দর্পণ

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৩, ১৮:৪৭
বেতনের টাকা হাতে পেয়েই উত্ফুল্ল শাহেদ পা বাড়াল শপিংয়ের জন্য। বাসা থেকে বের হয়ে তিন রাস্তার মাথায় এসে দাঁড়াল শাহেদ। রিকশার কোনো খবর নেই। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর দূরে একটা রিকশা দেখে ইশারা করল শাহেদ। কাছে আসতেই বয়স্ক চালক দেখে শাহেদ বলল, চাচা আপনি পারবেন না। লাগবে না, চলে যান। বৃদ্ধ চালক খুব মন খারাপ করে বলল, বাজান, আমি বুড়া দেইখা আপনারা যদি আমার রিকশায় কেউ না উঠেন, তাইলে আমি প্যাট চালামু ক্যামনে? কথাটা শাহেদের অন্তরে গিয়ে লাগল। ইফতারির সময়ও ঘনিয়ে আসছে। ভাড়া ঠিক না করেই উঠে পড়ল শাহেদ। রিকশার চাকা ঘুরছে। সাথে সাথে শাহেদের মাথায়ও বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। কার জন্য কী কেনা যায়। বরাবরের চেয়ে একটু আলাদা হতে হবে এবার। ঈদের শপিং, একটু চমক থাকা চাই... ইত্যাদি ইত্যাদি। রিকশা এগিয়ে চলছে। গোধূলির আলো ছড়িয়ে ধীরে ধীরে আকাশের আড়ালে চলে যাচ্ছে দিনের সূর্য। আগত সন্ধ্যার মগ্নতায় নীরব হয়ে যাচ্ছে দিগন্তবিস্তারি প্রকৃতি। অন্যদিকে ছোট্ট একটা দৃশ্যপট শাহেদের মনটাকে অফুরন্ত ভালোলাগায় ভরিয়ে দিচ্ছে মুহুর্মুহু। পরিবারের সবাই তার দেওয়া উপহারে সজ্জিত। সবার মুখে অনাবিল হাসি। মগ্ন শাহেদের হূদয় উপচে উঠছে আনন্দ-শিহরণে। হঠাত্ খটখট আওয়াজে মগ্নতা ভাঙল শাহেদের। দেখল, বৃদ্ধ চালক রিকশা থেকে নেমে রিকশা ঠেলে ব্রিজের ওপরে ওঠানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ব্রিজটা বেশ উঁচু হওয়ায় চালক অনেক চেষ্টা করেও পেরে উঠছে না। অগত্যা শাহেদ নেমে পড়ল। পেছন দিক থেকে সেও ঠেলে ঠেলে রিকশা ব্রিজের ওপরে উঠাল। বেশ হাঁপিয়ে গেছে চাচা। বোঝা যাচ্ছে, বুক বড় করে ঘন ঘন দম নিচ্ছে। গলায় প্যাচানো গামছা দিয়ে ঘর্মাক্ত মুখমণ্ডল মুচছে। গভীরভাবে শাহেদ দেখল রিকশাওয়ালাকে। খেয়াল করল সাদা দাড়ি। চোখ দুটো গর্তে ঢোকানো। শরীরের চামড়া ঝুলে গেছে। রিকশায় যখন প্যাডেল মারছে, বুক ভেঙে শ্বাস বের হচ্ছে তার। বুঝি এখনই পিঠ আর বুকের পাঁজর এক হয়ে যাবে। সম্ভবত মারাত্মক হাঁপানিতে আক্রান্ত। নিঃশেষিত শরীরে ক-খানা হাড় কোনোরকমে দেহের কাঠামো ধরে রেখেছে। দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে কত রিকশাওয়ালার সাক্ষাত্ হয়। কে কার খবর রাখে। গভীরভাবে তো দূরে থাক, দ্বিতীয়বার ফিরে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি শাহেদ, যদি না ২-১ টাকা ভাড়া কম-বেশি নিয়ে বাতচিত হয়। অথচ অতি সাধারণ এই ঘটনা আজকে অজানা কারণে শাহেদের হূদয়তন্ত্রীতে এক গভীর রেখা টেনে দিল। রিকশা ছুটে চলল আবার। শাহদের চোখে বিস্ময়ের অন্ত নেই। এই লোক এই বয়সে এই শরীরে বাইরে আসার সাহস করল কী করে? জিজ্ঞেস করল শাহেদ, চাচা, আপনার বাড়ি কোথায়? ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম পাশে। আপনার ছেলেমেয়ে নাই? আল্লায় ছেলে দেয় নাই, বাজান। খালি তিনডা মাইয়া। আপনারে দেখলে তো অসুস্থ মনে হয়। এই অবস্থায় আপনি রিকশা নিয়ে বের হলেন যে? হ, বাজান। শরীলডা বালা না, তিন দিন জ্বরে পইড়া আছিলাম, মালিক আইসা কইল, ‘তিন দিনের ভাড়া জমছে, আইজ ভাড়া দিবার না পারলে রিকশা লইয়া যামু। অবস্থা বালা না, খাওন-দাওনের অভাব... উপায়-অন্তর না দেইখা আইজ বাইর হইলাম।’ শাহেদ ভাবে এই বুঝি মানুষের নিয়তি! একটা বৃদ্ধ, যার কোনো ছেলে নেই। শুধু তিনটা মেয়ে। সংগ্রাম করছে নিরন্তর—গাড়ি, বাড়ি, ব্যবসা, বউয়ের জন্য ইন্ডিয়ান শাড়ি, ঈদের দিনে বাহারি খাওয়া-দাওয়া—এসবের জন্য নয়। শুধু একবেলা ভাত। অথবা নিদেনপক্ষে মালিক এসে রিকশটা যেন নিয়ে না যায় শুধু সেই টাকাটা জোগাড় করা অথবা আরেকটা দিন কোনোরকমে একটু বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু কীভাবে বাঁচবে এই বৃদ্ধ? হয়তো কোনো একদিন রিকশা ঠেলতে ঠেলতে রাস্তার পাশে মরে পড়ে থাকবে, জানতেও পারবে না কেউ। বাজারের মধ্যে ঢুকছে রিকশা। চাচা, ভাড়া কত পেলেন আজ? বিকাল থাইক্যা অহন পর্যন্ত ৩০ টাহা পাইছি। এত অল্প কেন? কী কমু বাজান, বুড়া মানুষ দেইখলে আর কেউ উঠবার চায় না। টনক নড়ল শাহেদের। কারণটা খুবই স্পষ্ট শাহেদের কাছে। প্রথমে সে নিজেও উঠতে চায়নি। প্রত্যেক বৃদ্ধ রিকশা চালকের এই বয়সে রিকশা চালানোর পেছনে হয়তো একটা করে মর্মান্তিক গল্প আছে। না হলে এই বয়সে কারও রিকশা নিয়ে বের হওয়ার কথা নয়। গল্পটা তখন আরও ব্যথাতুর হয়ে উঠে যখন বয়সের ভারে নুয়ে আসা চালকের শরীর দেখে কেউ তার রিকশায় উঠতে চায় না। সবাই এড়িয়ে চলে। শাহেদ ভাবল, কিছু করতে পারি বা না পারি অন্তত এখন থেকে বৃদ্ধ চালকদের রিকশায়ই উঠব। চাচা রিকশার প্যাডেল মারে, শাহেদ চেয়ে থাকে অপলক। চাচা, হোটেল আলামিনের সামনে নিয়ে যান। রিকশা থেকে নামল শাহেদ। ইফতারির সময় হয়ে এল। শাহেদ বলল, চাচা চলেন, একসাথে ইফতারি করব। না বাবা, আমি রোজা আছিলাম না, দেহি দুই-একটা খেপ পাওন যায় না কি। রোজা রাখেননি তাতে কী? চলেন এক সাথে ইফতারি করব। জোর করেই চাচাকে সাথে নিয়ে পাশে বসাল। রকমারি ইফতারি সাজানো সামনে। ইফতারির সময় হলো। শাহেদ খেয়াল করল, চাচা ইফতারির ফাঁকে ফাঁকে কিছু ইফতারি পকেটে ঢোকাচ্ছে। শাহদে কারণটা বুঝতে পেরে বড় একটা প্যাকেট ভরে ইফতারি দিয়ে দিল চাচাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। শাহেদের ঈদ-শপিংয়ে ছেদ ঘটাল অন্যরকম কিছু ভাবনা। কত মানুষ আছে আমাদের চারপাশে, ঈদের অপেক্ষা করে না তারা। বরং কত তাড়াতাড়ি চলে যাবে সেই প্রহর গোনে ক্ষণে ক্ষণে। ঈদ তাদের কাছে সুখের নয়, যন্ত্রণার। আনন্দের নয়, আহাজারির। ঈদ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায় তারা, কিন্তু সচ্ছল মানুষেরা চারিদিক থেকে ঈদ-আনন্দের তুফান বইয়ে দেয় আর সে আনন্দে খড়কুটোর মতো হাওয়ায় হাওয়ায় উড়তে থাকে ওইসব সর্বহারা মানুষের দল। আমরা কেউ তা আর তলিয়ে দেখি না ভয়ে। ইফতারি শেষ। আজ শপিংয়ে আর মন নেই শাহেদের। চাচাকে বলল, রিকশা ঘোরান। আবার রিকশা ছোটে। চাচার দিকে তাকিয়ে অকৃত্রিম শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় নুয়ে আসে শাহেদের মাথা। এই বয়সে যে অভাবী মানুষটার ভিক্ষের থালা নিয়ে রাস্তায় বসার কথা, সে তা না করে রিকশায় প্যাডেল মারে সর্বশক্তি দিয়ে। মাঝে মাঝে চাচার দু-পায়ের শিরা স্টিলের তারের মতো টান টান হয়ে যায়। মনে হয়, এই বুঝি ঠাস করে ছিঁড়ে যাবে। কদমবুচি করতে ইচ্ছা করে শাশ্বত জীবনসংগ্রামে বিপ্লবী ওই পা দুটি ছুঁয়ে। জট পাকিয়ে যায় শাহেদের চিন্তা-ভাবনায়। ক্রোধের আগুনে জ্বলে যেতে চায় শরীর-মন সবকিছু। সভ্যতার এই নির্মোহ নির্মাণে শ্রমিকেরা পুড়ে পুড়ে কাঠকয়লা হবে আর আমরা সেই কয়লায় আমাদের অফুরন্ত ক্ষুধা আর সীমাহীন বিলাসিতাকে শাণিত করব অহর্নিশ। জগত্জুড়ে এ কী এক মহা সার্কাস! এটাই না কি জীবনের বৈচিত্র্য? রিকশা এসে পড়ল বাসার কাছাকাছি। শাহেদ নেমে রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রেখে চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে অপলক জীবনের মানচিত্র পাঠ করে খুঁটে খুঁটে। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে ‘গাহি তোমাদের গান’। শাহেদ পকেটে হাত দিয়ে যা আছে সবই দিয়ে দিল। শুধু রইল জীবনের একখানা দর্পণ। হূদয়ভাঙার কিছু শব্দ নিয়ে শাহেদ পা বাড়াল বাসার পথে।