‘সবকো সুমতি দে ভগবান’

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৩, ২১:৩৬
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এখানে কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে সেরা আখ্যায়িত করা হয়নি। শুধু মানুষকেই বলা হয়েছে। তবে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় বিভিন্ন ধর্ম অবলম্বনে মানুষ চর্চা করে থাকে। যুগ যুগ ধরে আমাদের এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় জাতি-গোষ্ঠীর বাস। এদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস বহু পুরনো। এদেশের মাটি যেমন নরম ও উর্বর তেমনি মানুষের মনও কোমল ও সহানুভূতিপূর্ণ। আমাদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধ কখনো সামাজিক সহাবস্থানে ফাটল ধরাতে পারেনি। মানবিক বোধকে কাবু করতে পারেনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের গর্বের বিষয় হলেও আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। ২০০১-এর নির্বাচনোত্তর সময়, সম্প্রতি ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধ মামলার রায় ঘোষণার পরবর্তী সংখ্যালঘু অর্থাত্ অন্য ধর্মালম্বীর ওপর নৃশংস সহিংসতা চালানো হয়। কিছুদিন আগে রামুতে ঘটেছে এমন। সংখ্যালঘুরা অসহায় (!) তাদের কোনো মত, পথ, আদর্শ থাকতে পারে না, তারা দেশের জন্য কাজ করতে পারবে না, তারা উন্নতি করতে পারবে না, তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যাবে না— সাম্প্রতিক ঘটনায় তাই মনে হয়। কিন্তু যাঁরা (সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে) ধর্মের কথা বলেন কিংবা রাষ্ট্রধর্মের জিকির তুলে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর ওপর এসব কর্ম করেন তাঁরা কি ভেবে দেখেছেন ইসলামের আদর্শ কী? মহানবীর প্রবর্তিত মদিনা সনদে কী লেখা আছে? হজরত উমর (র) তাঁর শাসনামলে অন্য ধর্মের লোকদের জন্য কী করতেন? ইসলাম কি অন্য ধর্মের লোক বা উপাস্যদের গালি দিতে নিষেধ করেনি? মহানবী ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে বারণ করেননি? আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় এলে পাহাড়ে তৈরি করা বৌদ্ধ মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলা হয়। মূর্তি মুখে কিছুই বলতে পারে না। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর উপাস্য যে। আফগানিস্তানের আজ অবস্থা? ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুদের উত্সাহ দানকারী বিজেপি দল বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার নেতৃত্ব দিয়ে বিজয় ডংকা বাজাচ্ছিল। কিন্তু শান্তিপ্রিয় জনগণ তা মেনে নেয়নি। আজ কি সে দল অনুতপ্ত বোধ করছে না। মালয়েশিয়া পৃথিবীর একটি উন্নত দেশ। যার নেতৃত্বে ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদ। সে দেশটিতে ১৯৬৯ সালে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছিল। এরপর নেতৃবৃন্দের উপলব্ধি হয় উন্নয়ন করতে হলে দাঙ্গা, হিংসা, ধ্বংস নয় বরং কর্ম দরকার। তারই ফল আজকের মালয়েশিয়া। অতীশ দীপঙ্কর, জগদীশ চন্দ্র বসু, রণদা প্রসাদ সাহা, মেঘনাদ সাহা, নিতুন কুণ্ড, দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, স্যামসন এইচ চৌধুরী প্রমুখ এদেশের সম্পদ নন? ব্রজেন দাস ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে দেশের সম্মান বয়ে আনেননি? ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত রাজনীতির আসনে দেশের জন্য কাজ করেননি? এদেশের উন্নয়নে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়ের ডাক্তার, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সঙ্গীতজ্ঞ ও লেখকসহ হরেক পেশার মানুষ কি কাজ করছেন না? একাত্তরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম-যুদ্ধ করেননি? তবু কেন এই আক্রমণ? যারা একটি রাজনৈতিক দলের লেবেল এঁটে সংখ্যালঘুদের দূরে ঠেলে আক্রমণ চালায় তারা সত্যিকার অর্থে ইসলাম এবং মহানবীর আদর্শে থেকে সহবস্থানে কি তাদের কাছে ডেকেছে? কাছে ডাকার ব্যবস্থা করেছে? হামলা, আগুন লাগানো, ভেঙে ফেলা ইত্যাদিতে ধ্বংস হয়, ক্ষতি হয়, পুড়ে যায়। এর সমূহ ক্ষতি কি দেশের ক্ষতি নয়? একপর্যায়ে দেশ ছাড়ার অবস্থা হতে পারে ক্ষতিগ্রস্তদের। তাদের মধ্যে কি মেধাবী, দক্ষ, অভিজ্ঞ ও সম্পদশীল থাকে না? দেশ এসব হারায়। আর ক্ষতিগ্রস্তদের সব হারানোর ক্রন্দন কি প্রভু শুনবেন না? দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র করা হয়? কতদূর এগিয়েছে সে দেশ? আত্মঘাতী বোমা হামলা, শিয়া-সুন্নী সংঘর্ষ, জঙ্গি হামলা, মসজিদে বোমা তবুও কেন? কেন স্থিতিশীলতা নেই সেখানে? আমাদের ভাষা, স্বাধীনতার জন্য মুসলমানকে কি হত্যা করেনি তারা? জ্ঞান-বিজ্ঞানে ইসলামের জয় জয়কার ছিল এক যুগে। ইবনে সিনা, আলকেমির অবদান অপূরণীয়। কিন্তু অন্ধ ও নেতিবাচক চেতনায় সেই রেনেসাঁ পাশ্চত্য দেশ লুফে নেয়। ফল? মুসলমানরা পরনির্ভরশীল, পরমুখাপেক্ষি আজও। বিশ্বে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিকাংশ দেশ সংঘাতপূর্ণ, অস্থিতিশীল, দুর্নীতিপূর্ণ নয় কি? অনুন্নত কেন? টুইন টাওয়ার হামলার পর মুসলমানদের পরিচয় কোন দিকে যাচ্ছে? আমাদের দেশ খনিজ সম্পদে ভরপুর। আমাদের আছে ভূমি সম্পদ, পানি সম্পদ, মানব সম্পদ। আমাদের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ যেন অন্য কেউ গ্রহণ না করে— এটি গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। অনেক ত্যাগ, রক্ত আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশ। দেখতে হবে, আমাদের অনেক অর্জন ও সফলতায় যেন কালো চিহ্ন না পড়ে। কেননা অনেক দেশের এমন পরিস্থিতির প্রতি তাকানোর সময় এসেছে। বিশ্বও আজ সহাবস্থানের কথা বলে। আমাদের দেশটিও বিশ্বের বাইরে নয়। উন্নত জাতি গড়তে সবার অংশগ্রহণ দরকার। বিভেদ নয়, ঐক্য দরকার। ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তাদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই হোক আদর্শ। হত্যা, ভয়, আতঙ্ক, আঘাত, দেশছাড়া নয়; ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় হোক। ধর্মের মাঙ্গলিক বার্তা হূদয় থেকে প্রবাহিত হোক। তাই জ্ঞানভিত্তিক, ধর্মীয় উদার মনোভাবাপন্ন সম্প্রীতিভিত্তিক, কর্মভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে সচেষ্ট হই। যে আদর্শ সমাজ হযরত মুহাম্মদ (স) গড়েছিলেন। আর ক্ষমা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহাবস্থান, মত ও ধর্ম পালনের অধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসার পরিবেশ গড়ি। কেননা নানা বর্ণের, মতের, ধর্মের মানুষ তিনি তৈরি করেছেন। এ যে একান্তই তাঁর লীলা। জেহাদ হোক অন্ধত্বকে সাঙ্গ করে ক্ষুদ্র মানসিকতা নিয়ে গড়ে ওঠা নয়, বরং জেহাদ হোক আদর্শ, উন্নত, শিক্ষিত, ইসলামের শান্তির পথে উদারনৈতিক জাতি গঠনের। বিশ্বে যেন মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকাই। দেখবো তারা ধর্মকে ভালবাসা ও কর্মের প্রেমবন্ধনে লালন করছে, লোকদেখানো কিংবা মৌখিক পালনে নয়। আমরাও কি পারি না? পরিশেষে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানের মাধ্যমে আবারও জানাই— ‘সবকো সুমতি দে ভগবান’। গাইবান্ধা