মঞ্চনাটক

কিংবদন্তির খনা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৪
খনা, কিংবদন্তির খনা। খনার বচন বাঙালির কৃষিজীবনে এখনো সংশয়মুক্তির পথ প্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃত। বাঙালির বর্তমান সমাজেও কৃষকের মুখে মুখে কৃষিকাজের নানা প্রথা, কোন মৌসুমে কোন ফসল, কোন সময়ে বৃষ্টি কেমন হবে, কোন সময়ে বৃষ্টি কোন ফসলের জন্য কেমন এবং ফসলের উত্পাদন সম্পর্কিত খনার বিবিধ বচন ঘোরাফেরা করে। যেমন:‘ষোল চাষে মূলা তার অর্ধেক তুলা/ তার অর্ধেক ধান বিনা চাষে পান; থোড় তিরিশে ফুল বিশে/ ঘোড়ামুখো তের দিন/ দেখে-শুনে ধান কিন্; থেকে গরু না বায় হাল/ তার দুঃখ চিরকাল; ব্যাঙ ডাকে ঘনঘন/ বৃষ্টি হবে শীঘ্র জানো; আষাঢ়ে রোঁয়া শ্রাবণে পোয়া/ ভাদ্রে যুবা, আশ্বিনে বুড়া/ কার্তিকে দেয় উড়া’—এমন হাজারো বচন আজও কৃষকসমাজের মানুষের কাছে খনার বচন হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই কিংবদন্তির ‘খনা’ কে? খনার অন্য নাম লীলাবতী। খনা জ্ঞান ও সত্যের অসাধারণ এক নারী সাধক, সমকালীন বিদুষী জ্যোতিষী। তাঁর পিতার নাম অনাচার্য (বাংলাপিডিয়া)। স্বামী মিহির ও শশুর বরাহ মিহির সকলেই কিংবদন্তি চরিত্র। কিংবদন্তি আছে তাঁর জন্মস্থান, সময়কাল ও বসবাস নিয়েও। এর মধ্যে বেশি প্রচলিত উড়িষ্যার রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজসভা এবং বাংলার চন্দ্রকেতু গড়ের রাজা ধর্মকেতুর রাজসভা। দুটি কিংবদন্তিতেই একই খনার উল্লেখ। ঘটনাও প্রায় এক। ক্ষেত্রবিশেষে স্থান, রাজসভা, তাঁর খনা হয়ে ওঠা, জন্ম ও বেড়ে ওঠা, পিতা-মাতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তবে খনা নাটকের নাট্যকার সামিনা লুত্ফা নিত্রা এসব বিষয় মাথায় রেখেই অত্যন্ত সচেতনভাবে তুলে এনেছেন চন্দ্রকেতু গড়ের খনাকে। বালহন্ডার দেউলনগর, বেড়াচাঁপা, জীবনপুর, দেগঙ্গা, পৃথিবীগুনা, ঝিকরা, হাড়োয়ার অনার্য কৃষক-অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে চন্দ্রকেতুগড়, যা এখন ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক সংগঠন ‘আনন্দন’-এর একযুগ পূর্তি উপলক্ষে গত ২০ মার্চ সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে তৃতীয়বারের মতো মঞ্চায়িত হয়ে গেল নাটক ‘খনা’। নাটকটির এটি ৩০তম প্রদর্শনী; প্রযোজনা করেছে ‘বটতলা’ আর নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার। জন্ম সত্য মৃত্যু জীবন লক্ষ্য পথ/ প্রণাম জন্ম পাপ পুণ্য সত্য/.../ সব পথ মত যা থেকে সত্য-মিথ্যার/ যে কোথাও পৌঁছানো যায়/ সকলি আরাধ্য হয়/ যদি গাই গান মানবের—এমন গানের মাধ্যমে সব কুশীলবের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে নাটকটি শুরু হয়। শুরুতেই উঠে আসে ইছামতী আর ভাগিরথী নদীবিধৌত প্রাচীন ভূমি গঙ্গারিদ্ধি, অনার্য কৃষক-অধ্যুষিত বালহন্ডা অঞ্চলের বয়ান। প্রায় চোদ্দ-পনের বছর আগে বালহন্ডার দেউলনগরের রাজা ধর্মকেতুর রাজজ্যোতিষী ছিলেন বরাহ মিহির। একদিন তার ছেলে মিহিরের কুষ্ঠি ভুল গণনা করে তাকে তামার পাত্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বিদ্যাধরীর জলে। পঁচিশ বছর পর লঙ্কাদ্বীপের রাজকন্যা খনা মিহিরকে নিয়ে বরাহ মিহিরের সামনে হাজির হয়ে তাঁর গণনা ভুল প্রমাণ করে। এরপর খনা ও মিহির ধর্মকেতুর রাজসভায় রাজসভাসদ পদ লাভ করে। খনা তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে। একসময় খনা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কারণে বরাহের রোষানলে পড়ে। বরাহ খনার এই উত্থান মেনে নিতে পারে না। ক্রুদ্ধ বরাহ ছেলে মিহিরকে আদেশ দেয় খনার জিহ্বা কেটে তাকে উত্সর্গ করতে। নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দারের অনবদ্য নির্দেশনা আর কুশীলবদের হূদয়কাড়া অভিনয়ে ‘সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চ’-এর দর্শকেরা মুগ্ধতার গহিনে তলিয়ে যায়। খোলা আকাশের নিচে চাঁদ আর নক্ষত্ররাজির আলোয় সৃষ্টি হয় স্নিগ্ধ পরিবেশ। দর্শক এমন পরিবেশে নাটক দেখে এক কিংবদন্তি আর বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের একটা অধ্যায় পাঠের সুখস্মৃতি নিয়ে ঘরে ফেরে। নাটকটিতে দৃশ্য-বিভাজন, মঞ্চ ও আলোক-পরিকল্পনা, সুর ও সংগীত, কোরিওগ্রাফ এবং পোশাক-পরিকল্পনা সবাইকে মোহিত করেছে।