অনুবাদ :আন্দালিব রাশদী
তোমার সাথে চমত্কার মানাবে এমন একটি মেয়ে আমি খুঁজে পেয়েছি—ওগোয়ে এনওয়েকে; আমাদের প্রতিবেশী জ্যাকব এনওয়েকের বড় মেয়ে। খাঁটি খ্রিষ্টান ধর্মমতে তাকে লালন- পালন করা হয়েছে। ক-বছর আগে যখন মেয়েটি স্কুল ছেড়ে আসে, তার বাবা (অত্যন্ত খাঁটি বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ) তাকে একজন ধর্মযাজকের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে স্ত্রী হবার জন্য যেসব যোগ্যতা অর্জন করা প্রয়োজন, তার সবই সে অর্জন করেছে
‘তুমি এখনো বাবাকে লেখোনি?’ এক বিকেলে ১৬ কাসাঙ্গা স্ট্রিট, লাগোস-এ তার রুমে এননেমেকার সাথে বসে কথাটা তাকে জিজ্ঞেস করল নেনে।
‘না, আমি এটা নিয়ে ভাবছিলাম। আমার মনে হয়, যখন ছুটিতে বাড়ি যাব তখন বসাটাই ভালো হবে।’
‘কিন্তু তা কেন? বাবার কাছ থেকে এত দূরে থাকো, এখনো তো আরও ছয় সপ্তাহ। আমাদের সুখে তার এখনই ভাগ বসানো উচিত।’
এননেমেকা কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইল, তারপর খুব ধীরে ধীরে এমনভাবে বলতে শুরু করল যেন শব্দের জন্য হাতড়াচ্ছে—‘আমি তো তা-ই আশা করি, কিন্তু আমি যদি নিশ্চিত জানতাম এটা তার জন্য সুখের হবে।’
‘অবশ্যই হবে’, একটু বিঘ্নিত হয়ে নেনে বলল, ‘কেন হবে না?’
‘তুমি তো সারাটা জীবন লাগোসেই কাটিয়েছ, দেশের দূরের অঞ্চলগুলো সম্পর্কে তোমার জ্ঞান সামান্যই।’
‘এ কথা তো তুমি সব সময়ই বলছ। নিজের ছেলে যখন বিয়ের জন্য বাগ্দান করছে আর সব বাবার মতো তোমার বাবা খুশি হবেন না—এটা আমি মোটেও বিশ্বাস করি না।’
‘বাগ্দানের ব্যাপারটা যখন তাদের নিজেদের আয়োজনে হয় না, তারা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। আর আমাদের বেলায় সমস্যাটা তো আরও জটিল, তুমি আমাদের ইবো সম্প্রদায়ের নও।’
কথাটা এতটা গুরুত্বের সাথে এমন চাঁছা-ছোলাভোবে বলেছে যে, নেনে তাত্ক্ষণিকভাবে বাকশূন্য হয়ে পড়েছে। এই নগরের কসমোপলিটান পরিবেশে এটা তার কাছে সবসময়ই হাস্যকর মনে হয়েছে যে, কে কাকে বিয়ে করবে, তা ঠিক করবে দেবে গোত্র।
শেষ পর্যন্ত সে বলল, ‘শুধু সে কারণেই তোমার বাবা বিয়েতে বাধা দেবেন, তুমি নিশ্চয়ই তা বলতে চাওনি। আমার সব সময়ই মনে হয়েছে তোমরা ইবোরা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে খুব উদার।’
‘তা অবশ্যই ঠিক। কিন্তু যখন বিয়ের কথাটা আসে, ব্যাপারটা কিন্তু সোজা নয়’, সে বলল, ‘আর এটা যে কেবল ইবোদের বেলাতেই তা নয়। তোমার বাবা যদি জীবিত থাকতেন আর ইবিবিত্তদের মাঝখানে বাস করতেন তিনিও ঠিক আমার বাবার মতোই করতেন।’
‘আমি তা জানি না। যে করেই হোক, তুমি যেহেতু তোমার বাবার এত আদরের, আমি নিশ্চিত তিনি শিগগির তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন। তাহলে এখনই ভালো ছেলে হয়ে বাবাকে একটা চমত্কার চিঠি পাঠিয়ে দাও।’
‘চিঠি লিখে খবরটা তাকে দেওয়া ঠিক হবে না। চিঠি যে তাকে অনেক বড় আঘাত দেবে, আমি তা নিশ্চিত।’
‘বেশ লক্ষ্মীটি, তোমার মতো করেই এগোও। তোমার বাবাকে তুমি চেন।’
