১০টি সুসজ্জিত গরুর গাড়ি ছুটে চলেছে মহাসড়ক ধরে। মহাসড়ক ছেড়ে মাটির রাস্তায় নেমে ধুলো উড়িয়ে চললো গন্তব্যের পথে। ছইয়ে ছাওয়া গরুর গাড়ির ৫টিতে বর-বধূ। বাকিগুলোতে বরযাত্রী। তাদের পিছনে সানাই বাজাতে বাজাতে চলেছে বাদক দল। কিছুটা দূরত্বে বিশাল এক দল— যার নেতৃত্বে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. সি এস করিম এবং সংসদ সদস্য রনজিত রায়।
গ্রামের পথে গ্রামীণ জীবনের এমন ছবি প্রতিফলিত হলো গ্রামীণ জীবনযাত্রা ও কৃষিপ্রযুক্তি তথ্য এবং বীজমেলায়। শুক্রবার বিকেলে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার গাইদঘাট মাধ্যমিক হাইস্কুল মাঠে উলাসী সৃজনী সংঘের আয়োজনে এবং কৃষিপ্রযুক্তি বাস্তবায়ন কেন্দ্রের উদ্যোগে এ মেলার আয়োজন করা হয়। গতকাল বিকেলে দুদিনের এ মেলার উদ্বোধন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. সি এস করিম।
মেলায় ছিল কৃষিপ্রযুক্তি, তথ্য ও বীজের ৩৫টি স্টল। ছিল লাঠিখেলার আয়োজন। মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার কাতলী গ্রামের সামাদ সরদারের লাঠিয়াল বাহিনী লাঠিখেলায় দর্শকদের মাতিয়ে রাখে। দলনেতা সিদ্দিকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, লাঠিখেলার মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক শক্তি অর্জন হয়। লাঠিয়ালরা খেলার মাধ্যমে কৃষিকাজে উজ্জীবিত হন। কৃষকের ফসল যখন ঘরে ওঠে তখন লাঠিখেলার মধ্য দিয়ে তারা আনন্দ উপভোগ করেন। লাঠিয়াল দলের প্রধান সামাদ সরদার লাঠি খেলছেন ৪০ বছর ধরে। তিনি বলেন, প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। খেলায় লাঠি ছাড়াও রামদা, ঢাল, সড়কি নিয়ে সাজ পোশাকে সেজে দলের সদস্যরা অংশ নিয়ে থাকেন। ১৪ সদস্যের দলটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ২য় শ্রেণি পড়ুয়া মোসলেম জানায়, আব্বুর সাথে থেকে তার দেখাদেখি সে লাঠি খেলে। লাঠিখেলাকে দারুণ উপভোগ করে ৯ম শ্রেণির ছাত্র জান্নাতুল।
মেলায় দেশি মাছ ও মাছের উপকরণ প্রদর্শনীতে দেখা যায় স্টলটি নৌকা, পোলো, ঘুনি ঘড়ই, জুতি, চলক ইত্যাদি উপকরণে সাজানো। মত্স্য চাষি মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দেশি মাছ চাষে আগ্রহী করে তুলতে আমরা মেলায় আসা সাধারণ মানুষকে উত্সাহিত করছি। গুটি ইউরিয়ার ব্যবহারবিধির ওপর ভিত্তি করে সাজানো স্টলের প্রধান রিপন জানালেন, ধান ও সব রকমের ফসলে গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে দারুণ ফল পাওয়া যায়— এ বিষয়টি জানান দিতে মেলায় এসেছি। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের মহেশ্বরচান্দা থেকে আসা মর্জিনা বেগম বুলু বলেন, জৈব বালাইনাশক ও ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহারে জমির হারিয়ে যাওয়া জৈবশক্তি ফিরে আসবে, আবহাওয়া ভালো থাকবে, জীব-অণুজীব বাড়বে এবং মানুষের শরীর নিরোগ হবে।
মেলার উদ্বোধক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. সি এস করিম ইত্তেফাককে বলেন, মেলা মানেই যেন আনন্দ-স্ফূর্তি। কিন্তু গ্রামীণ এ মেলা কৃষকের সাফল্যকে সাধারণ কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার প্রয়াস। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবলমাত্র প্রচলিত কৃষির ওপর নির্ভর করেই নয়, বরং কৃষিপ্রযুক্তিকে যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে চাই। এই মেলা সফল কৃষিজীবীদের সাথে সাধারণ কৃষকের ভাবের আদান-প্রদানের কেন্দ্রে পরিণত হবে। আমাদের পুষ্টি এবং কার্বোহাইডেটের চাহিদা মেটাতে এই মেলা কৃষি বিতরণ কেন্দ্রে রূপ নেবে বলে আশাবাদী।
মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক উলাসী সুজনী সংঘের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আজিজুল হক মনি বলেন, কৃষির জ্ঞানতথ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সমপ্রসারণ করতে চাই আমরা। সেজন্য সবার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দরকার। এই মেলা কিষাণ-কিষাণীদের সেই লক্ষ্যে ধাবিত করবে।
