একতারা খঞ্জনী মন্দিরায় মাতোয়ারা ছেঁউড়িয়া

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৩, ২২:২৪
লালন ভক্তদের নিজস্ব উত্সব ‘সাধুসঙ্গ’। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ তার জীবদ্দশায় দোল পূর্ণিমার তিথিতে ছেঁউড়িয়ায় দোল উত্সবের পাশাপাশি সাধুসঙ্গ করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় দোল উত্সবে আসা সকল সাধু বৃহস্পতিবার রাতে নিজ নিজ আস্তানায় ভক্তদের নিয়ে সাধুসঙ্গে মেতে ওঠেন। সারারাত চলে এই উত্সব। ভক্তরা সাঁইজির নিকট দিব্যজ্ঞান লাভের আশায় এই আয়োজন করেন। শুরুতে ঝাকড়া চুলের বাউল সাধুরা একতারা, দোতারা, খঞ্জনী, মন্দিরা, তবলা হাতে মহাগুরু লালন সাঁইজির উদ্দেশ্যে ভক্তি প্রদর্শন করেন। ভক্তি শেষে শুরু হয় গুরু-শীষ্যের মধ্যে গুরু বাক্য বিনিময়, যার গভীরতা হূদয়ে গ্রহণ করেন ভক্তরা। একতারা হাতে সবাই গেয়ে ওঠেন ‘ডানে বেদ, বামে কোরআন, মাঝখানে ফকিরের বয়ান, যার হবে সেই দিব্যজ্ঞান, সেহি দেখতে পায়’। গুরুর গাওয়া লালনের গানের প্রেম ও গভীরতায় মগ্ন হয় ভক্তরা। গান শেষ হতে না হতেই ভক্তরা উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠেন ‘জয় গুরু’, ‘জয় গুরু’। এরপর ভক্তরা একে একে গুরুর চরণে মাথা রেখে ভক্তি প্রদর্শন করেন। ভক্তি পর্ব শেষে গুরুসাধু গেয়ে ওঠেন ‘আছে ভবের তালা যেই ঘরে, সেই ঘরে সাঁই বাস করে’। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, কেমনে আসে যায়’। গানের ফাঁকে ফাঁকে এর কথাগুলোর মর্মবাণী সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করেন গুরু সাধু। গভীর রাতে শুরু হয় ‘সাধুসেবা’। ভক্তদের নিজহাতে তৈরিকৃত অধিবাস (রাতের খাবার) তালিকায় থাকে সাদা ভাত, মাছ, পঞ্চব্যাঞ্জন (পাঁচ রকমের সবজির সমন্বয়ে তৈরি তরকারি)। সাধুসেবার সময় গুরু-শীষ্যরা এক ভক্তিতে আসন গ্রহণ করেন। গুরু উচ্চস্বরে বলে ওঠেন ‘আল্লা আলেখ’। ভক্ত শীষ্যরাও সমস্বরে বলে ওঠে ‘আল্লা আলেখ’। শুরু হয় অধিবাস। এ পর্ব শেষে শুরু হয় মহামতি লালনের লেখা হরেক রকমের গান। প্রত্যেক সাধুই লালনের প্রতি গভীর ভক্তি নিয়ে গান পরিবেশন করেন। গুরুসাধু ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর দেন আর গানের ভাষায় বলে ওঠেন ‘কোথায় পাবো তারে— আমার মনের মানুষ যেঁ রে। সারারাত সাধুসঙ্গ শেষে গতকাল শুক্রবার ভোরে শুরু হয় সাধুগোষ্ঠ (ভোরের খাবার)। এ তালিকায় থাকে দই, দুধ, পায়েশ ও পাঁচ রকমের ফল। সাধুসঙ্গ সম্পর্কে কুষ্টিয়ার বোধোদয় সভাপতি লালন গবেষক এডভোকেট লালিম হক বলেন, বাউল সাধু সমপ্রদায় মূলত পাঁচ ঘরানায় বিভক্ত। লালন শাহ প্রথম, পাঞ্জু শাহ দ্বিতীয়, সতী মা তৃতীয়, দিলবার শাহ চতুর্থ ও চৌধুরী ঘরানা পঞ্চম। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়িতে লালন একাডেমির আয়োজনে পাঁচ দিনব্যাপী লালন স্মরণোত্সবের ৩য় দিন বৃহস্পতিবার রাতে মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে প্রধান আলোচক ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড.আবদুল হাকিম সরকার। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে এক অখণ্ড ঐক্যসূত্রের বন্ধন এনে দিয়েছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের এই বাউল গান। বাউল ফকিররা জাতের বিচার করেননি। সবার উপর মানুষ সত্য এই বাণী মেনেছেন অন্তর দিয়ে। তারা সর্বশ্রেণীর, সর্বজাতির মিলনসেতু। আজ শনিবার পাঁচদিনব্যাপী এই লালন স্মরণোত্সবের সমাপ্তি হবে।