সেই সন্ধ্যায় হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে এননেমেকা বাবার বিরোধিতা কীভাবে ডিঙিয়ে সামনে যাবে, তা-ই ভাবছিল—বিশেষ করে সে শহরে চলে আসার পর তিনি যেখানে তার জন্য একটি মেয়ে দেখে রেখেছেন। একবার ভেবেছে, বাবার চিঠিটা নেনেকে দেখাবে, নতুন করে আবার যখন ভাবল, ঠিক করল চিঠিটা দেখানো ঠিক হবে না। অন্তত এখন নয়। বাড়ি ফিরে চিঠিটা আবার পড়ল, একা একা না হেসে পারল না। ওগোয়ের কথা তার খুব মনে আছে। এমন লড়াকু মেয়ে, ছেলেদের ধরে ধরে পেটাত; সে নিজেও তার মার খেয়েছে। কিন্তু স্কুলে সে একেবারে অঘামার্কা।
‘তোমার সাথে চমত্কার মানাবে এমন একটি মেয়ে আমি খুঁজে পেয়েছি—ওগোয়ে এনওয়েকে; আমাদের প্রতিবেশী জ্যাকব এনওয়েকের বড় মেয়ে। খাঁটি খ্রিষ্টান ধর্মমতে তাকে লালন-পালন করা হয়েছে। ক-বছর আগে যখন মেয়েটি স্কুল ছেড়ে আসে, তার বাবা (অত্যন্ত খাঁটি বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ) তাকে একজন ধর্মযাজকের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। সেখানে স্ত্রী হবার জন্য যেসব যোগ্যতা অর্জন করা প্রয়োজন, তার সবই সে অর্জন করেছে। তার সানডে স্কুলের শিক্ষক আমাকে বলেছে, মেয়েটি খুব সাবলীলভাবে বাইবেল পড়ে যেতে পারে। ডিসেম্বরে তুমি যখন বাড়ি আসবে, আশা করি তখন থেকে এই বিয়ের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা শুরু করতে পারি।
লাগোস থেকে ফেরার পর দ্বিতীয় সন্ধ্যায় এননেমেকা বাবার সাথে ডালপালা ছড়ানো একটি গাছের নিচে বসল। এটাই বুড়োর বিশ্রাম নেবার জায়গা—ডিসেম্বরের আগুন-রোদের শেষে যখন তাজা ফুরফুরে বাতাস পাতার ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তিনি এখানে বসে বাইবেল পড়েন।
এননেমেকা হঠাত্ বলে উঠল, ‘বাবা, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।’
বিস্মিত হয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক্ষমা! কিসের ক্ষমা, বাবা?’
‘ব্যাপারটা আমার বিয়ের ব্যাপার নিয়ে।’
‘বিয়ে নিয়ে কিসের ব্যাপার?’
‘আমি পারব না, মানে এনওয়েকের মেয়েকে বিয়ে করা আমার পক্ষে অসম্ভব।’
‘অসম্ভব? কেন?’ বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমি তো তাকে ভালোবাসি না।’
তিনি বললেন, ‘কেউ বলেনি তুমি তাকে ভালোবাসো। তুমি তাকে ভালোবাসতে যাবে কেন?’
‘বাবা, বিয়ে আজকাল অন্যরকম...’
তিনি ছেলের কথায় বাধা দিয়ে বললেন, ‘আমার কথা শোনো বাবা, কোনো কিছুই অন্যরকম হয়ে যায়নি। একজন পুরুষ তার স্ত্রীর মধ্যে খোঁজে ভালো চরিত্র আর খ্রিষ্টধর্মের শক্ত ভিত্তি।’
এননেমেকা দেখল এ পথে যুক্তি দেখিয়ে কোনো লাভ নেই।
তখন বলল, ‘তার ওপর আমি অন্য একটি মেয়েকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি; ওগোয়ের যত ভালো গুণ, সবই তার আছে, আর সে...’
তার বাবা নিজের মনকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। ধীরে এবং নৈর্ব্যক্তিক স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী বললে?’
