চারপাশ ধুলার চাদরে ঢেকে ঠান্ডা গাড়ির মিছিল এগিয়ে চলছে। বেশ আয়েসি ঢঙে হেলান দিয়ে বসে আছেন মন্ত্রী মহোদয়। আগে-পিছে নিরাপত্তার ছায়ায় ঢাকা। তারও আগে হোন্ডার শোভাযাত্রা। আস্তর উঠে যাওয়া ছেঁদালো রাস্তায় কোমর দুলিয়ে এগোচ্ছে ঠান্ডা গাড়ি। মন্দ লাগছে না মন্ত্রীর। বরং আরামে চোখ বুঁজে আসছে। আরামে এমনটা হয়। মানুষ গা ছেড়ে দিয়ে বসে। মন্ত্রীও সেভাবেই বসে আছেন।
গাছের ডালে রশি দিয়ে পিঁড়ি বেঁধে দোল খাওয়া কৈশোরের কথা মনে পড়ছে তাঁর। মনের আনন্দে গান গাইতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু উপায় নেই। মন্ত্রী বলে কথা। সঙ্গী-সাথি, আমলা-কামলা, চেলা-বেলা সঙ্গে রয়েছে। রয়েছে সাংবাদিক ভাইয়েরা। কিছু চাটুকার তো সদা-সর্বদা চারপাশে মিউ মিউ করে। তবুও একটু গুনগুন করা যেত যদি সাংবাদিক না থাকত। কোনোভাবে ঠোঁট ফাঁক হলে পরদিন সংবাদপত্রে হেডলাইন হবে—‘বিবর্ণ রাস্তার করুণ দশায় মন্ত্রীর বাকবাকুম’।
আমাদের মন্ত্রী অবশ্যই আধুনিক, অত্যাধুনিক; যার পরিবর্ধিত নাম ‘ডিজিটাল’। স্বীয় কাজে উন্নতি করতে না পারলেও ‘প্রচারেই প্রসার’-এর মর্মবাণী তিনি হূদয়ে ধারণ ও লালন করেন। আর এ কারণে যেখানেই যান সাংবাদিক ভাইদের তিনি আগে-ভাগে রাখেন।
হঠাত্ সজোরে ব্রেক। উল্টে যেতে যেতে কোমর সোজা করে দাঁড়ায় ঠান্ডা গাড়ি। মন্ত্রীর তন্দ্রা এসেছিল বোধহয়। তিনি চরম বিরক্ত। মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারেন না, কী হয়েছে। ঘোর কেটে গেলে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নিচে নামেন। সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ড টান করে চারপাশে দাঁড়ান সঙ্গীরা।
সর্বনাশ! কী সাংঘাতিক! আর একটু হলে তো গাড়ি উল্টে যেত। কোথাও লাগেনি তো স্যার? এক চাটুকারের মুখে খই ফোটে।
মন্ত্রী বলেন—না, না। তেমন কিছু না।
আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি, স্যার। এত বড় একটা দুর্ঘটনা থেকে আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করেছেন, লাখ লাখ শুকরিয়া তাঁর দরবারে। আমি বাসায় গিয়েই এ জন্য দু-রাকাত নফল নামাজ পড়ব, স্যার।
একটু দম নেন মন্ত্রী। ক্ষণকাল অপেক্ষা করেন। চারপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার ক্যামেরাগুলো ততক্ষণে সচল হয়ে উঠেছে। হঠাত্ চেহারায় আমূল পরিবর্তন আসে মন্ত্রীর। তিনি হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন—এই রাস্তার ঠিকাদার কে?
অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মৃদু স্বরে পাশ থেকে একজন বলে—স্যার, এর ঠিকাদার জসিম ভাই।
কোন জসিম?
আমাদের এই এলাকার ছাত্রনীতির সভাপতি।
ও...।
কাজটা উনি করতেছেন না স্যার। যুবনীতির আহ্বায়ক কামাল ভাইকে সাব-কন্টাক্ট দিয়েছেন।
ওকে, সে কি আছে এখানে?
