হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ নিয়ে চট্টগ্রামে নানা জল্পনা

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৩, ২২:২৩
সংবিধানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাসের ধারা পুনর্বহাল, রাসুল (সা.) এবং ইসলাম অবমাননার জন্য ফাঁসির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন, শাহবাগ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ব্লগারদের শাস্তি, আলেম-ওলামাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন বন্ধ এবং পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে মনগড়া ব্যাখ্যা অপসারণসহ ১২ দফা দাবি আদায়ে মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসাবে ৬ এপ্রিল শনিবার রাজধানী ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচির সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একইদিন ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে সমাবেশ করার কথা তাদের। এ কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হলে পরদিন অর্থাত্ ৭ এপ্রিল থেকে লাগাতার হরতালের মাধ্যমে দেশ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। লংমার্চের আগে আগামী সোমবার চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে শানে রেসালাত সম্মেলন করার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনও অনুমতি দেয়া হয়নি বলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার জানিয়েছেন। পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ কর্মসূচির কথা এক মাস আগে আমাদের জানানো হয়েছে। আমরা তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি লক্ষ্য রাখছি। তবে তাদের অনুমতি দেয়ার দায়িত্ব আমাদের নয়। হেফাজতের শানে রেসালাত সম্মেলন এবং ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখী লংমার্চ কর্মসূচি ঘিরে চট্টগ্রামে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা এবং উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা থাকলেও এ ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া জানাতে চাননি সরকারি দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা। বিরোধী দলের হরতাল বা অবরোধ কর্মসূচি প্রতিহত করার জন্য আগেভাগে নানা কর্মসূচি ঘোষণা করলেও লংমার্চ প্রতিহত করার জন্য পাল্টা কোন কর্মসূচি আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। তবে বিরোধী দলের নেতারা হেফাজতের সাথে সংলাপে বসার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, দেশব্যাপী হাজার হাজার কওমী মাদ্রাসায় হেফাজতের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাদের দাবি আমলে নিয়ে আলোচনার পথে না এগোলে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকারকেই দায়ী থাকতে হবে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতসহ সুন্নীপন্থী আলেমদের একাংশ হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীসহ কয়েক নেতার বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন। আলেমদের এ অংশটি হেফাজত নেতাদের বিচার দাবি করেন এবং তাদের কোন কর্মসূচিতে অংশ না নেয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। লংমার্চ কর্মসূচি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতার মতামত জানতে চাওয়া হলে তারা এ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে চাননি। তবে কেউ কেউ বলেন, হেফাজতে ইসলামের দাবি-দাওয়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় যথেষ্ট সময়োপযোগী নয়। এসব দাবি-দাওয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বা সমর্থন নেই। লংমার্চ করে সরকারকে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করার সামর্থ্য হেফাজতের নেই বলেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন। নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, একটি ইসলামী সংগঠন লংমার্চ কর্মসূচি দিয়েছে। সরকার একে কিভাবে বিবেচনা করছে, সেটা সরকারই জানে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব সরকারেরই। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ড হলে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ কর্মীরা ঘরে বসে থাকবে না। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে তারা যথাসময়ে যা করা দরকার তা করবে। চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় যেকোন দল বা সংগঠন নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে জনগণের সামনে আসতে পারে। জনমত সৃষ্টির জন্য আন্দোলন করতে পারে। সরকারের উচিত সকলের সাথে কথা বলা। কিন্তু এ সরকার কারো সাথে কথা বলতে চায় না। তারা স্বৈরাচারী কায়দায় নিজেদের খেয়াল-খুশিমত দেশ চালাচ্ছে। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন সম্পর্কে আমীর খসরু বলেন, সরকার আলেম সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। আলেমদের একটি অংশের প্রতিপক্ষ হিসাবে সরকার নিজেদের দাঁড় করিয়েছে। সমপ্রতি মতিঝিলে দুই কিলোমিটার রাস্তা বন্ধ করে পুলিশ প্রহরায় অনুষ্ঠিত আলেমদের এক সমাবেশে ৫শ লোককেও জড়ো করতে পারেনি তারা। এটা কি সরকারের জন্য ভালো হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ কর্মসূচিকে কেন্দ করে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে বলে আমীর খসরু উল্লেখ করেন। এদিকে লংমার্চ কর্মসূচিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করে একে সফল করতে দেশের ৬৪ জেলায় জেলা ও বিভিন্ন নগর কমিটি গঠনের কাজ সম্পন্ন করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ৬ এপ্রিলের মধ্যে থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠনের কাজও শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের দায়িত্বশীলরা। এছাড়া চলমান আন্দোলনে আলেম-ওলামার পাশাপাশি অন্যান্য শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী, চিকিত্সক, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে আলাদা আলাদা ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করছে সংগঠনটি। আগামী ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখী লংমার্চ কর্মসূচির সাফল্য মূল্যায়ন সাপেক্ষে আরও কিছু সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে হেফাজতে ইসলামের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন। দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে প্রধান করে ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে হেফাজতে ইসলাম গঠন করা হয়। সংবিধান থেকে আল্লাহর প্রতি আস্থার বিধান বাতিল, ইসলাম ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক শিক্ষা ও নারীনীতি প্রণয়ন এবং হাইকোর্টে ফতোয়াবিরোধী রায়সহ সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের প্রতি অনাস্থা থেকে এ সংগঠন সৃষ্টি হয়। অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও হেফাজতের সাথে আদর্শিকভাবে সহঅবস্থানে রয়েছে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক ১২টি ইসলামী দল। এদের মধ্যে রয়েছে নেজামে ইসলাম পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন (চরমোনাই পীরসাহেব), খেলাফত মজলিশ, খেলাফত আন্দোলন, খেলাফতে ইসলামী, আন্তর্জাতিক মজলিশে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত ইত্যাদি। একটি মহল হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে মিথ্যা প্রচারণার আশ্রয় নিয়েছে। সমপ্রতি শাহবাগ আন্দোলনের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ কয়েকজন সংগঠক দু’টি সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য চট্টগ্রামে আসতে চাইলেও হেফাজতের তীব্র প্রতিরোধের মুখে ওই কর্মসূচি বাতিল করা হয়। এছাড়া হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার সমপ্রতি ইন্টারনেটে ধর্মবিদ্বেষী প্রচারণা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেছে।