ভারতের অনেক স্থাপনাই তৈরি হয়েছে এ দেশের মাটি দিয়ে তৈরিকৃত ইট ও টালি দিয়ে। ভারতে ইট তৈরিতে টপ সয়েল বা ভূ-উপরিস্থ মাটি (মাটির উপরের অংশ) ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেখানে ইট তৈরি খুব একট সহজ নয়। এর ফলে সেখানকার ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে ইট নিয়ে তাদের স্থাপনা তৈরি করছে। এতে একদিকে দেশে ইট ও টালির মূল্য বাড়ছে, অন্যদিকে অধিক পরিমাণে মাটি উত্তোলনের ফলে পারিবেশ বিপর্যয়েরও আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ইতিমধ্যে ইট রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তারপরেও বিভিন্ন মাধ্যমে ইট যাচ্ছে ভারতে। তবে টালি রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ভারতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় ইট উত্পাদনের অনুমতি দেয়া হয়। যে কারণে ভারতের ব্যবসায়ীরা নিজেদের ভাটায় (কারখানা) উত্পাদনের চেয়ে বাংলাদেশ থেকে ইট নেয়ার ওপর জোর দেয়। আর অধিক লাভের আশায় বাংলাদেশের কতিপয় ব্যবসায়ীও ভারতে ইট রপ্তানিতে ঝুঁকে পড়ে। এক পর্যায়ে সরকারও ভারতে ইট রপ্তানির অনুমতি দেয়। এভাবে কয়েক বছর ধরে ভারতে ইট রপ্তানি হতো।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি অনুযায়ী রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র বিভাগীয় কার্যালয়গুলো থেকে ইট রপ্তানির অনুমতিপত্র (এসআরও সার্টিফিকেট) প্রদান করা হতো। বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী খুলনা থেকে এসআরও সার্টিফিকেট নিয়ে ভারতে ইট রপ্তানি করেছে। বিশেষ করে রাজশাহীর বাংলাবান্দা ও বুড়িমারি স্থলবন্দর থেকে ভারতে ইট রপ্তানি বেশি হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ উত্তরবঙ্গের তুলশী এন্টারপ্রাইজ, সলিমা এন্টারপ্রাইজ এবং আনোয়ার এন্টারপ্রাইজ নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান খুলনা থেকে সনদ নিয়ে ভারতে ইট রপ্তানি করেছে। কিন্তু ২০১০ সালের ১৯ আগস্ট থেকে এসআরও সার্টিফিকেট প্রদান বন্ধ রয়েছে।
খুলনার আমদানি-রপ্তানি যুগ্ম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত একটি পত্রের মাধ্যমে ভারতে ইট ও চাল রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী অফিসার মো. রবিউল হক স্বাক্ষরিত পত্রে ইট রপ্তানি নিষিদ্ধ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। এখনও এ নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র খুলনা বিভাগীয় সহকারী পরিচালক মনোরঞ্জন বিশ্বাস এবং খুলনার আমদানি-রপ্তানি যুগ্ম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের সহকারী নিয়ন্ত্রক মো. খোরশেদ আলম ইট রপ্তানি নিষিদ্ধের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে মাটির টালি রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে এসআরো সার্টিফিকেট নিয়ে কয়েক বছর ধরে বেশ কয়েকটি দেশে টালি রপ্তানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে গত বছর যুক্তরাজ্যে ৮ হাজার ৪৪০ ডলার, ইতালিতে ২৫ হাজার ৫৬২ ডলার এবং স্লোভেনিয়ায় ৩৬১ ডলার মূল্যের টালি রপ্তানি করা হয়েছে। খুলনাঞ্চলের সাতক্ষীরার কলারোয়া এবং যশোরের সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্পাদনকৃত টালি রপ্তানির তালিকায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ড. তরুণ কান্তি শিকদার এ প্রতিবেদককে বলেন, মূলত: পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তির কারণেই ইট রপ্তানি বন্ধ করা হয়েছে। এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের দেশে ভূ-উপরিস্থ মাটি (টপ সয়েল) ব্যবহার করে ইট তৈরি করা হয়। অথচ ভারতে টপ সয়েল ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভারতে ইট তৈরির পরিমাণও কম। যে কারণে বাংলাদেশ থেকে তারা ইট নিতে বেশি আগ্রহী। রপ্তানির নেতিবাচক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে আবার রপ্তানি করার জন্য ইট উত্পাদনে অধিকহারে টপ সয়েল ব্যবহার হচ্ছে। এতে দেশের কৃষির উত্পাদন কমে যাচ্ছে। যত্রতত্র গড়ে উঠছে ইট ভাটা। ফলে জমিও নিচু হয়ে যাচ্ছে। এতে এক পর্যায়ে পরিবেশ বিপর্যয়েরও আশংকা তৈরি হয়। যে কারণে আপত্তি দিয়ে ইট রপ্তানি বন্ধ করা হয়। তবে টালি তৈরিতে সামান্য পরিমাণে মাটি ব্যবহার হওয়ায় তা খুব একটা ক্ষতিকর নয় উল্লেখ করে তিনি এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেনননি।
এ ব্যাপারে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান ইট রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, দেশেই ইটের চাহিদা ব্যাপকহারে বেড়েছে। তার যোগান দিতেই ব্যবসায়ীরা হিমশিম খাচ্ছে। আর ২ হাজার টাকা মূল্যের প্রতি হাজার ইটের দাম যেখানে প্রায় ৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে, সেখানে রপ্তানির কোন সুযোগ নেই। একইভাবে টালি রপ্তানির সাথে দেশের লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
