প্রতিবন্ধী শিশু শব্দটি বাংলাদেশে একটা নতুন বিষয় নয়। সাধারণত যে বিশেষ শর্তগুলোর জন্য একজন শিশু প্রতিবন্ধী হয়ে থাকে তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণটি হল সেরিব্রাল পলিস বা মস্তিস্কে পক্ষাঘাত। এটা এমন এক ধরণের প্রতিবন্ধীতা যা শারীরিক অবস্থানকে প্রভাবিত করে। এটা সাধারণত: মস্তিস্কের ক্ষতিগ্রস্থতা থেকে হয়ে থাকে যা শিশুর জন্মের পূর্বে, জন্মের সময় একং জন্মের পরে বা ছোট অবস্থায় হয়ে থাকে। এতে মস্তিস্কের সম্পূর্ণ অংশের ক্ষতি হয়না, শুধুমাত্র অংশ বিশেষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সাধারণত: মস্তিস্কের যে অংশগুলো শরীর নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে সে অংশগুলো। মস্তিস্কের এই রকম সমস্যা হওয়ার অন্যতম কারণ হলো জন্মের সময় মস্তিস্কে অক্সিজেনের অভাব। পরবর্তীতে মস্তিস্কের এই ক্ষতির প্রসারও হয়না আবার ভালও হয়না। বরং শিশুটির সাথে আমরা কি রকম আচরণ করছি বা লালন পালন করছি এবং তার মস্তিস্ক কতটা ক্ষতিগ্রস্থ এগুলোর উপরেই শিশুটির শারীরিক অবস্থান এবং এ সম্পর্কীয় সমস্যার উন্নতি এবং অবনতি নির্ভর করে। তাই যত তারাতারি আমরা এর ব্যবস্থাপনা শুরু করব তত দ্রুত শিশুটির উন্নতি নির্ভর করবে। সাধারণত প্রতি ৩০০ জন শিশুর ১ জন সেরিব্রাল পলিস নিয়ে জন্মগ্রহণ করে বা পরবর্তীতে এর শিকার হয়।
আমরা কিভাবে বুঝবো যে একজন শিশু সেরিব্রাল পলিসতে আক্রান্ত হয়েছে? কিছু প্রাথমিক লক্ষণ খেয়াল করতে হবে। যেমন জন্মের সময় সেরিব্রাল পলিসতে আক্রান্ত শিশু স্বাধারণত: নেতানো বা শিথিল হয়ে থাকে। জন্মের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক ভাবে নাও নিতে পারে, সমবয়সী অন্যান্য শিশুদের তুলনায় ধীর গতিতে বিকাশ হতে পারে, শিশুর হাত-পা স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার না করা, শিশুর বুকের দুধ ও ফিডার চুষে খাওয়াতে সমস্যা থাকতে পারে, শিশুটা খুব কাঁদতে পারে বা অস্থির ও খিটখিটে হতে পারে অথবা খুব শান্তও হতে পারে, শিশুর ভাব বিনিময়ে সমস্যা থাকতে পারে, শ্রবণ ও দৃষ্টিতে সমস্যা থাকতে পারে, শিশুর খিচুনি বা মৃগী সমস্যা থাকতে পারে, অশান্ত আচরণ থাকতে পারে, অনুভূতিতে সমস্যা থাকতে পারে যেমন ঠান্ডা, গরম, ব্যথা, স্পর্শ বা শারীরিক অবস্থানের অনুভূতি, শিশুর কিছু প্রিমেটাল রিফ্লেক্স এ সমস্যা থাকতে পারে। সেরিব্রাল পলিস সাধারণত: তিন প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন পেশীর শক্ত ভাব বা অনমনীয়তা যা দু’হাত, দু’পা একসাথে অথবা শুধু দুই হাত বা শুধু দুই পা, বা শুধু এক হাত, বা শরীরের ডান বা বাম পাশ বা পুরো শরীরকে প্রভাবিত করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া বা এথেটোসিস এবং কম ভারসাম্য বা এটাক্সিয়া। কোন সমস্যা তৈরি করে তার সমাধান না খুজেঁ বরং আমাদের উচিত সমস্যা যেন তৈরি না হয় তার ব্যবস্থা নেয়া। সেরিব্রাল পলিস কি কি কারণে হতে পারে সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ধারনা থাকলে প্রতিরোধ করা অনেকটা সহজ হবে। জন্মের আগের কারণগুলো হলো মা যদি গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ না করেন। পিতা-মাতা ড্রাগ নেয়া বা নেশাগ্রস্থ হয় বা ধুমপান করে। মায়ের যদি বিশেষ কোন রোগ থেকে থাকে (যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, হেপাটাইটিস, জন্ডিস, খিচুনী, রক্তস্বল্পতা, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি। মা পড়ে গিয়ে পেটে আঘাত পেলে অধিক ঝাকুনী সম্পন্ন ভ্রমন করিলে, গর্ভাবস্থায় অধিক শক্তি সম্পন্ন ওষুধ সেবন করলে, ভারী কাজ বা ভারী জিনিস বহন করলে ইত্যাদির কারণে বাচ্চা প্রসব যদি নির্দিষ্ট সময়ের আগে বা পরে হয়ে থাকে অথবা বাচ্চা প্রসবের সময় অনেক জটিলতা সৃষ্টি করে। যা পরবর্তীতে প্রতিবন্ধীতার রুপ নেয়। বাচ্চা জন্মের সময় উল্লেখযোগ্য কারণ গুলো হলো জন্মের পর বাচ্চা কান্না না করা বা দেড়ীতে কান্না করা, ব্রেনে অক্সিজেনের অভাব হলে, মাথায় আঘাত পেলে, পিঠে বা শরীরের অন্যকোন জায়গায় আঘাত পেলে, মায়ের পেটে বাচ্চা উল্টো থাকলে এবং সে কারণে বের করতে সমস্যা হলে, অনভিজ্ঞ দাই দ্বারা বাচ্চা প্রসব করালে, বাচ্চা জন্মের সময় জন্ডিস, খিচুনী, নিউমোনিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে, নির্দিষ্ট সময়ের আগে বা পরে বাচ্চা জন্ম নিলে ইত্যাদি। বাচ্চা জন্মের পরের কারণগুলো হল বুকের দুধ না খেলে, বাচ্চাকে ঠিকমত যত্ন না নিলে, কোন দূর্ঘটনার শিকার হলে সেরিব্রাল পলিসতে আক্রান্ত হতে পারে। উপরোক্ত কারণগুলো সেরিব্রাল পলিসর জন্য দায়ী হলেও আরো অনেক অজানা কারণও থাকতে পারে। মোট কথা কোন অস্বাভাবিক আচরণ বা বৈশিষ্ট্য থাকলে সাথে সাথে কোন শিশু বিশেষজ্ঞ বা থেরাপীষ্টের স্বরণাপন্ন হতে হবে এবং উনাদের পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রাত চিহ্নিত করন ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ সেরিব্রাল পলিস থেকে শিশুকে স্বাভাবিক করার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।
