চিত্র প্রদর্শনী

রূপের বয়ান

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৬
অন্তর্গত উপলব্ধির প্রতি শ্রদ্ধাশীল শিল্পী সোহেল রানা প্রাণন তাঁর চিত্রভাষায় হাজির করেন বোধের তাগিদ। বিবিধ বিষয়ের প্রতি প্রাণনের রূপবৈচিত্র্য বিচারের যে ধরন, তা থেকে আমরা টের পেয়ে যাই—যাপনের যে বাস্তবতা তার ভেতর শিল্পীর চৈতন্য কী? তাঁর ছবির সামনে দাঁড়ালে এর উত্তর পাওয়া যাবে আপনা-অপনিই। নগর ও নগরায়ণ আছে; আছে পণ্যপ্রবাহের ক্যাওয়াজ। ইন্ডাস্ট্রিয়াল সভ্যতার উচ্ছৃষ্ট এসবের ভেতর কৃষিভূমি, মানবিক গতিবিধি, স্বাভাবিকতা এবং কৃষিসভ্যতার প্রতি বিনিত আনুগত্য—এসব হুমকির মুখে। প্রাণনের চৈতন্য এ-ই। তাঁর নিজের জবানিতে, ‘চিত্ররচনার প্রথমসূত্রে দরকার হয় একটি নিজস্ব চিত্রভাষা বা শৈলীর। এবং ভাষারশৈলী খুঁজতে দরকার হয় নিজের চৈতন্যের নিরীক্ষণ। বস্তুত, উপাদান ও উপকরণের সমন্বয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশের মধ্য থেকে চিত্রের রূপ পরিগ্রহ করে, যা হতে পারে দৃষ্টিনন্দন বা অনর্থক। নিজেকে কর্ষণ করতে গিয়ে অনুভূতিতে ধরা পড়ে অধিকতর প্রশ্ন—আমি কে? আমি কী করি? আমার কী করা উচিত—ইত্যাদি নানা প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়েছেন প্রাণন। ‘ব্ল্যাক ওয়াটার’, ‘বঙ্গমাতা’, ‘কৃষ্টির সাধক’, ‘ড্রিম অব সিভিলাইজেশন’—এসব ছবি দেখলে আরও বেশি স্পষ্ট হয়। আয়তনের দিক থেকে প্রদর্শীত ছবিগুলোর মধ্যে ‘ব্ল্যাক ওয়াটার’-এর কাজগুলো বড়। ছবির সামনে দাঁড়ালে নন্দনতাত্ত্বিক বিভূতি থেকে নিজেদের অপরাধবোধ এবং অসচেতনতা জাগ্রত হয়ে ওঠে। আমরা বিব্রত বোধ করি। আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুড়িগঙ্গার দৃশ্য। অথবা কারখানার নালা দিয়ে প্রবহমান বর্জ্যের বুদবুদ। ব্ল্যাক ওয়াটারের ক্ষেত্রভূমি সেই দূষিত বর্জ্যের বুদবুদ আর তার ভেতর থেকে করুণাকম্পিত রঙে অঙ্কিত নগর। রঙের ব্যবহার আলঙ্করিক, কতকটা রিকশা পেইনিটং বা মুঘল মিনিয়েচারের মত ঘনবদ্ধ। ছবিতে বিবৃতিমূলকতার প্রয়োজনে ঘনকবাদের অশ্রয় নেওয়া হয়েছে। পারাপারের রূপক বা বাহন হিসেবে যেমন নৌকা খুব অর্গানিক ঠিক তার বিপরীত ক্ষেত্রে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত বাহন। কিন্তু সেই বাহন দিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্র অতিক্রম করা সম্ভব নয়—এই বয়ান আছে একটি ছবিতে। উঁচু ভবনগুলোর ওপরে অবস্থিত মোবাইল টাওয়ারগুলো হেলে পড়ছে। নগরের থেকে অধিকতর বড় অবয়ব নিয়ে ঢুকে পড়ছে মালবাহী ট্রাক। এসব নগরায়ণ ও তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার এক চরম আলেখ্য আছে ছবিগুলোতে। তেলরং মাধ্যমে আঁকা ‘বঙ্গমাতা’ ছবিতেও ক্ষেত্রপটে সেই বুদবুদ, উপরিস্থিত অংশ থেকে উঁকি দেওয়া পর্ণরাজি, জগদ্ধাত্রীর আঙ্গিকে নারীর উপস্থিতি এখানকার শাক্ত বা শক্তি ও উর্বরতার দেবী মাতৃকামূর্তির মিথস্ক্রিয়ায় সিদ্ধ হয়েছে ছবিটি। হাতের মুদ্রাভঙ্গিমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই সূত্র, ‘বিনতু নৃত্য শাস্ত্রেণ চিত্র সূত্রমঃ সুদির্বিনত’, অর্থাত্, নৃত্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকা চিত্রকরের অবশ্যকর্তব্য। ‘কৃষ্টির সাধক’ ছবিতে শিকারের দৃশ্য আছে। বিন্যাসে মধ্যের অংশটাকে ফাঁকা রেখে দুপাশে অবজেক্টকে রাখা হয়েছে। বিবিধ হাতের মুদ্রা এবং তীর তাঁক করা অপর পাশের প্রাণিকূলের দৃষ্টিতে অতঙ্কগ্রস্ততা সারফেসে একপ্রকার অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। হলুদের ব্যাবহার এ ক্ষেত্রে কসমিক অ্যাটমোসফেয়ার এনেছে, যার মাধ্যমে আদিম অভ্যাস ও গুহাযুগের আচরণের প্রতি একধরনের ফিরে দেখার ইতিহাস পাওয়া যাবে। ‘ড্রিম অব সিভিলাইজেশন’ ছবিতে আছে সারল্য। রেখার ব্যবহার এবং পরিবেশের ধরন অনেকটাই শিশুতোষ। আলঙ্কারিক এবং একঘেঁয়ে রেখায় বিন্যস্ত খেজুর গাছের সাথে শেকড়-বাকড় ও নৌকার ভেতরকার উপাদান প্রায় একই। আদিম অবস্থার পর যখন মানুষ দাঁড়াতে শিখল, পাশাপাশি উন্নততর যে ক্ষেত্রে বন্যতার অবমুক্তি ঘটেছে—এই দুই অবস্থার পাশাপাশি মেলবন্ধন ঘটাতে প্রত্যাশী। ঠিক এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হয়তো নির্মিত হবে মানুষের অনাগত সভ্যতার পাঠ। ঢাকা আর্ট সেন্টারে ২২ মার্চ শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ২৭ মার্চ।