ছেলে বলল, ‘সে ভালো খ্রিষ্টান আর লাগোসে মেয়েদের স্কুলের শিক্ষক।’
‘কী বললে, শিক্ষক? তুমি যদি শিক্ষক হওয়াটাকে ভালো স্ত্রীর গুণ মনে করে থাকো তাহলে কথাটা তোমাকে বলতেই হচ্ছে; শোনো, খ্রিষ্টান নারীর শিক্ষক হওয়া উচিত নয়। করিন্থিয়ানদের কাছে লেখা চিঠিতে সেন্ট পল বলেছেন, মেয়েদের নীরব থাকতে হবে।’
তিনি ধীরে ধীরে তাঁর আসন ছেড়ে উঠে একবার সামনের দিকে, একবার পেছন দিকে গেলেন। এটা তাঁর খুব প্রিয় বিষয়। যেসব চার্চগুরু মহিলাদের স্কুলশিক্ষক হতে উত্সাহ দেন তিনি তাঁদের ভয়ঙ্কর নিন্দা করে থাকেন। ক্লান্তিকর লম্বা ধর্মোপদেশ দিতে যখন তাঁর আবেগ নিঃশেষ হয়ে এল, তিনি ছেলের বাগ্দানের বিষয়ে ফিরে এলেন। আপাত-কোমল স্বরে
জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা, সে কার মেয়ে?’
‘সে নেনে আটাঙ্গ।’
‘কী বললে?’ তাঁর কোমল স্বর তখনই মিলিয়ে গেল, ‘তুমি কি নেনে আটাঙ্গ বলেছ, এর মানে কী?’
‘কালাবারের নেনে আটাঙ্গ। সে-ই একমাত্র নারী, যাকে আমি বিয়ে করতে পারি।’ এটা খুব তড়িঘড়ি করে দেওয়া একটি জবাব। এননেমেকা অনুমান করতে পারছে এর পর কেমন বজ পাত ঘটবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ঘটল না। তার বাবা হেঁটে হেঁটে নিজের রুমে চলে গেলেন। এটা সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত। এননেমেকা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। সে জানে, তার বাবার নীরবতা তাঁর হুমকির ঝড়ের চেয়ে হাজার গুণ ভয়াবহ। সে রাতে বুড়ো মানুষটি খাবার মুখে তোলেননি।
একদিন পর তিনি যখন এননেমেকাকে ডেকে পাঠালেন, তিনি তাকে এই বিয়ে থেকে নিরস্ত করতে সব ধরনের চেষ্টাই করলেন। কিন্তু এই যুবকের হূদয় যে পাষাণের মতো অনড়! ছেলে গোল্লায় গেছে ভেবে বাবা শেষপর্যন্ত সব আশা ছেড়ে দিলেন।
‘বাবা, কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল—এটা তোমাকে দেখিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব। যে এই চিন্তা তোমার মাথায় ঢুকিয়েছে, সে আসলে তোমার গলা কেটেছে। এটা শয়তানের কাজ।’ তিনি হাত উঁচিয়ে ছেলেকে বিদায় হবার পথ দেখিয়ে দিলেন।
ছেলে তবুও বলল, ‘বাবা, তুমি যদি নেনেকে জানতে তাহলে তোমার মত পাল্টাতে।’ জবাব এল, ‘আমি কখনো তাকে দেখতে চাই না।’
সে রাত থেকে ছেলের সাথে তেমন কথা আর বলেননি বাবা। কিন্তু ছেলে যে কোন মহাবিপদের দিকে পা বাড়িয়েছে—এ চিন্তা কখনো মাথা থেকে সরাতে পারেননি। দিন-রাত ছেলে তাঁর প্রার্থনায় রয়েই যায়।
বাবার কষ্ট এননেমেকাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তবে সে আশা করে, এই কষ্ট একদিন কেটে যাবে। তার গোত্রের কেউ যদি এর আগে ভিন্ন ভাষার কোনো নারীকে বিয়ে না করত, তা হলে এতটা আশাবাদী সে হতে পারত না। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর তাদের একজন বুড়ো বলল, ‘এমন তো কখনো শোনা যায়নি।’ এই ছোট একটি বাক্যে তিনি তাঁর গোত্রের সবার কথা ব্যক্ত করেছেন। এই বুড়ো অন্যদের নিয়ে ওকেকের সমব্যথী হতে এসেছেন, তত দিনে তাঁর ছেলের আচরণের কথা রাষ্ট্র হয়ে গেছে। এর মধ্যে ছেলে লাগোসে ফিরেও গেছে।
দুঃকে মাথা নেড়ে বুড়ো আবার বললেন, ‘এমন তো কখনো শোনা যায়নি।’
অন্য একজন জিজ্ঞেস করেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের লর্ড কী বলেন?’
অন্যজন জবাব দিলেন, ‘ছেলেরা বাবার বিরুদ্ধে যাবে—পবিত্র গ্রন্থে তা-ই আছে।’
আরেক জন বললেন, ‘তা হলে ধ্বংসের এই তো শুরু।’
আলোচনা যখন ধর্মতত্ত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, খুব বাস্তববাদী একজন, নাম মাদুবুগো, আলাপটি সাধারণ স্তরে নামিয়ে আনলেন।
তিনি এননেমেকার বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছেলের ব্যাপারে একবার স্থানীয় চিকিত্সকের সাথে আলোচনা করেছেন?’
তিনি বললেন, ‘সে তো অসুস্থ নয়।’
‘তাহলে সেটা কী? ছেলেটার মন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এখন ভালো কোনো ভেষজ চিকিত্সক চেষ্টা করলে তাকে সজ্ঞান করতে পারে। তার যে ওষুধ দরকার, তা হচ্ছে অ্যামালিলে; একই ওষুধ যা মহিলারা বেপথু স্বামীকে নিজের অধিকারে ফিরিয়ে আনতে ব্যবহার করে।’
অপর একজন বললেন, ‘মাদুবুগো ঠিকই বলেছেন, এটা সারতে ওষুধ লাগবে।’
‘আমি কখনো এসব স্থানীয় ডাক্তার ডাকব না।’ এননেমেকার বাবা এসব ব্যাপারে তাঁর কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রতিবেশীদের চেয়ে একগুঁয়েমিতে এগিয়ে। ‘আমি আরেকজন মিসেস অচুবা হতে চাই না। আমার ছেলে যদি নিজেকে হত্যা করতে চায়, সে নিজের হাতেই মরুক। তাকে সাহায্য করা আমার কাজ নয়।’
মাদুবুগো বললেন, ‘দোষ তো মেয়েটির, তারই কোনো সত্ ভেষজ ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত ছিল। অথচ সে কী রকম চালাক!’
‘ওই মহিলা তো শয়তান, খুনি।’ কথাটা বললেন জোনাথান। তিনি কদাচিত্ প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলতে মুখ খোলেন। কারণ তিনি মনে করেন, তারা যুক্তি দিয়ে কথা বলতে জানে না।
‘ওই মহিলার স্বামীর জন্য ওষুধটা বানানো হয়েছিল কিন্তু তৈরির সময় তারা এননেমেকার নাম বলেছে। আমি নিশ্চিত, ওটা তারও কাজে লাগবে পুরোপুরিই। ভেষজ ডাক্তারের খাবারের মধ্যে অধুষটা মেশানো শয়তানির কাজ। বলো, তোমরা এটাই দিতে চেষ্টা করছিলে।’
ছয় মাস পর এননেমেকা তার বাবার কাছ থেকে আসা একটি চিঠি স্ত্রীকে দেখাচ্ছিল:
‘আমি অবাক হই, আমার প্রতি এই নির্দয় আচরণ! আমাকে বিয়ের ছবি পাঠিয়েছ। আমি এটা ফেরতই পাঠাতাম। কিন্তু আরও চিন্তা করে শেষপর্যন্ত তোমার স্ত্রীর ছবিটা কেটে ফেললাম এবং তোমার কাছে ফিরিয়ে দিলাম। কারণ তাকে দিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। কেমন করে তোমাকে বলি যে, তোমাকেও আমার দরকার নেই।’
নেনে যখন চিঠিটা পড়ল, ছেঁড়া-কাটা ছবিটি দেখল, তার চোখ অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল এবং সে ফোঁপাতে লাগল।
তার স্বামী বলল, ‘কেঁদো না, সোনা। এমনিতে বাবা ভালো ধরনের মানুষ, একদিন নিশ্চয়ই আমাদের বিয়েটা মেনে নেবেন।’
তারপর বছরের পর বছর কেটে গেল। সেই একদিন আর এল না।
আট বছর ধরে ছেলে এননেমেকাকে তার বাবা ওকেকের প্রয়োজন হয়নি। মাত্র তিনবার (যখন এননেমেকা ছুটি কাটাতে অনুমতি নিয়ে বাড়ি আসতে চেয়েছে) তিনি ছেলেকে লিখেছেন।
একবার লিখলেন, ‘তোমাকে আমার বাড়িতে থাকতে দিতে পারি না। তুমি কেমন করে তোমার ছুটি কাটাবে, না জীবন কাটাবে—এ নিয়ে আমার আগ্রহ নেই।’
এননেমেকার বিয়ের বিরুদ্ধে এই সংস্কার কেবল তার ছোট গ্রামেই সীমিত রইল না। এমনকি লাগোস শহরে তার গ্রামের যারা বসবাস করত, তারাও বিভিন্নভাবে তাদের অপছন্দের প্রকাশ ঘটাতে লাগল। তাদের মহিলারা যখন একত্র হতো, তারা নেনের প্রতি বৈরী আচরণ করত না ঠিকই কিন্তু এমন বাড়াবাড়ি রকমের মান্যতা দেখাত যে, নেনে বেশ বুঝত যে, সে কখনোই তাদের একজন নয়। তবে সময় যত গড়াতে লাগল নেনে এই সংস্কারের বেশ খানিকটা ভেঙে এগোতে শুরু করল। বরং সেসব নারীদের কারও কারও সাথে সখ্যও গড়ে তুলল। ধীরে ধীরে এবং ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে তারা স্বীকার করতে শুরু করল, নেনের ঘরবাড়ি অন্যদের চেয়ে বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
ধীরে ধীরে কথাটা গ্রামে এবং ইবো সমাজে ছড়িয়ে পড়ল যে, নেনে আর এননেমেকা তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুখী দম্পতি। কিন্তু গ্রামের দু-একজন, যারা এ ব্যাপারে কিছুই জানত না, তার বাবা তাদের একজন। ছেলের নাম শুনলেই তিনি এমন মেজাজ দেখাতেন যে, অন্যরা বাবার উপস্থিতিতে ছেলের নামই বলত না। প্রচণ্ড এক প্রচেষ্টার ইচ্ছেশক্তি দিয়ে তিনি ছেলেকে মাথার পেছনে ঠেলে দিতে পেরেছিলেন। এই চাপ তাঁকে প্রায় মেরেই ফেলত, কিন্তু তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পেরেছেন এবং জয়ী হয়েছেন।
তারপর একদিন তিনি নেনের হাতের একটি চিঠি পেলেন এবং অবহেলায় একনজর দেখে যখন এই অংশটুকু পড়ছিলেন, তাঁর মুখের সনাতন প্রকাশভঙ্গি পাল্টে গেল। তিনি আরও যত্ন করে পড়তে শুরু করলেন:
‘আমাদের দুটি ছেলে যেদিন জানল তাদের একজন দাদা আছেন, তাঁর কাছে নিয়ে যাবার জন্য আমাকে পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল। আপনি যে তাদের দেখতে চান—এ কথাটা তাদের বলা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আমি করজোড়ে প্রার্থনা করি, আপনি অনুগ্রহ করে এননেমেকাকে অনুমতি দিন, যেন আগামী মাসের ছুটিতে সে ছেলেদের নিয়ে স্বল্পসময়ের জন্য বাড়িতে আসতে পারে। আমি লাগোসেই থেকে যাব।’
বুড়ো তখনই অনুভব করলেন, এত বছর, এত দিন তিনি যে সিদ্ধান্তটি গড়ে তুলছিলেন, তা হঠাত্ ভাঙতে শুরু করছে। তিনি নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন—তিনি পরাস্ত হবেন না। আবেগময় এসব অনুরোধের কাছ থেকে তিনি তাঁর হূদয়টাকে চুরি করে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছেন। এটা অন্য এক সংগ্রামের পুনঃ-অনুশাসন। তিনি একটি জানালায় ঠেস দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আকাশটা ভারী কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে, ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে, বাতাস ভরে উঠছে ধুলো আর শুকনো পাতায়। এটা এমন এক সময় যখন প্রকৃতিই মানুষকে একহাত দেখে নেয়। অল্পক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল—বছরের প্রথম বৃষ্টি। বড় ধারাল ফোঁটায় বৃষ্টি নেমে আসছে, সাথে বিজলি চমক ও বজ পাত—ঋতু পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। ওকেকে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, যাতে নাতি দুটোর কথা মনে না হয়। কিন্তু তিনি জানতেন, তিনি হেরে যাওয়া একটি যুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন। তিনি তাঁর প্রিয় একটি গান গুনগুন গাইতে চেষ্টা করছেন, কিন্তু ছাদের ওপর বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটার প্রপাতে তাঁর সুর কেটে যায়। তখন তাঁর মন ফিরে এল শিশুদের কাছে। তাদের ঠেকাতে তিনি কেমন করে দরজা বন্ধ করে রাখবেন? অদ্ভুত এক মানসিক প্রক্রিয়ায় তিনি কল্পনায় দেখলেন, তাঁর ঘরের বাইরে কর্কশ ও ক্ষুব্ধ আবহাওয়ায় বিষণ্ন ও পরিত্যক্ত অবস্থায় তারা দাঁড়িয়ে আছে।
সে রাতে তিনি বলতে গেলে ঘুমোতেই পারেননি—গভীর অনুশোচনা ও ভয় তাঁকে পেয়ে বসে, তারা পৌঁছানোর আগেই-না তাঁর মৃত্যু ঘটে!
