লবণ চাষে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে দাম অনেক কমে যাওয়ায় হতাশ লবণ চাষিরা। উত্পাদন খরচ বাড়লেও লবণের মূল্য বাড়ছে না। প্রতি মণে ৩০ টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। বিক্রি না হওয়ায় চাষিদের কাছে বিপুল পরিমাণ লবণ জমা হয়েছে। তারা জানান, উত্তরাঞ্চলে অধিকাংশ লবণ বিক্রি হয়। কিন্তু এবার ঐ এলাকার ব্যবসায়ীরা লবণ নিচ্ছে না। চট্টগ্রামের মিল মালিকরা সামান্য কিছু লবণ কিনছে। টানা কয়েক বছর মন্দার পর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার লবণের বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে বেজায় খুশী লবণ চাষিরা। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকায় মাঠভর্তি লবণ। তবে লবণের বেচা-বিক্রি না থাকায় চরম হতাশ চাষিরা। এখন লবণের ভরা মৌসুম। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রান্তিক লবণ রা ধার-দেনা করে লবণের চাষ করে থাকে। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষ করে তারা। অধিকাংশ চাষির নিজস্ব কোন জমি নেই। বর্গা ও জমি লিজ নিয়ে লবণের চাষ করে দরিদ্র চাষিরা। এবার জমি লিজের রেটও অনেক বেশি। ফলে উত্পাদন খরচ বেড়ে যায়। চাষিরা জানান, প্রতি মণ লবণের উত্পাদন খরচ পড়ছে সাদা ১৭০ টাকা আর কালো ১৬০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে সাদা লবণ ১৫০ টাকা ও কালো ১২০ টাকা।
এ প্রসঙ্গে বাঁশখালীর লবণ চাষি সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতি কানি (২০ গন্ডা) জমির খাজনা (৬ মাস) ১৬/১৭ হাজার টাকা। শ্রমিক মজুরিসহ সব মিলিয়ে প্রতি কানিতে উত্পাদন খরচ পড়ে ৪০/৪২ হাজার টাকা। আর লবণ উত্পাদন হয় ২০০ থেকে ২৫০ মণ। কিন্তু মণ ১২০ থেকে ১৪০ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না। ফলে প্রতি মণে ৫০/৬০ টাকা লোকসান হচ্ছে। কক্সবাজার জেলার কুকখাল এলাকার লবণ চাষি মাহামুদুল হক মেম্বার বলেন, ‘তিন কানি জমিতে লবণ উত্পাদন খরচ পড়ে ১ লাখ টাকা। আর লবণ উত্পাদন হয় ৭০০ থেকে ৭৫০ মণ। আর এসব লবণ বিক্রি করে সর্বোচ্চ ৯০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো ভারত থেকে লবণ এনে প্যাকেটজাত করে বিক্রি করছে। তাদের গুদামে এখনো আমদানি করা প্রচুর লবণ রয়েছে। এতে দেশে উত্পাদিত লবণ বিক্রি হচ্ছে না।’
চাষিরা জানান, বর্তমানে লবণের বেচা-বিক্রি নেই। দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর লবণ বিক্রি হয়। একটি বোটে প্রায় ১৫ হাজার মণ লবণ পরিবহন করে নিয়ে যায় তারা। কিন্তু এবার ঐ এলাকা থেকে বোট নিয়ে কোন ব্যবসায়ী লবণ কিনতে আসছে না। চট্টগ্রাম শহর ও পটিয়া এলাকায় যেসব বোটে লবণ নেয়া হয় সেগুলোতে ৭০০ থেকে ১ হাজার মণ বহন করা যায়। এখন এসব বোটে কিছু লবণ বিক্রি হচ্ছে। দাম কম হওয়ায় চাষিরাও লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করছে না। মাটির নিচে গর্ত করে ৫/৭ বছর লবণ মজুদ রাখা যায়। এতে লবণের কোন ক্ষতি হয় না।
উত্তরাঞ্চলে লবণ বিক্রি না হওয়া প্রসঙ্গে চাষিরা জানান, ঐসব এলাকায় ভারত থেকে প্রচুর লবণ আসার কথা শুনা যাচ্ছে। সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী, কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেষখালী, টেকনাফ, চকরিয়া, সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় লবণের চাষ হয়ে থাকে। প্রায় ৬২ হাজার একর জমিতে লবণের চাষ হয়।
লবণ চাষিরা জানান, ভরা মৌসুমেও দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো লবণ কিনছে না। লবণ আমদানি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান লবণ চাষিরা। নীতিমালা অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে সাদা লবণ প্রতি কেজি ৪ টাকা ৫০ পয়সা ও কালো লবণ ৪ টাকা দরে চাষিদের কাছ থেকে কেনার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এখন বিক্রি হচ্ছে কেজি ৩ টাকা ও সাড়ে ৩ টাকা। দেশে প্রায় ৩ শতাধিক লবণ মিল রয়েছে। তারাও লোকসানের আশংকায় পর্যাপ্ত লবণ কিনছে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সহ-সভাপতি নূরুল আবছার হেলালী ইত্তেফাককে বলেন, ‘লবণ নীতিমালা ঘোষণা করলেও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রান্তিক লবণ চাষিরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। আমদানি নিষিদ্ধ করে লবণ নীতিমালা নিশ্চিত করা হলে চাষিরা উপকৃত হবে।’
সূত্র জানায়, দেশে লবণের মোট চাহিদা ১৬ লাখ মেট্রিক টন। এ বছর ইতিমধ্যে প্রায় ১২ লাখ টন উত্পাদিত হয়েছে। লবণ উত্পাদনের আরো দুই মাস সময় রয়েছে। ফলে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