না স্যার, কামাল ভাই কাজটা একজন ঠিকাদারকে সাবের সাব দিয়েছেন।
সাবের সাব! মন্ত্রী হতবাক। কী বলবেন, ভেবে পাচ্ছেন না।
গাছ থেকে ডাল হয়ে শাখা। এরপর প্রশাখা হয়ে পাতা পর্যন্ত কাজের সুবিন্যস্ত বিস্তৃতি দেখে মন্ত্রী খুশি না বেজার হলেন, বোঝা গেল না। তিনি এ দিক-ও দিক তাকিয়ে উচ্চারণ করলেন—বাহবা, বাহ।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনকে দেখিয়ে একজন বলে—স্যার, কামাল ভাই এখানে আসেন না। কাজটা দেখাশোনা করেন এনারা।
ওরা কারা?
প্রকৌশলী।
চোখ লাল হয়ে ওঠে মন্ত্রীর। ফুলে-ফেঁপে আয়তন বাড়ে নাকের। প্রেসারটাও বোধহয় পাল্লা দিয়ে বলগা হরিণের মতো ছুটতে চাইছে। ঘাড়ের রগটা কেমন যেন টপকাচ্ছে। তিনি সতর্ক হন। কিছুতেই উত্তেজিত হওয়া যাবে না। তবে এটাও ঠিক, কিছুটা একটা করতেই হবে। ক্যামেরা ওপেন। চমক দেখাতে হবে ‘চমক’। কিন্তু সেটা কী? জসীম ও কামাল দলীয় লোক। দলীয় লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। প্রকৌশলীদের দিকে তাকিয়ে দাঁত কামড়ে মন্ত্রী বলেন—দে আর সাসপেন্ডেড।
২.
ঠান্ডা মাথার মানুষ আফসার উদ্দিন। নেতা হওয়ার পর থেকে কখনো উত্তেজিত হয়েছেন এমন নজির নেই। মাথা গরমেরা কিছুই করতে পারে না। রাগলেন তো হেরে গেলেন। সৃষ্টির পর থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত সত্ কিংবা অসত্ কাজ হয়েছে, ঠান্ডা মাথায়ই হয়েছে। উত্তেজিত মস্তিষ্ক অনুর্বর ও ক্ষতিকর। স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই।
ইজি চেয়ারে চোখ বুঁজে বসে আছেন আফসার উদ্দিন। হঠাত্ কেউ দেখলে ভাববেন, নেতা ঘুমাচ্ছেন। কিন্তু তিনি ঘুমাচ্ছেন না। আশপাশে কী হচ্ছে, কে কী করছে—সব তাঁর নখদর্পণে। তবে যখন চোখ বুঁজে বসে থাকেন, তখন তিনি খুবই ভয়ঙ্কর। যাঁরা অতি কাছের তাঁরা জানেন, নেতা তখন কোনো জটিল ছক আঁকেন সহজ করে।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রাসু এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চোখ না খুলেই নেতা বললেন—টেবিলে রাখ। নেতা কথা বলেন সংক্ষেপে। এলাকায় সদালাপী ও মিষ্টভাষী হিসেবে তাঁর বেশ সুনাম আছে।
টুন্ডা রহিম দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ। মুখে টু শব্দটি নেই। আগ বাড়িয়ে নেতাকে কিছু বলার নিয়ম নেই।
চোখ খুলে চায়ের কাপ হাতে নিলেন আফসার উদ্দিন। চুমুক দিলেন। কাপটা টেবিলের ওপর রেখে জিহ্বাকে এমনভাবে নাড়ছেন যে, চুক চুক শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে চা নয়, রসমালাই খাচ্ছেন তিনি। টুন্ডা রহিমের দিকে তাকাতেই দৌড়ে সে সামনে এসে বলল—আবদুল হাদি ইট্টু কাঁপকাঁপ শুরু করছিল। উপায় ছিল না, সাইজ কইরা দিছি।
ঘাড় কাত করে টুন্ডা রহিমের দিকে তাকালেন আফসার উদ্দিন। বললেন—পবিত্র কামটারে অপবিত্র...।
টুন্ডা খুব দ্রুত বলল—না না, তেমন কিছু না। হাতে দাগ না লাগাইয়া যা করা যায়।
আর?
মন্টু বেপারী কয়, তার চাঁদাটা ইট্টু কমাইতে।
আঁেক উঠলেন আফসার উদ্দিন। জিহ্বায় কামড় দিলেন। যেন চরম আপত্তিকর ‘চাঁদা’ শব্দটি জীবনে প্রথম শুনলেন। এর অর্থ জানতে চাইলেন তিনি।
ভুল হইছে নেতা। আর কমু না। নেতা কিছু বলার আগেই ভুলের মাশুল হিসেবে নিজের কান ধরে তিনবার উঠ-বস করল টুন্ডা রহিম। আফসার উদ্দিন বললেন—কত ধরা হইছে মন্টুুর?
এক লাখ।
আমরা যেন কয়টা তোরণ নির্মাণ করব?—জানতে চাইলেন আফসার উদ্দিন।
বিশটা—টুন্ডা বলল।
বাজেট?
দুই লাখ।
ডানদিকে হাত বাড়াতেই তড়িঘড়ি মোবাইল ফোনটা আফসার উদ্দিনের হাতে দিলেন টুন্ডা। নম্বর টিপে কানে চেপে ধরলেন। রিসিভ করলে তিনি বললেন—মন্টু, ভালো আছ?
ও পাশ থেকে কী জবাব এল কিংবা আদৌ কথা বলল কি না, বোঝা গেল না। নেতা বললেন—টুন্ডা একটা হারামজাদা, বেয়াদব। তোমার কাছে চাঁদা চায়! কথাটা শুইনা আমার প্রেসার হাই হইয়া গেছে। কান-চাপায় একটা দিলা না ক্যান? শোনো মন্টু, মন্ত্রী আইব আমাগো এলাকায়। কত বড় ইজ্জতের কথা, কও? সিদ্ধান্ত নিছি আমরা মন্ত্রীকে সংবর্ধনা দিব। কালকের মধ্যে বিশটা তোরণ তৈরি করে দিবা।
মোবাইল রেখে দিলেন আফসার উদ্দিন। বললেন—টুন্ডা, মঞ্চ তৈরির কাজ ধর। আর সব স্কুলের হেডমাস্টারকে বুঝাইয়া বলছস—কী করতে হইব?
জি।
ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন আফসার উদ্দিন। হাত-ইশারায় টুন্ডাকে চলে যেতে বললেন।
৩.
মন্ত্রীর আগমন/ শুভেচ্ছা-স্বাগতম; শুভেচ্ছা-স্বাগতম/ মন্ত্রীর আগমন; শহর কিংবা বন্দরের/ মন্ত্রী মোদের আদরের; শুভ শুভ শুভ দিন/ মন্ত্রীর কাছে আছে ঋণ; সাবাস সাবাস সাবাস ভাই/ এমনই তো মন্ত্রী চাই; ধন্য আমরা ধন্য রে/ মন্ত্রী সাবের জন্য রে।
মন্ত্রী আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে চরণধুলি দেবেন এলাকায়। অথচ এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে স্কুলের শিশুদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আজ স্কুলে কোনো ক্লাস হয়নি। অলিখিত ছুটি। প্রতিটি স্কুলে সেভাবেই বার্তা পাঠানো হয়েছে। প্রধান শিক্ষককে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যেন ছাত্রছাত্রী হাজির থাকে।
মিছিলকারীরা চেঁচাচ্ছে। যাকে বলে গলা ফাটিয়ে চিত্কার। মিছিলের মাঝে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করার মধ্যে আনন্দ আছে। অন্য সময় এভাবে চেঁচানো যায় না। কেউ বুঝে, আর কেউ না বুঝে শুধুই লাফায়। এ মুহূর্তে স্লোগানের সঙ্গে শুরু হয়েছে হাততালি। যেন কোনো উত্সব; মহাউত্সব। মহা আনন্দের দিন। ঈদ আনন্দের দিন—সে দিনও মানুষ এভাবে আনন্দ করে না। নতুন জামা-কাপড় পড়ে কেবল ঘোরে।
ভরা আষাঢ়। অথচ বৃষ্টির দেখা নেই। নদীতে পানি নেই। বৈরী আবহাওয়ায় সব তছনছ। অসময়ে বন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস। বই-পুস্তকে এখনো ছয় ঋতুর দেশ। আসলে এখন ঋতু কয়টি, নতুন করে ভাবা উচিত। আকাশ তো নয় যেন মাথার ওপর তপ্ত কড়াই। এমন আগুনঝরা রোদে রাস্তার দু-পাশে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে কচি শিশুরা। সকলের হাতে পতাকা। কারও হাতে বেলুন। শুভেচ্ছা-স্বাগতম লেখা ব্যানার, ফেস্টুনের বাহারি ঝিলিক। শিশুদের কথা কেউ ভাবছে না। সবার ভাবনা মন্ত্রী কখন আসবেন।
মিছিল ও স্লোগানধারীদের মধ্যে হঠাত্ ভাটা। এ মুহূর্তে কেউ চেঁচাচ্ছে না। ওদের দলীয় নেতা বলেছেন—ব্যাটারিতে চার্জ দিতে। অর্থাত্ কিছু খেয়ে নিতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারা কেউ খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে না। হুমড়ি খেয়ে পড়ছে পানির ওপর। দু-একজন খাবার হাতে নিয়েছে মাত্র। এরই মধ্যে কে একজন এসে বলল—আইতাছে, মন্ত্রীর গাড়ি আইতাছে। ওই যে ওই যে। সঙ্গে সঙ্গে সকলের দৃষ্টি সেদিকে—যেন ঈদের চাঁদ দেখা গেছে।
৪.
