বিনিয়োগ বাড়ছে না বাড়ছে রিজার্ভ

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৩, ১৫:৫৬
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর ভর করে সামপ্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশ শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়লেও বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে না। ফলে রিজার্ভ বাড়ছে। ডলারের দামও স্থিতিশীল হচ্ছে। তবে বিনিয়োগ না বাড়ায় রিজার্ভের সঞ্চয় আশা জোগাতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশের রিজার্ভ বাড়ছে তা ইতিবাচক। তবে তার সাথে তাল মিলিয়ে বিনিয়োগের প্রসারতাও আসতে হবে। অন্যথায় রিজার্ভের সুফল পাওয়া যাবে না। যে হারে দেশের রিজার্ভ বাড়ছে ও ডলারের দাম কমছে তাতে বিনিয়োগের জন্য কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হলে উদ্যোক্তারাও লাভবান হতে পারবেন। তবে দেশের অবকাঠামো পরিস্থিতি, জ্বালানির অপ্রতুলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বিবেচনায় শিল্প উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আসতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, সামপ্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় হয়েছে। মার্চে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪১০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। ২০১১ সালের ডিসেম্বর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৯৬৩ কোটি ডলার। ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে তা প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বা শতকরা ৩২ ভাগ বেড়ে যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে এক হাজার ৩০৫ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। আর মার্চে রিজার্ভের পরিমাণ এক হাজার ৪১০ কোটি ৫০ লাখ হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ প্রবণতা কমে আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ায় এ পরিমাণ রিজার্ভের পরিমাণ বেড়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ২০১২ সালে প্রবাসীরা এক হাজার ৪১৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। রেমিট্যান্স বাড়ার পাশাপাশি এ বছর আমদানি কমেছে যথেষ্ট পরিমাণে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমদানি দ্রব্যের ওপর ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে এক হাজার ৮৭২ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল দুই হাজার ১০৮ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। সে হিসেবে আমদানি কমেছে ২৩৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার বা ১১ দশমিক ২২ শতাংশ। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া। তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিতে এলসি নিষ্পত্তির হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশ কমে গেছে। একইভাবে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও চলছে নেতিবাচক প্রবণতা। অর্থবছরের সাত মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে এলসি নিষ্পত্তির হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৬ শতাংশেরও বেশি। শুধু মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামালই নয়, সার্বিক আমদানিও অনেক কমেছে। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে দেশীয় মুদ্রা টাকার বিপরীতে ডলার নিস্তেজ হয়ে আসছে। শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল কমার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই; নেই বিনিয়োগের পরিবেশ। বিনিয়োগের আস্থা না থাকলে বিনিয়োগ হবে না এটাই স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে আমদানি যে কম হচ্ছে তার নেতিবাচক প্রভাব পরবর্তী ৩ থেকে ৫ মাস পরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বর্তমানে যে হারে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি কমছে, তা দেশের শিল্পব্যবস্থার জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়। এভাবে আমদানি কমার অর্থই হলো দেশে বিনিয়োগের কোনো পরিবেশ নেই, যা সরাসরি বেসরকারি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন শিল্প-কারখানার জন্য বিদ্যুত ও গ্যাসের সংযোগ না পাওয়ায় বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে পারছেন না। উপরন্তু বিনিয়োগ সঙ্কুচিত করে আনছেন। তাই যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমছে। এদিকে আমদানি কমে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে ডলারের দামও কমছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে টাকার মূল্যমান ডলারের বিপরীতে শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর গত সাড়ে ১৩ মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে ৫ টাকা ৯০ পয়সা। শতকরা হিসাবে এ সময় ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। এদিকে দেশের রিজার্ভ বাড়তে থাকলেও সে হারে নীট ফরেন এসেট বাড়ছে না। ফলে দেশের মোট ব্যবসায়িক ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। শিল্পোদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী ঋণ না পাওয়ায় শিল্প প্রসার হচ্ছে না। কমছে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ। যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ কমে আসার প্রবণতা বুঝার জন্য বিনিয়োগ বোর্ডে বিনিয়োগ প্রস্তাবনার তথ্যের দিকে নজর দিলেই বুঝা যাবে। বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে দেশীয় ১২১টি বিনিয়োগ প্রকল্পের নিবন্ধন হয়েছে। বিদেশি এবং যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ২১টি প্রকল্পে। এক মাস আগে জানুয়ারি মাসেও দেড় শতাধিক বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিলো দেশে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারীরা ১৬৫৫টি শিল্প নিবন্ধন করেছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের রিজার্ভ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে খুব একটা আত্মতুষ্টিতে ভোগার কিছু নেই। কারণ রিজার্ভ স্বল্প মেয়াদী। আর রিজার্ভ স্বল্প মেয়াদি হওয়ায় স্বল্পমেয়াদি স্থিতি দিয়ে দেশের দীর্ঘ মেয়াদি উন্নয়নের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তাছাড়া রিজার্ভ যে কোনো সময় কমতে পারে। বিশ্ব মন্দার প্রভাব, শ্রমিক রফতানি কমে যাওয়ায় সামনে এ আশঙ্কা বড় হয়ে উঠতে পারে। তাই রিজার্ভ নিয়ে বড় কোনো স্বপ্ন দেখা বা উচ্চবাচ্য করার সুযোগ নেই। বর্তমানে আমাদের রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ হলো রেমিট্যান্স। সামপ্রতিক সময়ে আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ। এ ধরনের প্রবণতা শ্রমিক রফতানিকারক অন্য দেশগুলোতেও বিদ্যমান। তবে রেমিট্যান্সের অর্থ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুত্পাদনশীল খাতে ব্যয় হয়। যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। আর রেমিট্যান্স যেহেতু গ্রামাঞ্চলেই বেশি যায় তাই গ্রামাঞ্চলে বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতির হারও বেশি। অর্থনীতিবিদ হার্শম্যানের ট্রিকল ডাউন ইফেক্ট বা চুইয়ে পড়ার প্রভাব এক্ষেত্রে তেমন একটা নেই। কারণ হার্শম্যানের তত্ত্ব অনুযায়ী যদি একটি স্থানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় তথা কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয় তবে এর প্রভাব পড়বে ওই স্থানের অনেকের উপর। যেহেতু রেমিট্যান্সের অর্থের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ খুব কম তাই এর মাধ্যমে ট্রিকল ডাউন ইফেক্ট পড়বে তা বলা যাবে না।