রণদা প্রসাদ সাহা স্মারকগ্রন্থ প্রকাশনা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালে রণদা প্রসাদ জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করতে গিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকার-আলবদর যারা তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যেন যথাযথভাবে হয়—সেই দাবি জানান বক্তারা। বক্তারা দাবি করেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাদের গুম করেছিল, তাদের পরিণতি কী হয়েছে—তা প্রকাশ করুক। বাংলাদেশের স্বজন হারানো মানুষের অধিকার রয়েছে তাদের স্বজনদের জীবনের শেষ পরিণতি কিভাবে হয়েছিল তা জানার।
বক্তারা বলেন, একজন মানুষের দীপ্তি, তার বৈভব, জ্ঞান, প্রজ্ঞা সবকিছু নিয়ে একজন সম্পূর্ণ মানুষ ছিলেন রণদা প্রসাদ সাহা। জীবনকে উপলব্ধির জ্ঞান দিয়ে কর্ম পরিচালনা করেছেন। স্মারক গ্রন্থটি প্রকাশ করে জাতি কোন দায় মেটালো না তাকে স্মরণ করলো মাত্র।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ৭ মে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহাকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এরপর তাঁদের আর কোন খোঁজ মেলেনি।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হলো গতকাল শনিবার। শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ উপলক্ষে কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল (বিডি) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। প্রফেসর ইমিরেটাস আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. করুণাময় গোস্বামী, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী। সম্পাদনা পরিষদের পক্ষে স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্মারকগ্রন্থের অন্যতম সম্পাদক মফিদুল হক। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ট্রাস্টের পরিচালক অধ্যক্ষা প্রতিভা মুত্সুদ্দি।
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি দেখে অনেক বিদেশির মাথা ঘুরে যায়। হরতাল হচ্ছে, মন্দির ভাঙা হচ্ছে—তারপরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কীভাবে। বাংলাদেশের গতি-প্রকৃতির এ স্ববিরোধিতা বুঝতে হলে রণদা প্রসাদ সাহাকে বোঝা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যে মানুষটি ব্যবসা করে অর্থ উপার্জন করে তা মানুষের জন্য নিবেদন করেছিলেন। তিনি নিজে হিন্দু সম্প্রদায়ের হলেও দেশভাগের পর ভারতে চলে যাননি। আমরা গর্ববোধ করি এ মানুষটি আমাদের এই বাংলাদেশের মানুষ।
অধ্যাপক করুণাময় গোস্বামী বলেন, রণদা প্রসাদ সাহা যে চেতনা ও আদর্শ লালন করতেন তা তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর সেই আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবে। তাঁর শরীরী মৃত্যু হলেও তিনি হূদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল। তিনি আরো বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাদের কাদের গুম করেছিল তাদের পরিণতি কী হয়েছে তা প্রকাশ করুক।
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, রণদা প্রসাদ সাহা জীবন দিয়ে অর্জন করেছেন মানবিক বোধের বিকাশ, মৃত্যু দিয়ে দেশের ইতিহাসের সঙ্গী হয়েছেন। তিনি অপার দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ থেকে মাতৃভূমিকে ঘিরে মানবিক প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিলেন।
শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, রণদা প্রসাদ সাহার কথা মনে হলেই যুদ্ধাপরাধীদের নৃশংস বর্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। মফিদুল হক বলেন, রণদা প্রসাদ সাহা ছিলেন সর্বকল্যাণে উত্সর্গিত প্রাণ। এ স্মারকগ্রন্থ জাতির পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির প্রতি নিবেদন। এটা কোন দায় মেটানো নয়। তাঁকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে জাতির হূদয়ে যুগে যুগে প্রেরণা সঞ্চারিত হবে। আলোচনা পর্ব শেষে ভারতেশ্বরী হোমসের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়। ৭৫ জন লেখকের লেখা এই স্মারকগ্রন্থে স্থান পেয়েছে।
