‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৩, ২২:৪০
ছেঁউড়িয়ায় সাধু ভক্ত-অনুসারীদের সম্মিলন যেন মহামিলনমেলায় পরিণত হয়েছে । পাঁচদিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সবের তৃতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া লালন আখড়াবাড়ির বাউল আঙিনা কানায় কানায় ভরে উঠে। ফকির লালনের মূল মাজারের সামনে মরা কালী নদীর তীরে স্থায়ী লালন মঞ্চে রাতভর চলছে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় লালন সঙ্গীত। সরকারিভাবে বানানো মূল মঞ্চে প্রকৃত বাউলদের খুব একটা দেখা মেলেনি। তবে মূল মঞ্চে কে এলো আর না এলো, কে কত বড় আর ছোট এতে আগত সাধুদের কোনো যায় আসে না। তারা সব সময় সাঁইজির ধামে ধ্যানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। গতবারের তুলনায় এবার খেলাফতপ্রাপ্ত সাধু-গুরুদের আখড়াবাড়িতে সবচেয়ে বেশি আগমন ঘটেছে। সারারাত নির্ঘুম সাধু ভক্তরা সাধুসঙ্গ আর মহাগুরু সাঁইজির স্মরণে ধ্যান করছেন। কলকাতা থেকে সাঁইজির বারামখানায় এসেছেন বাউল সুনীল ফকির । তার ভাষায় সাঁইজির ধামে এসে চরণধূলি না নিলে সাধু হওয়া যায় না। তিনি বলেন, মানব অন্তর মানুষের উপাস্য। মানবধর্মের অনুসন্ধান তার জীবন সাধনা। মানুষ ভজনের অন্তরালেই ধর্ম সাধনা, বেদ পুরাণের কালো অক্ষরে ধর্ম নেই। ধর্ম আছে মানবের চোখে, মানবের অন্তরে। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা হানিফ ফকির বলেন, সাঁইজি লালনের আচার-আচরণ ও বক্তব্যে তখনকার মানুষ ধাঁধায় পড়েছিল তার জাতিত্ব নিয়ে। জাতগর্বী সেইসব মানুষের কাছে জাত ধর্মই ছিল মানুষের বড় পরিচয়। লালনও বহুবার তার জাত ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হয়েছেন। সামপ্রদায়িক জাতিত্বে অবিশ্বাসী লালন এর সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন। সাঁইজি স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি হিন্দু না মুসলমান- এ প্রশ্ন তার কাছে অর্থহীন। কেননা, ‘যাওয়া কিংবা আসার বেলায় জেতের চিহ্ন রয় কার রে’। কথা বলতে বলতেই বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে তিনি গেয়ে উঠেন ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন কয় জেতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে’। বুধবার রাতে লালন একাডেমীর আয়োজনে কালী নদীর তীরে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনাসভা। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া-৪ কুমারখালী-খোকসা আসনের সংসদ সদস্য বেগম সুলতানা তরুণ। জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কুমারখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুর রউফ। ছেঁউড়িয়ায় আগত সাধু ভক্তরা প্রকৃতির ডাক সম্পাদনের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছেন। ভক্তদের অভিযোগ, হাজার হাজার সাধু ভক্তের জন্য হাতেগোনা কয়েকটি টয়লেটের ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। এটা অত্যন্ত অপ্রতুল। বাণিজ্যিক ভিত্তিক লালন মেলার কারণে আগত সাধুদের থাকার জায়গারও সংকট দেখা দিয়েছে।