বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের ডাকা ৩৬ ঘন্টার হরতাল গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় শেষ হয়েছে। রাজধানীতে বিক্ষিপ্তভাবে ভাংচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের মধ্যদিয়ে সীমাবন্ধ ছিল হরতালের শেষ দিনের কর্মসূচি। অধিকাংশ এলাকায় রাস্তায় তেমন কোন পিকেটার দেখা যায়নি। সকালে ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। কোন কোন এলাকায় হরতালের কোন প্রভাব পড়েনি। রাজধানী জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ছিল। এদিকে মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬ জনকে গ্রেফতার করে।
সকালে রাজধানীতে যান চলাচল কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যান চলাচলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে রিকশা ও সিএজির সংখ্যা ছিল বেশি। দুুপুরের পর নগরীর সব রাস্তায় কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য সব ধরনের যান চলাচল করতে দেখা যায়। প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে ছিল অফিসগামী মানুষের ভিড় । নিরাপদে চলাচলের জন্য অনেকে রিকশায় মিরপুর থেকে মতিঝিল গেছেন। সকাল ৮টার দিকে স্কাউট মার্কেটের কাছে বটতলার গলিতে পরপর ৩টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এ সময় পুলিশ ৪/৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে। পরে গলিতে প্রবেশ করে পুলিশ তল্লাশি চালায়। পুলিশ সেখান থেকে দুইজনকে গ্রেফতার করে। একই সময় অবিস্ফোরিত পুলিশ একটি ককটেল উদ্ধার করে বালতির পানিতে ডুবিয়ে রাখে। এছাড়া উদ্ধার করা এক বোতল পেট্রোল। শান্তিনগরবাজার এলাকা থেকে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল একটি মিছিল বের করে। পুলিশের উপস্থিতির মুখে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এসময় পুলিশকে লক্ষ্য করে প্রায় ১০ থেকে ১৫টি ককটেল বিস্ফোরিত ঘটায় হরতাল সমর্থকরা। পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ছোঁড়ে।
সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মালিবাগ মোড়ে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ ও ঝটিকা মিছিল করেছে শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় শিবিরকর্মীরা দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং একটি গাড়িতে আগুন দেয়ার চেষ্টাকালে পুলিশ মোটরসাইকেলসহ দুই শিবিরকর্মীকে গ্রেফতার করে।
সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির গলিতে হরতালের সমর্থনে ছাত্রদল একটি মিছিল বের করে। মিছিলকারীরা একটি অটোরিকশা ভাঙচুর করে ও চালক উজ্জলকে বেলচা দিয়ে বেদম প্রহার করে। আগারগাঁও বিসিএস কম্পিউটার সেন্টারের সামনে সকাল পৌনে আটটার দিকে একটি মিছিল বের করে হরতাল সমর্থকরা। এসময় মিছিল থেকে ফেলা চারটি ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। তবে একটি বিস্ফোরিত হয়।পুলিশ ৩টি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করে। প্রায় একই সময় মিরপুর-১০ নম্বর সেক্টর আল-হেলাল হসপিটালের সামনে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা একটি মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালায়।
সকাল পৌনে ৮টার দিকে ধোলাইপাড় এলাকায় জামায়াত-শিবিরের ৩০/৪০ কর্মী ঝটিকা মিছিল বের করে। পুলিশ টিয়ারগ্যাল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। মিছিলকারীরা পালাবার সময় ভাঙচুর করে কয়েকটি যানবাহন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুই জামায়াত কর্মীকে গ্রেফতার করে। প্রায় একই সময় পুরনো ঢাকায় আহসান মঞ্জিলের সামনে ছাত্রশিবির একটি মিছিল বের করে। ছাত্রলীগ কর্মীদের ধাওয়ার মুখে তারা পালিয়ে যায়। ছাত্রলীগ কর্মীরা এ সময় তিনজনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। মিরপুর বাংলা কলেজের সামনে মোটর সাইকেলযোগে দুই যুবক ককটেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তারা মোটর সাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়।
এদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা হরতালের দ্বিতীয় দিনে গতকাল মিছিল বের করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গেট থেকে শুরু করে মূল সড়কে অগ্রসর হলে পুলিশি বাধায় মিছিলটি আর এগোতে পারেনি। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ ইবনে ফজল সবুর ও তানভির মাসুম সৈকত এবং যুগ্ম আহ্বায়ক রাজিবুল হাসান রাজিব মিছিলে নেতৃত্ব দেয়।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ ও মিছিল সমাবেশের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে ১৮ দলীয় জোটের ডাকা ৩৬ ঘণ্টা হরতালের দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত হয়েছে। বুধবার রাতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বোমাবাজির পর গতকাল বৃহস্পতিবারও কয়েকটি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করে হরতালকারীরা। তবে কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সকাল ৮টায় নগরীর হেমসেন এলাকায় দুর্বৃত্তদের নিক্ষিপ্ত ককটেল বিস্ফোরণে চোখে মারাত্মক আঘাত পান অন্তু বড়ুয়া নামে এক স্কুল ছাত্রী। তিনি নগরীর অপর্ণাচরণ স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হরতালের দ্বিতীয় দিনেও নাশকতা মোকাবেলায় তত্পর ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র্যাব, পুলিশের পাশাপাশি টহল দিয়েছে বিজিবি সদস্যরা। রাস্তায় ভারি যানবাহন খুব একটা দেখা না গেলেও প্রচুর রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, টেম্পো চলাচল করেছে। নগরীর অধিকাংশ দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।
রাজশাহী অফিস জানায়, বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে পুলিশের গাড়িতে ককটেল নিক্ষেপে এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন। সকাল সাড়ে ৭টায় বিসিকের সামনে হরতাল সমর্থকরা পুলিশের টহল গাড়িতে ককটেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ মোটরসাইকেল আরোহী দুই ছাত্রশিবির কর্মীকে আটক করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুরে মিছিলের প্রস্তুতিকালে পুলিশ ২৮ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি রফিকুল ইসলামসহ চার জামায়াত নেতাকে আটক করে। গতকালও নগরীতে রিকশা, অটোরিকশা, হিউম্যান হলার চলেছে। ট্রেন চলাচলও স্বাভাবিক ছিল। বাস, কোচ, ট্রাক চলেনি।
খুলনা অফিস জানায়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের ডাকা দ্বিতীয় দিনের হরতাল গতকাল বৃহস্পতিবার বিভাগীয় শহর খুলনায় বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যদিয়ে পালিত হয়েছে। হরতালের সমর্থনে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল নগরীর বিভিন্ন স্থানে পৃথক মিছিল ও পিকেটিং করেছে। ভোর থেকেই জোটের শরীক দলের নেতাকর্মীরা নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে হরতালের সমর্থনে মিছিল করে। সকাল ৭টায় নগরীর গোয়ালখালি মোড়ে ছাত্র শিবির কর্মীরা হরতালের সমর্থনে মিছিল ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করে। এ সময় চারটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পিকেটিংকালে পুলিশের গুলিতে আবু হানিফ নামে এক ছাত্রশিবির কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়।
বরিশাল অফিস জানায়, ১৮ দলের ডাকা হরতালের দ্বিতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েছে পিকেটাররা। এতে ৮/১০টি অটোরিক্সাসহ বেশকিছু যানবাহনে ভাংচুর চালানো হয়। পিকেটিংয়ের অভিযোগে কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। বুধবার রাতে নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় ২টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে নগর জুড়ে আতংক বিরাজ করে। এতে ৫ জন আহত হয়। সকাল ১০টার দিকে নগরীতে চোরাগোপ্তা পিকেটিং করে হরতাল সমর্থনকারীরা। এ সময় বেশ কয়েকটি যানবাহনে ভাংচুর চালানোর অভিযোগে ৩ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
সিলেট অফিস জানায়, ৩৬ ঘণ্টার হরতালের ২য় দিনও ককটেল বিস্ফোরণ ও টায়ার জ্বালিয়ে সিলেটে হরতাল পালন করা হয়। তবে অন্যান্য দিনের হরতালের চেয়ে গতকালের হরতাল ছিল অনেকটাই ঢিলেঢালা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বেশকিছু রিক্সা, অটোরিক্সা, ব্যাটারী চালিত গাড়ি চলাচল করেছে। দূরপাল্লার গাড়ি চলেনি। দুপুরে টিলাগড়-খাদিম সড়কে বেশকিছু সিএনজি-অটোরিক্সা চলাচল করেছে। ভোরে হরতাল সমর্থনকারীরা নগরীর জিন্দাবাজার, মেডিক্যাল রোড, নয়াসড়ক, বন্দর বাজার, মদীনা মার্কেট, নওয়াব রোড প্রভৃতি এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করে।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, বিএনপিসহ ১৮ দলের ডাকা ৩৬ ঘণ্টার হরতালের শেষ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুর মহানগরীর পায়রা চত্বরে হরতাল সমর্থকরা একটি অটো বাইকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করলে ৫ জন আহত হয়। এদিকে সরকারি কাজে বাধাদান, পুলিশের উপর হামলা, গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে রংপুর কোতোয়ালী থানায় জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ২০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা দেড়শ জন নেতাকর্মীর নামে পৃথক ২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভারী যান চলাচল না করলেও রিক্সা ও অটো বাইক চলাচল স্বাভাবিক ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত খোলা থাকলেও উপস্থিতির হার ছিল কম। দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ ছিল।
চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, ১৮ দলের হরতালের দ্বিতীয় দিনে হরতাল সমর্থকরা সকালে চাঁদপুর-লাকসাম রেললাইনে গুনরাজদী এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। হরতালে পিকেটিং করার সময় পুলিশ চাঁদপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে ১০ জনকে আটক করেছে। শহরের মঠখোলা, ষোলঘর এবং জেএম সেনগুপ্ত সড়কে বিএনপি মিছিল করে। এছাড়া শহরের আক্কাস আলী স্কুল এলাকায় পিকেটাররা গাছের গুড়ি ফেলে এবং টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। সকাল ৯টা পর্যন্ত যানবাহন কিছুটা কম থাকলেও পরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। ট্রেন ও লঞ্চ যথারীতি চলাচল করেছে।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহে বৃহস্পতিবার ১৮ দলের ডাকা হরতালের ২য় দিনে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল দলীয় অফিস থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল করলে পুলিশ বাধা দেয় এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। একপর্যায়ে পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে পুলিশসহ ১০ জন আহত হয়েছে। পুলিশ ১৮ জনকে আটক করেছে। এদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কেবি কলেজের সামনে রেললাইনের স্লিপারে অগ্নিসংযোগ করে এবং ২টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। হরতালে যাত্রীবাহী বাস চলেনি।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ১৮ দলের ডাকা ৩৬ ঘণ্টা হরতালের দ্বিতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এলাকায় পুলিশের সাথে জামায়াত-শিবিরের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষে এক পুলিশসহ ৪ জামায়াত-শিবির কর্মী গুলিবিদ্ধ ও পুলিশসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। অপরদিকে সাতক্ষীরার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্ল¬ার কোন পরিবহন টার্মিনাল ছেড়ে যায়নি। তবে যেকোনো ধরনের নাশকতা এড়াতে শহরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, মিছিল, টায়ারে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ ও রিক্সা ভাংচুরসহ ব্যাপক পিকেটিং এর মধ্যদিয়ে ১৮ দলের ডাকা ৩৬ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় দিন বগুড়ায় অতিবাহিত হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীসূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকালে ছাত্রদলের একটি মিছিল বগুড়া শহরের কাঁঠালতলায় পৌঁছলে পর পর ৩টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় পিকেটাররা কয়েকটি রিক্সা ভাংচুর করে। পথচারীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করে। সকাল থেকেই বগুড়া শহর ও শহরতলীতে অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল। দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করেনি। তবে ট্রেন চলাচল করেছে স্বাভাবিকভাবে ।
