ব্রিটেনে বসবাসরত অভিবাসীদের ওপর রীতিমত চড়াও হয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন সরকার। ২০১০ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই কোয়ালিশন সরকারের প্রধান শরিক কনজারভেটিব পার্টি দেশটির ইমিগ্র্যাশন আইনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। তাদের প্রধান নির্বাচনী ওয়াদাই ছিল ব্রিটেনের গণ ইমিগ্র্যাশনের লাগাম টেনে ধরা। যার ফলে কনজারভেটিব সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইমিগ্র্যান্টদের প্রবেশই শুধু হ্রাস পায়নি, সেখানে ইতিমধ্যে যারা বসবাস করছেন তারাও পড়েছেন নানা বিপাকে।
২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য মতে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে মোট ৫ কোটি ৬ লাখ জনসংখ্যার ১৩ শতাংশই অভিবাসী। স্থানের বিবেচনায় লন্ডন শহরেই অভিবাসীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ শহরের প্রতি দশজন লোকের ৬ জনই ভিন্ন কোন দেশ থেকে এসেছেন। আবার এ দেশে মোট ইমিগ্র্যান্টদের অর্ধেকেরও বেশির আগমন ঘটেছে ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে। এ দশ বছরে ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিমাণ তিন কোটি সাত লাখ। এ সময়ের পুরোটাই দেশটিতে ইমিগ্র্যান্ট বান্ধব হিসেবে পরিচিত লেবার পার্টি ক্ষমতায় ছিল। ব্রিটেনের প্রেক্ষিতে ইমিগ্র্যাশন সে দেশের মানুষের জন্য যতটা না সমস্যা তার চাইতে বেশি সমস্যা দেশটির সরকারের জন্য। কেননা, এখানে একবার আজীবন থাকার অনুমতি পেলেই সরকার তাদের ভরণ-পোষণ (বাড়ি, বেকার ভাতা, শিশু সন্তানের জন্য ভাতা, বৃদ্ধ ভাতা, বিনামূল্যে চিকিত্সা ইত্যাদি) দিতে বাধ্য। আবার যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশের নাগরিক তারা কোন ভিসা গ্রহণ ছাড়াই ইচ্ছামত ব্রিটেনে আসা-যাওয়া করতে পারেন এবং ব্রিটেনে থাকাকালীন একজন পূর্ণাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকের ন্যায় সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। এ অবস্থায় ইমিগ্র্যান্টদের পেছনে সরকার প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে বলে সমালোচনা উঠে। ফলে ২০১০ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইমিগ্র্যাশন বিষয়টি রাজনীতির মাঠে প্রধান ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এ নির্বাচনের প্রচারণায় কট্টরপন্থিদল কনজারভেটিব পার্টি ইমিগ্র্যাশন বিষয়টিকে ব্রিটেনের প্রধান সমস্যা হিসেবে দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরে। তারা ঘোষণা দেয় ক্ষমতায় গেলে এক মেয়াদে অর্থাত্ ২০১৫ সালের মধ্যে ব্রিটেনের নেট ইমিগ্র্যশনকে (যে পরিমাণ মানুষ ব্রিটেনে প্রবেশ করে এবং যে পরিমাণ মানুষ ব্রিটেন ছেড়ে যায় তার পার্থক্য) বছরে ১শ’ হাজারের নিচে নামিয়ে আনবে। যা ২০১০ সালে ছিল প্রায় ২৮৪ হাজার।
ইমিগ্র্যাশনের লাগাম টেনে ধরার লক্ষ্যে কনজারভেটিব সরকার শুরু থেকেই নানা সংস্কার কর্মসূচি চালু করে। এর মধ্যে প্রথমেই টার্গেটে পরিণত হয় এ দেশে আসা শিক্ষার্থীরা। অনিয়মের অভিযোগ তুলে সরকার প্রায় এক হাজারের বেশি বেসরকারি কলেজ বন্ধ করে দেয়। এসব কলেজের শিক্ষার্থীদের অন্যতম অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে আসা। শিক্ষার্থীদের কাজ করার উপরও আরোপ করা হয় নিষেধাজ্ঞা। ইউনির্ভাসিটিতে পড়া শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে ২০ ঘন্টা কাজ করার অনুমতি থাকলেও কলেজে পড়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কাজ করার অনুমতি পুরোপুরি তুলে নেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য বেঁধে দেয়া হয় নিয়মিত ক্লাস করার বাধ্যবাধকতা। সেইসাথে অবৈধ এবং নিয়ম ভঙ্গকারী ইমিগ্র্যান্টদের ধরপাকড়েও শুরু হয় ব্যাপক অভিযান। অপরদিকে নতুন ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রেও আরোপ করা হয় কড়াকড়ি। কোন কোন দেশে ভিসা প্রদানের হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। এ অবস্থায় হাজার হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী নিরুপায় হয়ে ব্রিটেন ত্যাগে বাধ্য হয়। বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষার্থী নির্ভর শত শত প্রতিষ্ঠান। ইউনিভার্সিটিগুলোর নানা প্রতিবাদ ও সমালোচনা সত্ত্বেও সরকার শিক্ষার্থীদের প্রতি এ আচরণ অব্যাহত রাখে। অন্যদিকে ব্রিটিশ জনগণের মধ্যে বেকারত্বের সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য ইমিগ্র্যান্টদের ওপরে ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রাধান্য দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন নিজেই প্রচারণা চালান এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেন। এ অবস্থায় কাজের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও বিদেশি নাগরিকদের জন্য চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এত কিছুর পরও সরকারের যে লক্ষ্য তার ধারে কাছেও যেতে পারেনি তারা। এর অন্যতম কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আসা ইমিগ্র্যান্টরা। এদের ক্ষেত্রে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ নেই। ইউরোজোনে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এ অঞ্চল থেকে প্রতি মাসে আরো বেশি পরিমাণে ইমিগ্র্যান্ট ব্রিটেনে প্রবেশ করছে। ফলে ২০১০ সালে যারা কনজারভেটিব সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল তারাই এখন সরকারের নীতির কড়া সমালোচনা করছে। তাদের অভিযোগ সরকার ইমিগ্র্যাশনের আসল সমস্যা সমাধানে কোন কিছুই করতে পারেনি। উল্টো অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রতা সাধনের কথা বলে বার বার নাগরিক সুযোগ সুবিধা হ্রাস করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের নাগরিকদের ব্রিটেনে প্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনে ইইউ ত্যাগের পক্ষে মত রয়েছে কনজারভেটিব সমর্থকদের। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ২০১৫ সালে বিজয়ী হলে ইইউ তে থাকা না থাকা বিষয়ে গণভোটের আয়োজন করবেন।
২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইমিগ্র্যাশন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। তিনি বলেন, এখন থেকে ইমিগ্র্যান্টরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নাগরিকদের ন্যায় সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। সরকারি বাড়ি পাওয়ার জন্য তাদের ৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বেকার ভাতা পাবেন সর্বোচ্চ ছয় মাস। ভিজিটর হিসেবে এ দেশে যারা আসবেন তাদের বিনামূল্যে আর কোন চিকিত্সা সেবা দেয়া হবে না। তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে স্বাস্থ্য বীমা করে আসতে হবে। ইমিগ্র্যান্টদের বিনামূল্যে চিকিত্সা নেয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায় সে বিষয়টিও সরকার ভাবছে বলে জানান ক্যামেরন। অনেকটা একই সময়ে কোয়ালিশন সরকারের অন্যতম শরিক লিবারেল ডেমোক্রেট দলের প্রধান এবং ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগ নীতি ভঙ্গ করে বলেছেন, যারা অবৈধভাবে ব্রিটেনে বসবাস করছেন তাদের যদি বৈধতা দেয়া হয় তাহলে তা হবে আইন ভঙ্গের কারণে তাদেরকে পুরস্কৃত করার শামিল। তিনি শিক্ষার্থী এবং ভিজিট ভিসার ক্ষেত্রে একটি বন্ড (আইনভঙ্গ করা হবে না এ শর্তে জমা রাখা অর্থ) আরোপেরও প্রস্তাব করেন।
কোয়ালিশন সরকারের প্রধান দুই নেতা অনেকটা একই সময়ে একই সুরে কথা বলার কারণে বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, ইমিগ্র্যান্টদের সরকারি সুবিধা নির্ভর জীবন যাপনের হার খুবই নগণ্য। মোট হাউজিং বেনিফিট গ্রহীতার মাত্র ৯ শতাংশ হল ইমিগ্র্যান্ট আর মোট বেকার ভাতা গ্রহণকারীর ক্ষেত্রে এ হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। তাদের মতে, সরকার ইমিগ্র্যান্টদের ভুলভাবে উপস্থাপন করে আবারো ক্ষমতায় আসার কৌশল নিয়েছে।
