসেছিল। ১৯৫০ সালেও কয়েকটি কালে সাক্ষী হিসাবে টিকে ছিল। পরে এগুলো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। খান বাহাদুর এম এ মোমেন ফাইনাল রিপোর্ট অন দি সার্ভে এন্ড সেটেলমেন্ট অব যশোর বইতে লিখেছেন, ১৯০৮ সালের দিকে যশোর অঞ্চলে ৬০ লাখ খেজুর গাছ ছিল। এ গাছ থেকে ২৫ লাখ মণ গুড় তৈরি হত। অবশ্য এ সময়ে খেজুর থেকে চিনি তৈরি প্রায় উঠে গিয়েছিল। বর্তমানে শুধু যশোর নয় পার্শ্ববর্তী কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ফরিদপুর, মাদারিপুর, শরিয়তপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী ও নাটোর জেলাতেও খেজুরের গুড়-পাটালী তৈরি হয়ে থাকে। যশোরের খাজুরা এলাকায় ৫৭টি গ্রামে উন্নতমানের পাটালী তৈরি হয়ে থাকে। এ পাটালি খাজুরার পাটালি নামে পরিচিত। বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা কত তার সঠিক তথ্য পরিসংখ্যান কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরে নেই। শীতের শুরুতে খেজুর গুড়-পাটালী উত্পাদন শুরু হয়। চলে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত। একটি খেজুর গাছ থেকে ২০ কেজি পরিমাণ গুড় তৈরি হয়ে থাকে। তাল, খেজুর ও গোলপাতা উন্নয়ন পাইলট প্রকল্পের পরিচালক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল আলম জানান, দেশে খেজুর গাছের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় কঠিন। সারাদেশে আনুমানিক ৭০ লাখ খেজুর গাছ আছে। এ থেকে বছরে এক লাখ ২৫ হাজার টন গুড়-পাটালী তৈরি হয়ে থাকে। প্রতি কেজি গুড়-পাটালীর গড় দাম ৮০ টাকা করে ধরলে মোট মূল্য দাঁড়ায় হাজার কোটি টাকা। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খেজুরে রস সংগ্রহ ও গুড়-পাটালী তৈরি হয় না। তিনি জানান, রস সংগ্রহ করে মিলে উন্নত পদ্ধতিতে গুড় তৈরি করা যেতে পারে। আর এ গুড়-পাটালী ফের রপ্তানি পণ্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে।