সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ঠাঁই পেয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় এই অচলাবস্থা এবং এর ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষত রপ্তানি খাতের কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে তারও বিশ্লেষণ চলছে। এই নিয়ে দেশের ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়ছে। সংকট সমাধানে সরকার ও বিরোধীদলে দৌড়ঝাঁপও চলছে সমান তালে। দুই দলকে আলোচনায় বসে সমাধান করতে বার বার তাগিদ দিচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধীদলকে হরতাল প্রত্যাহার করে বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে তাদের এই আহ্বান বা দাবি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে বলে মনে হয় না।
চলমান অচলাবস্থায় দেশের রপ্তানি খাত বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশংকার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। সম্প্রতি সাময়িকীটিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের বড় ক্রেতারা বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে। তাদের মধ্যে ভিএফ ও টেসকোর মত বড় বেশ কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান (বায়ার) ইতিমধ্যে প্রতিবেশী ভারতসহ কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় অর্ডার নিয়ে গেছে। এসব অর্ডার বাংলাদেশেই দেয়ার কথা ছিল। ‘বাংলাদেশ রায়ট থ্রেটেন ইটস বুম’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক দাঙ্গা বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সুনাম ক্ষুন্ন করছে। মজুরি বৃদ্ধি ও উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন শিল্পের পিছনে ছুটতে গিয়ে বিশ্বের বৃহত্ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন ধীরে ধীরে এই খাত থেকে সরে যাচ্ছে। এই সম্ভাবনা আসার জন্য বাংলাদেশ ছিল অন্যতম বিকল্প। কিন্তু ক্রেতারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
প্রতিবেদনে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান টেসকোর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্রিস্টোফ রাসেলের বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ ব্যবসায়ের জন্য ভাল জায়গা ছিল। কিন্তু আপনাকে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।’ বাংলাদেশের পোশাকের অন্যতম বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ভিএফ কর্পোরেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিট গাইস আরেক কদম এগিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আমরা ইতিমধ্যেই সরতে শুরু করেছি।’
টেসকো কর্পোরেশন পূর্বে ৮০ শতাংশ পণ্য চায়না থেকে সংগ্রহ করলেও বর্তমানে তা ৬০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এই আমদানির বড় অংশ বাংলাদেশে চলে আসার সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে টেসকো নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে। ক্রিস্টোফ আরো উল্লেখ করেছেন, এর জন্য বাংলাদেশের কারখানাগুলো দায়ী নয়, দায়ী বর্তমান পরিস্থিতি। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি তুরস্ক, পূর্ব ইউরোপ এবং আফ্রিকার প্রতি ঝুঁকছে।
চীন, দক্ষিণ আমেরিকার একাধিক দেশ, দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে চলমান সহিংসতায় তাদের সফর বাতিল করেছে। তৈরি পোশাক উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন মার্চ এপ্রিল মাসে বায়াররা বড় পরিমাণে অর্ডার দেয়। কিন্তু চলমান সহিংস ঘটনায় তারা না এসে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে এসব বায়ারকে আর পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে।
এদিকে সাম্প্রতিক হরতাল আর হানাহানির ঘটনায় বিশ্বখ্যাত খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট তাদের বাংলাদেশে তাদের অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। ক্রমশ বাংলাদেশে তাদের ক্রয় আদেশ কমিয়ে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামে নিয়ে যাচ্ছে বলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক উইমেন্স উইয়ার ডেইলিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান রাইটস-এর নির্বাহী পরিচালক চার্লস কারনেগহ্যাম-এর বরাত দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রতি তাদের আস্থা নড়বড়ে হওয়ায় তুলনামূলক বেশি শ্রম মজুরির দেশ কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে চলে যাচ্ছে ওয়ালমার্ট। বাংলাদেশে মজুরি বিশ্বে সর্বনিম্ন। এখানে শ্রমিকরা ঘণ্টাপ্রতি ১৮ থেকে ২৬ মার্কিন সেন্ট পায়। অথচ চীনে এই হার এক ডলার ৩৪ সেন্ট। কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে ঘণ্টাপ্রতি মজুরি যথাক্রমে ২৯ ও ৫৫ সেন্ট। এতে ওয়ালমার্টের খরচ কিছুটা বাড়লেও সেখানে তারা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অবকাঠামো সুবিধা পাবে।
পোশাক খাতের জন্য এ ধরনের উত্কণ্ঠা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৫ সালে কোটা প্রথা উঠে যাওয়ার প্রাক্কালে চীনের কাছে রপ্তানি মার খাওয়ার আশংকা তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশ ওই পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেয়া হালনাগাদ তথ্য অনুসারে চলতি ২০১২-১৩ অর্থ বছরের প্রথম আট মাসেও (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রপ্তানি পূর্বের অর্থ বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ হারে। তবে রপ্তানির প্রধান গন্তব্য ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে এই প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওই অঞ্চলে মন্দাভাব ও বাংলাদেশি বিক্রেতাদের জাহাজীকরণ দেরি হওয়ার ঝুঁকি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার জন্য দায়ী।
চলমান হরতালে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরির ফলে মানবিক বিপর্যয়ের আশংকা করছে এফবিসিসিআই। ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ সংগঠনের হিসেবে একদিনের হরতালে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয় যার মধ্যে ৩৬০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতে। একদিন হরতাল হলে শিল্প-বাণিজ্যের তিন দিন বন্ধ থাকার সমান ক্ষতি হয়। আর প্রতিদিনের হরতাল অবরোধে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির প্রায় দশমিক ১২ শতাংশ। এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে রপ্তানি অর্ডার হারাতে শুরু করেছি। ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। সার্বিক কারণে চলতি অর্থ বছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে। আর বেসরকারি খাতের উন্নয়ন যদি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। এর ফলশ্রুতিতে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।
এদিকে রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, লিডটাইমে (চুক্তিবদ্ধ সময়) ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অনেকে যথাসময়ে পণ্য পাঠানোর জন্য ১০ গুণ বেশি ভাড়ায় আকাশপথকে বেছে নিচ্ছেন। আবার দেশের অভ্যন্তরেও পরিবহন ভাড়া বেড়ে গেছে। ইউরোপ-আমেরিকার মন্দা পরিস্থিতিতে সেখানে গার্মেন্টস পণ্যের দাম কমে গেছে। এই অবস্থায় নতুন এই অচলাবস্থার ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পথে বসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তারা চাচ্ছেন দ্রুত এই সংকট কাটুক। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চান তারা।