চারপাশে হুল্লোড়; দৌড়াদৌড়ি। ঝিমিয়ে পড়া নেতা-কর্মীরা হঠাত্ তটস্থ; মহাব্যস্ত। এই এখানে কেন, দূরে যাও, সইরা খাড়াও, এটা করো, ওটা করো—খই ফুটছে মুখে। গত কদিন ধরে যাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে, অনুরোধ করে, আবার কাউকে ধমক দিয়ে এখানে জড়ো হতে বাধ্য করা হয়েছে তাদের কাউকে অযথা ধাক্কা, কাউকে ধমক দিচ্ছে কর্মীরা।
গাড়ি দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রীর গাড়ি। ওই যে পতপত করে উড়ছে পতাকা।
মন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দিয়ে এগিয়ে আসছে ৫০টি হোন্ডা। সামনে ২০, ডানে ১০, বাঁয়ে ১০ এবং পেছনে রয়েছে আরও ১০টি হোন্ডা। প্রতিটিতে দুজন করে ১০০ রাজনৈতিক কর্মী। হোন্ডার পেছনে যে বসে আছে, সে ক্রমাগত ভুভুজেলা ফুকিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে মহাপ্রলয় ঘটে যাবে আজ।
কান ঝালাপালা শব্দে চারপাশ কাঁপিয়ে মন্ত্রীর গাড়ি এসে থামল। তিনি নামলেন। আফসার উদ্দিন হাত বাড়িয়ে কুশলবিনিময় করলেন। লাল গালিচা মাড়িয়ে মঞ্চে উঠলেন মন্ত্রী। তুমুল করতালির মাধ্যমে বরণ করা হলো তাঁকে।
মঞ্চে বসে কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্বস্তিতে পড়লেন মন্ত্রী। প্রচণ্ড গরম লাগছে। ঘামছেন তিনি। ঠান্ডা অফিস, ঠান্ডা বাসা, এমনকি গাড়িও ঠান্ডা। ২৫-এ অভ্যস্ত শরীর ৩৪ ডিগ্রি সহ্য করতে পারছে না। যদিও দু-পাশে দুটি জিএফসি শোঁ শোঁ শব্দে ঘুরছে উল্কার বেগে। পাশে বসা আফসার উদ্দিনকে ফিসফিস করে কিছু বললেন মন্ত্রী। তাঁর ইশারায় মন্ত্রীর পেছনে আরও একটি জিএফসি এল। তবে এই অস্বস্তির মাঝেও আয়োজন, লোকসমাগম—সর্বোপরি আতিথেয়তায় মন্ত্রী সন্তুষ্ট।
এলাকার নেতা-পাতি নেতাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতা, হূদয় নিংড়ানো ভালেবাাসার বহিঃপ্রকাশ এবং ভূয়সী প্রশংসায় মন্ত্রী যারপরনাই মুগ্ধ, অভিভূত।
তিনটি ফ্যানের বাতাসেও মন্ত্রী ঘামছেন। অথচ এ কী! ভ্যাপসা গরমে ঘর্মাক্ত শরীরে হঠাত্ শীত শীত লাগছে। কিন্তু উপায় নেই। এমন জম্পেস মজলিসে কিছু না বলে বসে থাকেন কী করে মন্ত্রী? সিট ছেড়ে উঠলেন তিনি। এবার জনতার উদ্দেশে মহামূল্যবান বাণী দেবেন। মন্ত্রীর সামনে মাইক্রোফোন হাজির।
ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত ও অভিভূত মন্ত্রী বক্তৃতা দিলেন। আশার কথা শোনালেন। ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তায় কার্পেট মুড়ে সিঙ্গাপুর বানানোর প্রতিশ্রুতিও দিলেন।
সোনায় মোড়ানো দলীয় প্রতীক নিয়ে তৈরি আফসার উদ্দিন। প্রতীক ধরে দাঁড়িয়েছেন হাস্যোজ্জ্বল মন্ত্রী। ক্লিক ক্লিক—ফ্ল্যাশের আলোর ঝলকানিতে চোখ ঝলসে যাচ্ছে। একসঙ্গে সব টিভি ক্যামেরাগুলো সচল হলে পরিস্থিতি আরও গুমোট হয়ে ওঠে। তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এরই মধ্যে আকাশ ফাটিয়ে বাতাস কাঁপিয়ে ভেসে আসে—দাঁড়ান, একটু থামেন, মাননীয় মন্ত্রী।
হঠাত্ গলাফাটা চিত্কারে বিব্রত মন্ত্রী; বিরক্তও। এ আবার কিসের আলামত? শুভ কাজে অশুভ ছায়া। সবার দৃষ্টি ঘুরে যায় মঞ্চের ওপর থেকে। ঘুরে যায় ক্যামেরার চোখগুলোও। এগিয়ে আসছেন এক নারী। রক্তে রাঙানো হাতে বুক চাপড়ে বিলাপ করতে করতে এগিয়ে আসছেন। আরও কাছাকাছি এলে মন্ত্রীর পাওয়ার চশমা চিনতে পারে তাকে। প্রতীক ফেলে দৌড়ে আসেন মন্ত্রী।
এ কী! তুমি? কী হয়েছে? হাতে রক্ত কেন?
আমারও তো একই প্রশ্ন, মাননীয় মন্ত্রী।
কী হয়েছে, আনু?
স্ত্রীর হাত ধরেন মন্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়েন তিনি। পানি, ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স—বিমর্ষ মন্ত্রীর চিত্কার। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই নির্বাক। ছুটতে থাকে সবাই যে যার মতো।
এরই মাঝে এগিয়ে আসছেন মন্ত্রীর ভাই। সাদা কাপড়ে মোড়া কী তাঁর কোলে? মন্ত্রীর চোখ বস্ফািরিত। তিনি এসে মন্ত্রীর পায়ের কাছে কাপড়ে মোড়ানো কিছু রাখেন। এরপর কান্নায় ভেঙে পড়েন। মন্ত্রীর বুকে তোলপাড়। কী আছে সাদা কাপড়ে মোড়ানো। তিনি কাপড় সরিয়ে চিত্কার করে ওঠেন। হায় আল্লাহ এ কী! এ যে আমার বুকের মানিক।
ততক্ষণে সংজ্ঞা ফিরেছে আনোয়ারার। তিনি বলেন—দেখো, ভালো করে দেখো চিনতে পারো কি না, এ কার মুখ। মাননীয় মন্ত্রী, তারেক মাসুদ কিংবা মুনীরের রক্ত তোমাদের নাড়া দেয়নি। বিচলিত করেনি মিরসরাইয়ের ৪৭ শিশুর রক্তগঙ্গা। কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিয়েছ বলে জানা নেই। এবার, এবার কী করবে? নিজ সন্তানের বুকের রক্ত কি তোমাকে নাড়া দেবে না?
পত্রপত্রিকা, রেডিও-টিভিতে বড় বড় বুলি শুনতে চাই না। মিথ্যে লোক দেখানো বাহবা চাই না। আমাকে, এই জাতিকে, এই দেশকে একটি নিরাপদ সড়ক দাও, একটি নিরাপদ সড়ক।
