অভিভাবকরাই যখন ভুল পথে...!

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৩, ১৯:৪০
বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে এখনকার এই আবহাওয়ায় সকলেই সমাধানের কথা বললেও প্রকৃত সংকট উত্তরণের জন্য কেউ কি এগিয়ে এসেছেন? এ প্রশ্ন ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘদিন ধরেই উঠে আসছে। বিভিন্ন টকশোতে সিনিয়র তারকারা একাধিক সমাধানের উপায় বাতলে দিলেও আদতে চলচ্চিত্রের চরম সংকটেও কোনো সমাধান দিতে পারেননি। খুব নিকট অতীতের দিকে ফিরলেও দেখা যায়, নায়ক রাজ রাজ্জাক, শাবানা থেকে শুরু করে একাধিক সিনিয়র তারকারা চলচ্চিত্রের সংকটের সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। মূলত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র চরম সংকটের মুখে পড়তে শুরু করে তখনই, যেদিন স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর জানালা এ দেশে খুলতে শুরু করে। কারণ স্যাটেলাইট চ্যানেল প্রতিষ্ঠার আগে মূলত চলচ্চিত্রের বাজার ছিল একেবারেই প্রতিযোগিতাহীন। সাধারণ মানুষ বিনোদন নিতেই রিলিজকৃত যেকোনো ছবি গোগ্রাসে গিলতো। তা হোক হুবহু নকল বা দুর্বল গল্পের। কিন্তু স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের দেশের ছোটপর্দার বিভিন্ন নাটক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের যে মানের উত্তরণ ঘটেছে সেই অনুপাতে এতটুকুও মান উন্নয়ন হয়নি আমাদের চলচ্চিত্রের। ঠিক এই ক্রান্তিকালে সিনিয়র তারকারা যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রযোজনা বা অভিনয় করতেন তাদের অনেকেই পাড়ি দিলেন কলকাতায়। তারা দেশ ভুলে সেখানে কেউ অভিনয় কেউ নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। সঙ্গীহীন আর অভিভাবকহীনতায় একা হতে লাগল আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রি। একাধিক নির্মাতাও তখন কলকাতার বাংলা ছবির নির্মাণ করতে শুরু করলেন। এ দেশে সস্তা চলচ্চিত্রের বাজার ধরতে ঢুকে পড়ল ভুইফোঁড় প্রযোজকচক্র। শুরু হলো কাটপিস কালচার। আর এই ক্রান্তিকাল থেকে মাথা তুলে জাগাবার বদলে দূরে সটকে পড়লেন সিনিয়র অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। আমরা কথায় কথায় শুধু বলিউডের উদাহরণ টানি। সেদিক বিচারে বলিউড বা টালিউডেও পারিবারিকভাবে সুপারস্টারদের পরিবার থেকে একাধিক তারকারা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে আসছেন প্রতিনিয়ত। এতে তারকাদের উত্তরসূরিরা টপ নাম্বারে অবস্থান না করলেও সে দেশের চলচ্চিত্রের পরিবারটি বড় হয়েছে। লাভবান হয়েছে ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু এ দেশে হাতে গোনা দুয়েকজন চলচ্চিত্র তারকার ছেলে মেয়ে এই মাধ্যমে এসেছে। ফলে বিচ্ছিন্নভাবে এই চলচ্চিত্র থেকে শুধু নিতেই জেনেছে ইন্ডাস্ট্রির সকলে। আর সেই একই পথ ধরে যখন রিয়াজ অনেকটা তার পূর্বসূরিদের মতো করে হঠাত্ করেই কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। তখন আর কোনো কিছুই বলার থাকে না। এভাবেই অভিভাবকহীন ইন্ডাস্ট্রি হয়ে পড়েছে আমাদের সবার অলক্ষেই। অভিনেতা-প্রযোজক হিসেবে শাবানা সফল হলেও চলচ্চিত্রের ঠিক ক্রান্তিকালে কোনো রকম পাশে না দাঁড়িয়েই, কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে সরে পড়েছেন চলচ্চিত্র থেকে। মুরুব্বিরা কোনো ভুল পথ দেখিয়ে দিলে খুব স্বাভাবিকভাবেই অনুজরাও সেই সুযোগই নেওয়ার চেষ্টা করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। আজ অবধি এ দেশের প্রকৃত চলচ্চিত্র কর্মীদের ভেতর কেউই এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা কর্তৃত্বের আসনে আসীন হতে দেখা যায়নি। ফলে পদ্মপাতার জলের মতো টলায়মান এই চেয়ারে কেউ বসে খুব একটা দায়িত্বের কাজ করতে পারেননি। এ ব্যর্থতাও সিনিয়রদেরই নিতে হবে। তাই চলচ্চিত্রের এখনকার যে ক্রান্তিকাল। বা সংকটের কথা বলা হচ্ছে। তাতে আশায় বুক বেঁধে বলা হচ্ছে, তরুণ নির্মাতারা চলচ্চিত্রের অবস্থা ফেরাবে। কিন্তু ডিজিটাল নামের যাচ্ছেতাই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতি যে তারা বিতৃষ্ণা ধরিয়ে দিচ্ছে তার কী পরিনাম হবে? গেল এক বছরে প্রায় অর্ধ শতাধিক নতুন নির্মাতা চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। এখানে কোনো নীতিমালা ছাড়াই যে যার মতো চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিচ্ছেন। এরপরও আশাবাদী হিসেবে এটুকু প্রত্যাশা রাখতে পারি যে, অন্তত একটি ভালো ছবি নির্মাণের জন্য ১০০টি জঘন্য মানের ছবি নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু আজকের এই অবস্থানেও আমাদের সিনিয়র অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কী করছেন? তারা কী কোনো দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন? উত্তর আসতেই পারে তারা এতে বাধ্য নন। তাই এই প্রত্যাশাও অবান্তর। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতা আজকের অবস্থানে জরুরি না, প্রয়োজন আপন তাগিদ! যে দেশে এক সময় অধিকাংশ হল মালিকেরা নিজেরাই ছবি প্রযোজনা করতেন। কারণ তারা ছবির আসল বাজার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু তারাও আজ চুপচাপ। উল্টো অপেক্ষায় আছেন কবে দেশের বাইরের ছবি আসবে। তারা প্রদর্শন করে লাভের অংক ঘরে তুলবেন। দেশের ছবি রসাতলে যাক, তাতে কার কী আসে যায়? একটি ছোট উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়, এ দেশে মধুমিতা মুভিজ নামের বেশ খ্যাতিসম্পন্ন একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু দেশীয় চলচ্চিত্র নিয়ে দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে বিরত থেকেছেন। এমন এক পা দু পা করে সরে সরেই অন্ধকারে আমাদের এখনকার চলচ্চিত্রকে নিয়ে এসেছেন আমাদের অগ্রজরাই। আজ তাই এত বৈষম্য। ভুঁইফোড় প্রযোজকেরা সিনিয়রদের মানতে চান না আজ। তরুণ অভিনেতা যে গতকাল এফডিসি চত্বরে ঢুকেছে, সেও তোয়াক্কা করে না তার সিনিয়রকে। আঙুল তুলে প্রশ্ন তোলেন, ‘আপনার কত নিয়েছেন আর তার বিনিময়ে কী দিয়ে গেছেন আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রিকে?’ তখন আর কোনো প্রত্যুত্তর আসে না। শুধু বাড়ে বৈষম্যের বাতাস!