‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৩, ২২:৩৪
লালন ভক্ত-শিষ্য বাউলসহ সাধারণ মানুষের পদচারণায় মুখর কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের আখড়াবাড়ি। লাখ মানুষের ঢলে লালন একাডেমী চত্বর উত্সবমুখর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দোল পূর্ণিমার তিথিতে পাঁচদিনব্যাপী অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও লালন ভক্তনুরাগীদের আগমন ঘটেছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রথমদিনেই লালন একাডেমী চত্বরে তিল ধারনের ঠাঁই ছিলো না। একতারা, দোতারা, খঞ্জনী, মন্দিরা, তবলার বাদ্য-বাজনায় বাউলরা গলা খুলে গাইছেন, ‘সবে বলে লালন ফকির কোন জাতের ছেলে’/‘আছে ভাবের তালা যে ঘরে, সেই ঘরে সাঁই বাস করে, ‘ভাব দিয়ে খোল ভাবের তালা, দেখবি সেই অটলের খেলা’/ ‘আল্লাহ-হরি ভজন পূজন, মানুষের সকল সৃজন’/ ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’/ সব লোকে কয়, লালন কি জাত সংসারে’/ ‘রাম কি রহিম সে কোনজন, মাটি কি পবন জল কি হুতাশন’/ ‘একই ঘাটে আসা যাওয়া, একই পাটনি দিচ্ছে খেওয়া’/ ‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার’। স্থানে স্থানে গান পরিবেশনের সময় দর্শক-জনতাও নেচে-গেয়ে গানের সাথে তাল দিচ্ছেন। দর্শক-শ্রোতারা কখনো পিনপতন নীরবতায় গান শুনছেন, আবার কখনো গানের তালে করতালি দিয়ে মুখর হয়ে উঠছেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্নস্থান হতে বাউল সাধকেরা তাদের শিষ্য, প্রশিষ্য ও সাধন-সঙ্গিনী নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন মূল মাজার ও তার আশেপাশের এলাকায়। মাজার সংলগ্ন আয়না মহলে চলছে সাধু-ভক্তদের লালনগীতি পরিবেশন। মাজারে ঢোকার রাস্তায় পা ফেলতেই মহামতি লালনের উদাসী গানের সুর কানে এসে ধরা দেয়। লালন ও তাঁর গানই মাজারে টেনে আনছে সবাইকে। কোন সে উদাসী ডাক? কোন দাওয়াত নেই, পত্র নেই, তবু মানুষ ছুটে আসে দলে দলে। ভক্ত-অনুসারীরা এসেই প্রথমে মূল মাজারের ভিতরে চিরনিদ্রায় শায়িত তাদের আধ্যাত্মিক গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছেন। তারা জাত, কুল, ধর্ম, গোত্র ভুলে একে অপরের সঙ্গে ভবের হাটে ভাবের আদান-প্রদান করছেন। সাঁইজির ধামে আসা বাউল ও-ভক্তগণ গতকাল সকালের নাশতা পায়েশ ও মুড়ির ‘বাল্যসেবা’ গ্রহণ করেন। দুপুরে তাঁরা মরা কালীগঙ্গায় গোসল সেরে মাছ-ভাত ও ত্রিব্যঞ্জন দিয়ে (তিন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি তরকারি) দুপুরের খাবার ‘পুণ্যসেবা’ গ্রহণ করেন। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা বাউল শান্ত ফকির জানালেনঃ তিনদিন আগে সাঁইজির ধামে এসেছি। বাইরে তাঁবু করে থাকছি। অতিরিক্ত মশার জ্বালাতনে প্রাণ খুলে গান গাইতে চরম অসুবিধা হচ্ছে। বাউল শরফুদ্দিন শাহ বলেন, সাঁইজিকে পেতে হলে আমার মতে উঠান, বারান্দা ও ঘরের ভেতর অর্থাত্ গুপ্তজ্ঞান অর্জন করতে হবে। যেমন সাঁইজির সম্পর্কে অন্য কোনো জ্ঞান নেই, কিন্তু সচারচার তাঁর গান ও একতারার বাজনা ভালো লাগে সেটা হলো উঠান জ্ঞান। উঠানে দাঁড়িয়ে অন্যান্য জ্ঞান রপ্ত করে গুপ্তের আশায় বারান্দায় উঠতে হয়। এরপর “গুপ্ত ব্যক্ত করে আলাপন”। বারান্দায় উঠতে পারলে সাঁইজিকে হূদয়ে ধারণ ও অনুভব করা সম্ভব। গুপ্তজ্ঞান অর্জন করতে পারলে সাঁইজির সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে জানাযায়। বাউল রশিদ ফকির জানান, প্রতি বছর বাবার টানে আখড়ায় আসি। এখানে না গাইলে নিজের শিল্পীমনের তৃপ্তি মিটে না। লালন একাডেমীর আয়োজনে লালনের মাজারের সামনে মরাকাঁলী গঙ্গা নদীর তীরে বসেছে লালন মেলা। এতে স্থান পেয়েছে কুটির শিল্পজাত নানা সামগ্রী, লালনের প্রতিকৃতি, একতারা, গলার মালা, হস্তশিল্প পণ্যসহ হরেক রকম জিনিস। ফকির লালন শাহ জীবদ্দশায় ফাল্গুনের শেষে দোল পূর্ণিমার তিথিতে ভক্তদের নিয়ে উত্সব করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় পালন করা হয় বার্ষিক স্মরণোত্সব।