একদিকে যেমন কলকাতা আর ঢাকার চলচ্চিত্র বিনিময় নিয়ে নানা মুনির নানা মত। রাজ্জাক, ববিতা থেকে শুরু করে অনেকেই এই অসম দুই শক্তির বিনিময়কে বলছেন ‘গভীর ষড়যন্ত্র’। ঠিক সেই সময় শিল্পীদের অনেকেই কাজের অবসরে বা দেশে বেকার অবস্থায় পড়ে থেকে তারকাদের ফোন কলে লবি মেইনটেইন করছেন কলকাতার নির্মাতাদের। নামে-বেনামে অধিকাংশ চলচ্চিত্র তারকাদের কলকাতার ছবির প্রতি এই বাড়তি প্রেম নতুন প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে। এরই মধ্যে কলকাতায় সফলভাবে মুক্তি পেল জয়া আহসানের ‘আবর্ত’। বরাবরের মতো কলকাতার মিডিয়া আমাদের দেশের গুণী এই অভিনেত্রী জয়া আহসানের নামের বানানেও বিকৃতি ঘটিয়েছে। তারা ওপার বাংলায় আমাদের অভিনেত্রীর নতুন নাম দিয়েছে ‘জয়া এহসান’। ফেরদৌসকে সব সময় আনন্দলোক-আনন্দবাজারসহ অধিকাংশ মিডিয়া ‘ফিরদাউস’ বলে সম্বোধন করেছে। তারকারা যেন অবলীলায় কলকাতার ছবির প্রেমে পড়ে নিজেদের পারিবারিক নামটির নির্লজ্জ বিকৃতিও মেনে নিচ্ছেন অবলীলায়। তাদের মুখে কোনো প্রতিবাদ নেই। এখন আমরা যারা বাংলাদেশি বিনোদন সাংবাদিক তারা অনেকটা সংশয়ে আছি। কলকাতার এই মোহ মৌসুমে এখন তাদের কোন নামে ডাকা উচিত? ফেরদৌস না ফিরদাউস? জয়া আহসান নাকি জয়া এহসান?
আরও একটি সমীকরণে বিষয়টি পাঠককে স্পষ্ট করা যাক। কলকাতার ‘জয়া এহসান’-এর ‘আবর্ত’ চলচ্চিত্রটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হলেও তা সফলভাবে সমাপ্তিও ঘটেছে। অথচ বাংলাদেশে শাকিব খানের সাথে ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ ছবিটির কাজ এখনও শেষ হয়নি। বরং বলা যায় এ ছবির প্রচারের বাদ্য বাজতে বাজতে এখন ফেটে চৌচির হওয়ার মতো অবস্থা! কিন্তু ছবি রিলিজের কোনো খবর নেই। এ ছাড়া ছবি সাইনিং বা ঘোষণার সময় শাকিব খানের যে ছবির বাজার ছিল তা এখন তলানীতে ঠেকেছে। এই অবস্থায় ছবিটির ব্যবসা নিয়েও অনেকটা সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে র্যাম্প মডেল রুহি বেশ কটি ইন্টারভিউতে বলেছেন, ‘কলকাতার চলচ্চিত্র নির্মাতারা যতটা প্রফেশনাল তার শিকিভাগ প্রফেশনালিজমও নেই আমাদের দেশে। এখানে শাকিব খানের বিপরীতে আমাকে একটি ছবিতে কাস্ট করা হলেও প্রযোজকের নানান টালবাহানায় আমি ছবিটা ফিরিয়ে দিই।’ অর্থাত্ বাংলা চলচ্চিত্রের একেবারে নবাগত একজন অভিনেত্রীর কাছেও দেশীয় চলচ্চিত্র নিয়ে অভিযোগের সুর। কেন তাদের এই কলকাতা-প্রীতি? এমনটা জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘আমরা অভিনেত্রী, ভালো ছবির কাজের অফার পেলে তো করবই।’
ঠিক তেমনই আমাদের চলচ্চিত্র তারকা নিপুণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশে তার ছবি সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছিল। একে তো নবিস নির্মাতাদের নামেমাত্র বাজেটের ডিজিটাল ছবিতে বেশিরভাগই নিচ্ছেন একেবারে আনকোরা অভিনেত্রীদের। অন্যদিকে এই যুক্তিতে ছবির এই খরার বাজারে উপায়ান্তর না দেখে তারকারা ঝুঁকছেন টালিউডে। ক্রমেই তাই এক অদৃশ্য চক্রে প্রশস্ত হচ্ছে টালিউডের প্রতি বাংলাদেশি তারকাদের সমর্থনের উঠোন। এভাবে চলতে গেলে ক’দিন বাদে কলকাতা ছবি বাংলাদেশে আসার জন্য তারকারা আর বিনিময়ের জন্য আলোচনায় বসারও প্রয়োজন বোধ করবেন না। বরং কলকাতার ছবি প্রদর্শনের জন্য তারকারা ঢাকার রাস্তায় মিছিলে নামতে পারেন!
