রিমান্ড সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানছে না নিম্ন আদালত

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৩, ২২:৩১
রিমান্ডে দেয়ার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা তোয়াক্কা করছে না নিম্ন আদালত। সংবিধান অনুযায়ী নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের থাকলেও রিমান্ডের বিষয়ে উচ্চ আদালতের যথাযথ তদারকি নেই। এমনকি ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও পুলিশের রিমান্ড সংক্রান্ত হাইকোর্টের যুগান্তকারী নির্দেশনার রায়টি দশ বছর ধরে আপিল বিভাগে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক ও দ্রুত বিচার আইনে দায়েরকৃত পৃথক দুটি মামলায় গত ২০ মার্চ ১৫১ জন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীকে পুলিশের আবেদনক্রমে ঢাকার মুখ্য মহানগর আদালত ৮দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সঙ্গে বিরোধীদলের এতো সংখ্যক নেতাকে রিমান্ড দেয়ার নজির নেই। কিন্তু রিমান্ড দেয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা মান্য করেনি নিম্ন আদালত। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কারাগারে প্রথম দফা জিজ্ঞাসাবাদে কোন তথ্য না পাওয়া গেলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে সর্বোচ্চ তিনদিন পুলিশ হেফাজতে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। কিন্তু নিম্ন আদালত জেলখানায় জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি পুলিশের কাছে রিমান্ডে দিয়েছেন। কোন মামলায় তিনদিনের বেশি রিমান্ড না দেয়ার ব্যাপারে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও আলোচ্য ক্ষেত্রে তিনদিনের বেশি রিমান্ডে দেয়া হয়েছে। নিম্ন আদালতে হাইকোর্টের এ ধরনের নির্দেশনা অমান্যের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই অহরহ চলে আসছে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বাধ্যবাধকতামূলক কার্যকারিতার নির্দেশনা রয়েছে। এতে স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে, “আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রিম কোর্টের যে কোন বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অধঃস্তন সকল আদালতের জন্য অবশ্যই পালনীয় হইবে।” সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে আইনের সমতুল্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত সন্দেহজনক গ্রেফতার সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা এবং রিমান্ড সংক্রান্ত ১৬৭ ধারার অপব্যবহারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাষ্ট্র (ব্লাষ্ট) সহ আরো কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এক রায়ে ছয় মাসের মধ্যে এ দুটি বিষয়ে প্রচলিত আইন সংশোধনের নির্দেশ দেয়। আইন সংশোধনের পূর্বে হাইকোর্টের কয়েক দফা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সরকারকে আদেশে বলা হয়। হাইকোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়, ক. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না। খ. কাউকে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে। গ. গ্রেফতারের কারণ একটি পৃথক নথিতে পুলিশকে লিখতে হবে। ঘ. গ্রেফতারকৃতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার কারণ লিখে তাকে হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য নিয়ে ডাক্তারি সনদ আনবে পুলিশ। ঙ. গ্রেফতারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃতকে এর কারণ জানাতে হবে। চ. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেফতারকৃতের নিকটাত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে। ছ. গ্রেফতারকৃতকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে। জ. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের অভ্যন্তরে কাঁচ নির্মিত বিশেষ কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন। ঝ. কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে সর্বোচ্চ তিনদিন পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে। ঞ. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে। ট. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে। ঠ. পুলিশ হেফাজতে বা কারাগারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে। ড. পুলিশ বা কারা হেফাজতে কেউ মারা গেলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে তা তদন্তের ব্যবস্থা করবেন। মৃত ব্যক্তির ময়না তদন্ত করা হবে। ময়না তদন্তে বা তদন্তে যদি মনে হয় ওই ব্যক্তি কারা বা পুলিশ হেফাজতে মারা গেছে তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট মৃত ব্যক্তির আত্মীয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তা তদন্তের নির্দেশ দিবেন। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে এবং নির্দেশনার উপর স্থগিতাদেশ চেয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করা হয়। কিন্তু আপিল বিভাগ নির্দেশনাগুলো স্থগিতাদেশের আবেদন নাকচ করে দেয়। সুতরাং হাইকোর্টের ওই নির্দেশনা মান্য করা সকলের জন্যই বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকার, পুলিশ এমনকি খোদ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ওই নির্দেশনাগুলো মানছে না। এদিকে আড়াই বছর আগে (২০১০ সালের ১১ আগস্ট) অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এমকে রহমান আপিল বিভাগকে আশ্বাস দিয়েছিলেন হাইকোর্টের নির্দেশনা মান্য হচ্ছে কিনা ১৭ আগস্টের মধ্যে তিনি আদালতকে জানাবেন। কিন্তু তিন বছরেও তিনি তা জানাননি। আপিল বিভাগেও মামলাটি আর শুনানিতে আসেনি। যদিও এর চেয়ে অনেক কম জনগুরুত্বপূর্ণ মামলা খুবই অল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু জনস্বার্থমূলক এই মামলাটি পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর।