জীবনসায়াহ্নের গাথা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৬
হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো বিশ্বজিত সাহা প্রচ্ছদ :কে সি মং প্রকাশক :বাংলা প্রকাশ এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বিশ্বজিত সাহার ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে শুনে স্বস্তি পেলাম এই ভেবে, গ্রন্থটি একজন সঠিক ব্যক্তির হাতেই জন্ম লাভ করছে। আর যা-ই হোক, গ্রন্থটির মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের শেষজীবনের নানান গল্প, তাঁর চিকিত্সা ও মৃত্যুকে ঘিরে বিভিন্ন রকম টক-ঝাল-মিষ্টি যেসব গুজব কানে কানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, তার একটা নিশ্চিত সুরাহা হবে। দুশ ঊনাশি পৃষ্ঠার বইটার এ মাথা-ও মাথা ঘুরে বারবার একটা কথাই মনে হয়েছে, লেখক বইটি প্রকাশ করতে যথেষ্ঠ সচেতনতা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘ডেথ সার্টিফিকেট’, ছোট্ট চিরকূট, লেখকের সাথে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, বিভিন্ন সময়ে তোলা তাঁর ব্যক্তিগত ছবি, হাসপাতালের নথিপত্র, ইনস্যুরেন্স পলিসি, আঁকিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন ছবিসহ নানা তথ্য দিয়ে বইটি রীতিমতো ঠাসা। বেশ বুঝতে পারা যায়, বইটি পড়ার পর পাঠক যাতে এর বিষয়বস্তু লেখকের নিজের মনগড়া মনে না করেন, সে জন্যই লেখক খুব সাবধানে গ্রন্থটিতে প্রচুর তথ্য তুলে ধরেছেন। এপার বাংলা-ওপার বাংলা—দু-বাংলাতেই সমান জনপ্রিয় এই নন্দিত কথাসাহিত্যিকের মৃত্যুকে ঘিরে তাঁর অগণিত ভক্ত-হূদয়ে হাজার রকমের আবেগ, উদ্বেগ, ক্ষোভ আর হাহাকার জন্ম নেবে—এ তো খুবই স্বাভাবিক। এই মৃত্যু নিয়ে চারপাশে কানাঘুষাও কম হয়নি। বিশ্বজিত সাহা সেই জটিল বিষয়গুলোকে অনেক সহজ বর্ণনায় তাঁর গ্রন্থে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। আমার মতো অনেক হুমায়ূন-ভক্তের মনে হয়েছিল, হুমায়ূন আহমেদ হাসপাতাল থেকে সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরে এসেছিলেন এবং তিনি বাসায় হঠাত্ করে চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন। তাঁকে দেরিতে হাসপাতালে নেওয়া হলো এবং তাঁর মৃত্যু হলো। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন না কোন রহস্য আছে। লেখক লিখেছেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুকে ঘিরে সৃষ্ট নানা রহস্য নিয়ে প্রবাসে এখনো তুমুল আলোচনা চলছে শোক প্রকাশের পাশাপাশি। মেহের আফরোজ শাওন জানিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদ হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই ড. জাফর ইকবাল জানিয়েছেন, ক্যান্সারে নয় ইনফেকশনে মারা গেছেন তাঁর ভাই। ডাক্তার মিলার জানিয়েছেন, শ্বাস-প্রশ্বাসে জটিলতা, হূদ্যন্ত্রের বৈকল্য এবং কিডনির ক্রমব্যর্থতার করাণে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু হয়েছে। তিনজন তিন ধরনের কথা উল্লেখ করছেন। এখন কার কথা সত্যি?’ (পৃষ্ঠা ২৫৬) এবার আরেকটি বিষয়। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেট হুমায়ূন আহমেদের লাশ বাংলাদেশে পাঠানোর সব আয়োজন করেছেন। সময়স্বল্পতার কারণে হুমায়ূন আহমেদের পরিবার এবং প্রকাশক মাজহারুল ইসলামের জন্য বিমানে প্রথম শ্রেণীর সিট পাওয়া যায়নি। কিন্তু বেঁকে বসলেন শাওন। কারণ তিনি প্রথম শ্রেণী ছাড়া বিমানে ভ্রমণ করবেন না। এদিকে বাংলাদেশে হুমায়ূন হাজারো ভক্ত, পরিবার-পরিজন—সবাই উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করছে হুমায়ূনের লাশের জন্য। বিশ্বজিত সাহার ভাষায়, ‘হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম সিদ্ধান্ত নিলেন বিমানের প্রথম শ্রেণীর টিকেট না পাওয়া পর্যন্ত দেশে যাবেন না। তাঁদের এই সিদ্ধান্তের ফলে মরহুমের কফিন দেশে পৌঁছে একদিন পর।’ (পৃষ্ঠা ৯৫) আবার ‘কোটি মানুষের হূদয়ের মানুষ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দাফন নিয়ে মেহের আফরোজ শাওনের বক্তব্য এবং ডেথ সার্টিফিকিটের তথ্যে কোনো মিল নেই। নুহাশপল্লিতে দাফন করার কথা উল্লেখ করেছেন শাওন। অথচ ডেথ সার্টিফিকেটে দাফনের স্থান উল্লেখ করা হয়েছে গুলশানে, নিজস্ব প্লটে। হুমায়ূন আহমেদের ডেথ সার্টিফিকেটে দেওয়া এমন তথ্য জন্ম দিয়েছে নতুন বিতর্ক।’ (পৃষ্ঠা ৯৪) হুমায়ূন আহমদের চিকিত্সাব্যয়, তাঁর মৃত্যু, হুমায়ূনের স্ত্রী শাওনের ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রহস্যেগুলো এখনো তাঁর ভক্তদের কাছে পরিষ্কার নয়, ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো’ গ্রন্থটির প্রতিটি পাতায় বিদগ্ধ পাঠক এর উত্তর পাবেন বলে আশা করি। তবে বইটির নাম দেখে যদি কেউ মনে করেন হুমায়ূন আহমেদের শেষ দিনগুলো নিয়ে বিভিন্ন রকম ঘটনা নিয়ে এ গ্রন্থটির অবতারণা হয়েছে, তাহলে এক অর্থে ভুল হবে। হুমায়ূনের জীবন-সূর্যাস্তের ঘটনাগুলো তো বটে, পাশাপাশি গ্রন্থটিতে ব্যক্তি হুমায়ূন, শিল্পী হুমায়ূন, আড্ডাবাজ হুমায়ূন, রম্য-রসিক হুমায়ূনকেও আবিষ্কার করা যাবে বলে আমার বিশ্বাস। বইটির স্থানে স্থানে চোখে পড়ার মতো কিছু মুদ্রণ-বিভ্রাট লক্ষণীয়। যেমন, পৃষ্ঠা ৮৯-এ লেখা হয়েছে, ‘শাটফিন ব্লুবার্ড’ কিন্তু হবে ‘শাটফিন বুলভার্ড’। আশাকরি লেখক গ্রন্থটির দ্বিতীয় মুদ্রণে বিষয়গুলোর ওপর নজর দেবেন। গ্রন্থটি ‘শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে আন্দোলনরত তরুণদের’ উত্সর্গ করে লেখক এই প্রজন্মের তরুণদের সংগ্রামী চেতনার সাথে যে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন, তা সত্যিই ঈর্ষণীয় এবং সেই সাথে প্রশংসনীয় ও বটে। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছেন প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান, বাংলাপ্রকাশ। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদটি এঁকেছেন কে সি মং।