পূর্ণিমার আলোয় মাতোয়ারা ছেঁউড়িয়ায় লালন উত্সব

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৩, ২২:২৪
মহামতি লালন শাহের গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে ছেঁউড়িয়া। অন্যান্য গুরু-সাধুদের পাশাপাশি নতুন খেলাফতপ্রাপ্ত সাধুরা সুরের উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছেন। সমপ্রতি খেলাফত পেয়েছে এমন সাধুরা সুর আর বাদ্যে ভাব জগতের অপরূপ সাজে দোল পূর্ণিমার আলোয় আলোকিত হয়ে গলা ছেড়ে গাইছেন ‘দয়াল চাঁদ আসিয়া আমার পার করে নিবে, এমন সুভাগ্য আমার কবে হবে’। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে অবস্থিত বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ছেঁউড়িয়ায় দোল উত্সবের দ্বিতীয়দিনে মঙ্গলবার দোল পূর্ণিমার আলোয় আলোকিত হয় পুরো আখড়াবাড়ি। খেলাফতপ্রাপ্ত সাধুদের সাদা পোশাকে লালন আখড়াবাড়ি পুরোটাই সাদায় সাদা হয়ে ওঠে। গতকাল বুধবার সকালে সাঁইজীর সমাধি আঙিনার প্রাচীরের মধ্যে দেখা মেলে যুগল খেলাফতপ্রাপ্তদের সঙ্গে। তাদের নাম কৃষ্ণ ফকির ও অর্চণা ফকির। তারা খেলাফত নিয়েছেন মোজাম্মেল ফকিরের কাছ থেকে। খেলাফত গ্রহণের দিনের কথা বর্ণনা করে তারা বলেন: সেদিন আমাদের দু’জনকে নতুন রূপে সাজিয়ে দিয়েছিলেন অন্য সাধুরা। আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে হয়েছিলো খেলাফত অনুষ্ঠান। বাউল সাঁইজীদের জীবনে এটিই সব থেকে মর্যাদাবান ধাপে প্রবেশের আচার। জিন্দা দেহে মুর্দার বসন নিয়ে পৃথিবীতে মৃত হয়ে চলাফেরায় বেঁচে থাকায় কী যে আনন্দ তা বোঝে শুধু খেলাফত গ্রহণকারী। তারা বলেন: সেদিন প্রথমে কৃষ্ণ ফকিরের দেহ থকে শরিয়তি পোশাক’ খুলে পরিয়ে দেয়া হয় ‘খিলকা’ নামে সেলাইবিহীন একখণ্ড সাদা কাপড়, পরানো হয় লুঙ্গি, নেংটি, ওড়না, হাতে দেয়া হয় জলপাত্র আর ছড়ি। নেংটি পরানো মাত্রই রুদ্ধ হয়ে যায় কামের ঘর, মানে সৃষ্টির দ্বার। কাঁধে আঁচলা-ঝোলা তুলে দেয়ার পর মাথায় দেয়া হয় সাদা কাপড়ের পাগড়ি, গলায় সাদা মালা। হয়ে যায় পুরো শুভ্রতায় কৃষ্ণ ফকিরের সাজ। এবার চলে অর্চণা ফকিরের পালা। তাকেও একে একে খিলকা এবং খেলাফতের সকল পোশাক পরানো হয়। এই সব সাজের মধ্যে সাঁইজীরা অনুচ্চস্বরে যেসব মন্ত্র পাঠ করেন, তা সাঁইপন্থীরা ছাড়া অন্যদের শুনতে বা জানতে মানা। খেলাফত প্রদানের সময় সাদা কাপড়েই তাদের চোখ বেঁধে দেয়া হয় এবং সেই সাথে হাত বেঁধে নেয়া হয়। তাদের গুরুপ্রণাম শেষ হতেই গান গেয়ে ওঠেন একদল সাধু যাদের হাতে দোতারা, মন্দিরা, প্রেমজুড়ি, একতারা এবং কাঁধে ঝোলে তবলা-বায়া। তারা সেদিন গেয়েছিলো ‘কে তোমারে এ বেশভূষণ, পরাইল বলো শুনি, জিন্দা দেহে মরারও বেশ, খিলকা-তাজ আর ডোরা কৌপনী’। এই গানের সাথে খেলাফত গ্রহণকারীদের বাঁধা হাত ধরে মহামতি লালনের সমাধি ঘর প্রদক্ষিণ করানো হয়। পিছন থেকে চলতে থাকে গান- ‘মরার আগে যে জন মরে, সমনেতে ছোঁয় না তারে, শুনেছি সাধুও দ্বারে, তাই বুঝি করেছ ধনী’। সাতবার সমাধি প্রদক্ষিণ শেষে সাধুদের কণ্ঠে আরেকটি গান ‘আজ আমারে কৌপনী ভারতী গোঁসাই, ফকির হবো’। সেদিন এই গান ছেঁউড়িয়ার বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে যায়। আখড়ার সীমানা পেরিয়ে সাধুরা সকলে মিলে কৃষ্ণ ফকির ও অর্চণা ফকিরকে নিয়ে খেলাফতের ভিক্ষায় বের হন। ভিক্ষাপর্বে তাদের পিছে সমভাবে সাধুদের সেই গীতিবাদ্য চলতে থাকে। প্রথমে তারা ভিক্ষার জন্য উপস্থিত হন আখড়া সংলগ্ন সাধুদের বাড়িতে। সেখানে