শরীর ও মনের দ্বান্দ্বিকতার আখ্যান

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৬
প্রিয়ানা, চোখ ও ঝরনার জলে স্নাত এক প্রপাতের ফোয়ারা মৌলি আজাদ প্রচ্ছদ :শিবু কুমার শীল আগামী প্রকাশনা দাম :১২০ টাকা মৌলি আজাদের প্রথম গল্পের বই ‘প্রিয়ানা, চোখ ও ঝরনার জলে স্নাত এক প্রপাতের ফোয়ারা’। বইটির ভূমিকায় লেখক চার জায়গায় এই গ্রন্থটিকে গল্পের বই বলে সম্বোধন করেছেন। লেখকের দেখবার চোখ এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার ছাপ বইটির সমস্ত অবয়বে স্পষ্ট। এটি শরীর ও মনের দ্বান্দ্বিকতার আখ্যান। ড. প্রিয়ানা রহমানের মন খারাপ হওয়ার খবর জানিয়ে লেখক আখ্যান শুরু করেছেন। এতদিনের ভ্যাপসা গরমের পর আজ সারাদিন বৃষ্টি—এই প্রথম লাইনটিতে বৃষ্টির অনুষঙ্গ এনে ড. প্রিয়ানা রহমানের মন খারাপের উপমা প্রথমেই পাঠককে মুগ্ধ করে। গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ড. প্রিয়ানা রহমান, সে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সহযোগী অধ্যাপক। শিক্ষকতার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসও লেখে। তার সঙ্গে পরিচয় হয় লেখক ও বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী শফিকের। শফিক ছদ্মবেশী, সে কথার জালে মানুষকে বন্দী করে, বিশেষ করে নারীদের। নারীরাও যেন তার প্রতি মুগ্ধ না হয়ে পারে না। আর শফিকের প্রতি মুগ্ধ হওয়া মানেই একই বিছানায় রাত্রি যাপন। ড. প্রিয়ানা রহমান প্রথাগত বন্ধনে নিজেকে বাঁধতে নারাজ। সে স্বামী-সন্তান-সংসার চায় না। কিন্তু শরীরের জৈবিক চাহিদাকে অস্বীকার করতে পারে না সে। তাই বহুগামী শফিকের সঙ্গে ব্যাংককে এক সপ্তাহ কাটিয়ে আসে। শফিকের কাছ থকে দৈহিক তৃপ্তি (হয়তো মানসিকও) পেয়ে ব্যাংকক শহরকে প্রিয়ানার বেহেশত মনে হয়। লেখক সাবলীলভাবে চরিত্রগুলোর মানসিক চিত্র অংকন করেছেন। শফিকের আরেক বান্ধবী নাজ, এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা করে। দৃঢ়চেতা মহিলা নাজ। পুরুষেরা ব্যবসায় সফল হলে মেয়েরাও পারবে—এমনই তার আত্মবিশ্বাস। সফল হয়ে তা সে দেখিয়ে দিয়েছে। নাজের শখ ছিল একজন রোমান্টিক পুরুষের হাতে তার শরীরটা সমর্পণ করবে। প্রথম বিয়েতে নাজের এই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মানবাধিকারকর্মী শফিককে তার স্বপ্নের মানুষ মনে হয় এবং শফিকের হাতে নিজের শরীর সঁপে দেয়। এ ক্ষেত্রে লেখককে ভীষণ বাস্তববাদী মনে হয়। নারীরও যে একটা শরীর থাকে এবং সে শরীর যে কাউকে দেওয়া যায় না—হূদয় না চাইলে স্বামীকেও না। মন ও শরীরের যুগপত্ ইচ্ছা এক বিন্দুতে মিলিত হলে শারীরিক মিলনে কোনো গ্লানি থাকে না। শফিক সেই পুরুষ, যে নিজের প্রগলভতা দিয়ে প্রথমে মন জয় করে, তারপর শরীর। শারীরিক সমপর্ককে লেখক উক্ত গ্রন্থে মানবজীবনের অনিবার্য এবং স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখিয়েছেন। শফিকের সাথে নারীদের প্রেম শরীরের, মনের নয়। মনের নয় বলেই শফিক মারা যাবার দুই মাসের মধ্যে ড. আলীমের সঙ্গে প্রিয়ানার শারীরিক সমপর্ক হয়। প্রিয়ানা ড. আলীমের সঙ্গে এই সমপর্ক গড়ে তোলে প্রমোশন পেয়ে অধ্যাপক হবার জন্য। ড. সাদিয়া প্রিয়ানার কলিগ। স্বামীর ব্যবসার উন্নতির জন্য নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর বিভিন্ন বিজনেস ম্যাগনেটের শয্যাসঙ্গী হয়ে তার বিনিময়ে পেয়েছে স্বামীর অত্যাচার; সহ্য করেছে অকথ্য গালিগালাজ। এ গ্রন্থে সমাজের উঁচু স্তরের একটি অংশের নারীদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেছেন লেখক। লেখকের দৃষ্টি উচ্চবিত্ত সমাজের গভীরে প্রোথিত। ছোট ছোট বিষয়কে তিনি চমত্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের আচার-আচরণ, কথাবার্তা; সাদিয়ার নিজের টাকায় সংগীতানুষ্ঠান, পুরস্কার নেওয়া, বক্তৃতা দিয়ে নাম কেনা ইত্যাদি বিষয় লেখক কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। অন্যায় করলে তার সাজা পেতে হয়—এটা চিরন্তন সত্য। শফিকও অন্যায় করেছে। স্ত্রীর প্রতি চরম অবহেলা করে এবং অন্য নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সমপর্ক গড়ে। সে অন্যায়ের শাস্তি তাকে পেতে হয়েছে; অকালে হূদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু ঘটে। বাঙালি মেয়েরা স্বামীকে মন দেয়, শরীরও। অন্যের সঙ্গে শারীরিক মিলন হলে তাদের মধ্যে একটা পাপবোধ জন্ম নেয়। অতি আধুনিক প্রিয়ানা শফিককে ভালোবেসে শরীর দিলেও ডক্টর আলীমের সঙ্গে তার প্রেমের সমপর্ক ছিল না। দ্বিচারিণী হওয়ার ফলে পাপবোধের জন্ম হয়েছে, শেষে সেই বোধ প্রিয়ানার চোখে জল আনে। প্রিয়ানার আত্মধিক্কার, বিবেকের দংশন ও লেবাসধারী শিক্ষিত মানুষের মুখোশ উন্মোচনে আখ্যানের যবনিকা হয়েছে। লেখকের বক্তব্য এখানে সপষ্ট—প্রিয়ানাদের আবেগের বশে, লোভের বশে এমন কিছু করা ঠিক নয়, যাতে আজীবন চোখ ও ঝরনার জলে স্নাত হতে হয়।