পাঠকদের একটি পুরোনো স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মাত্র কয়েকমাস আগে আমাদের চলচ্চিত্রের মেগাস্টার শাবানা হঠাত্ আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। আমাদের চলচ্চিত্রে যখন মুরুব্বি সংকট। তখন শাবানা আমদের চলচ্চিত্র তারকাদের ব্যবহার না করে কলকাতার তারকাদের নিয়ে একটি ছবি নির্মাণের জন্য ছুটে গিয়েছিলেন টালিউডে। কোয়েল মল্লিক, জিত্, শ্রাবন্তীসহ অনেকের সাথে মিটিং করেও টালিউডের নিজস্ব নীতিমালায় আরোপিত শর্তের বেড়াজাল পেরিয়ে শাবানা কলকাতার তারকাদের আনতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। লজ্জায় সে খবর আর প্রচার পায়নি আমাদের মিডিয়ায়! এখানেই স্পষ্ট কলকাতায় তাদের নিজস্ব তারকাদের ধরে রাখতে তারা কতটা কঠোর নীতিমালায় বদ্ধপরিকর। দেশপ্রেম, নিজস্ব সংস্কৃতিপ্রেম হয়তো একেই বলে। অথচ আমাদের চলচ্চিত্র সংগঠন? পরিচালক সমিতি, শিল্পী সমিতি, প্রযোজক সমিতি কেউ কি কাউকে মেনে চলে?
সর্বশেষ আলোচিত অনন্ত-বর্ষার ডিভোর্সের অন্যতম কারণ হিসেবেও অনন্ত অভিযোগ করেছেন কলকাতার ছবির মোহে নাকি বর্ষা ছুটেছেন সেখানে এবং তাকে ছেড়েছেন। অনেকের মতে বর্ষাকে নাকি কলকাতার চলচ্চিত্র করতে বাধা দেওয়াতেই এই সংকটটা আরও কঠিন আকারে দানা বেঁধেছে। তবে এ খবরের সত্যতার পরিমাপ কতটা সেই বিতর্কে না গিয়ে এটুকু স্পষ্ট হওয়া যায় যে অনন্ত-বর্ষার প্রেম ও সংসারে ভাঙনের জন্যও অন্যতম দায়ী টালিউডের এই অদৃশ্য মোহ। এখন তারকাদের বা নাগরিক হিসেবে আমাদের চেতনায় ‘দেশপ্রেম’ বলে যে শব্দ আছে তা বেমালুম ভুলে নিজেদের বিকৃত নাম নিয়েই সন্তুষ্ট থেকে যারা ছুটছেন, তাদের উদ্দেশ্যটা আপাতদৃষ্টিতে ব্যক্তিগত মনে হলেও নিকট ভবিষ্যতে দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য যে এটা বড় হুমকি হবে না, তা কি কেউ হলফ করে বলতে পারবে?