গৃহস্বামীর পক্ষে একজন নারী কুলায় করে চাল-কাঁচা তরিতরকারি এনে ভিক্ষাপাত্রে তুলে দেন। তখন গৃহস্বামীর উঠানে বাদ্য ও গীতে ভিন্ন একটা গতির সৃষ্টি হয়। দলবেঁধে ভিক্ষা করে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে। ভিক্ষা শেষে তারা আসে মহাগুরুর সমাধিস্থলে । এখানে খেলাফত গ্রহণকারীদের থাকতে হয় আড়াইদিন। খেলাফতপ্রাপ্তি সম্পর্কে মহামতি লালনের মাজারের প্রধান খাদেম ফকির মহম্মদ আলী শাহ বলেন, খেলাফত নেয়ার আগে একজন গুরুর নিকট ভক্ত হতে হয়। গুরুর ইচ্ছানুযায়ী খেলাফত নিতে হয়। খেলাফত নেয়া মানে দুনিয়া ত্যাগ করা, পুরোটাই গুরুজীর পথে যাওয়া। তিনি বলেন: খেলাফত পাওয়াতো বহু সাধনার ব্যাপার। বছরের পর বছর ধরে অনেক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই না খেলাফত পাওয়া যায়। এক থেকে বারো বছর পূর্ণ হলে তখন আবার সাঁইজী পরীক্ষা নেবে। প্রতি বছর আমাদের পরীক্ষা হয়। সফলতার সঙ্গে বারো বছর পূর্ণ হলে খেলাফত পাওয়া যায়। নেত্রকোনা থেকে আসা বাউল সাদেক খেলাফতে প্রবেশের ধাপ সম্পর্কে বলেন, প্রথম ধাপে সাঁইজী আমাদের চাল পানি দেন। প্রথমদিন থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ৫টি চাল আর আড়াই ঢোক জল গুরুর নামে পান করতে হয়। দ্বিতীয় ধাপে হাওয়ার সাধনা। তিনি বলেন, আমার ধ্যানের ১০ বছর চলছে। দুই বছর পর সাঁইজীর কাছে দেয়া পরীক্ষায় আমি পাস করলে আমাকেও খেলাফত দেয়া হবে। খেলাফত ছাড়া পূর্ণতা আসে না। এবার ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িতে প্রতি খেলাফতপ্রাপ্ত সাধুর সঙ্গে ২০ থেকে ৩০ জন সঙ্গী এসেছেন। এ ছাড়া ভারত, নেপাল, ভুটান, ফ্রান্স, কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সাধু ও লোকসংস্কৃতির অনুরাগীরা এসেছেন। সারাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক লালন ভক্ত ও অনুসারী সমবেত হয়েছেন ছেঁউড়িয়ায়। প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ ঘটছে। আয়োজকেরা বলছেন, এবার পাঁচদিনে ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষের সমাগম ঘটবে ছেঁউড়িয়ায়। তবে পর পর দুদিন হরতালের কারণে অনেকেই সময়মতো আসতে পারছেন না। গতকাল দেখা গেল সাধুরাই বরং এখন এ আয়োজনে কোণঠাসা। প্রাধান্য পেয়েছে বাণিজ্যিক মেলার কেনাবেচা। জয়পুরহাটের আজিবর ফকির বলেন, হরতালের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত-অনুসারীরা আসতে পারছে না। মঙ্গলবার রাত থেকে নিয়ম অনুসারে দোল উত্সবে তিনটি পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। দোল পূর্ণিমার রাতে হয় ‘অধিবাস’। এই পর্বে সাধুসঙ্গের পর রাতে খিচুড়ি খেতে দেয়া হয়েছে। গতকাল সকালে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাল্যসেবা। এই পর্বে পায়েস-মুড়ি খেতে দেয়া হয়েছে। দুপুরে হয় পূর্ণসেবা। এতে ভাত, ইলিশ মাছ, ডাল, দই, সবজি খেতে দেয়া হয়েছে। লালন একাডেমি কর্তৃপক্ষই এসব আয়োজন করে থাকে। লালন একাডেমির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক এনামুল হক মঞ্জু জানান, এবার তিন পর্বে ২ টন চাল-ডালের খিচুড়ি, বাল্যসেবায় ১৫০ কেজি পায়েসের চাল, ২০০ কেজি চিনি, ২৫ কেজি গুঁড়ো দুধ ও ১০ কেজি কিশমিশের পায়েস রান্না করা হয়েছে। গতকাল পূর্ণসেবায় ৩০০০ কেজি ইলিশ মাছ ভাজা, ১৫ মণ সবজি, ৩০০০ কেজি দই ও ভাত রান্না করে সাধুদের আপ্যায়ন করা হয়েছে। এরপর যাঁরা থাকবেন, তাঁদের নিজ উদ্যোগে খানাপিনার ব্যবস্থা করতে হবে।