অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে একটি খসড়া প্রতিবেদন দেয়া হবে। এছাড়া আগামী অর্থবছরের (২০১৩-২০১৪) বাজেটে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হবে। গতকাল শনিবার সচিবালয়ে দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদকদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে পদ্মা সেতুর জন্য ১ হাজার ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সাক্ষীর অভাবে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সভায় সাংবাদিক প্রতিনিধিরা আগামী বাজেটে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নের চিত্র, পদ্মা সেতু নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে, মেট্রোরেল, শেয়ারবাজার ও হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনির অনিয়ম ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের অবস্থান এবং দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান।
অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী বাজেটে পদ্মা সেতু, রেলওয়ে খাত, রেলপথে ট্রানজিট, বন্দর উন্নয়ন, জেলা বাজেট ইত্যদি বিষয় গুরুত্ব পাবে। এর বাইরে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়, দারিদ্র্য ও অসাম্য, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি, ডিজিটাল বাংলাদেশ সংক্রান্ত পৃথক পৃথক পুস্তিকা বাজেটে প্রকাশ করা হবে।
পদ্মা সেতু :পদ্মাসেতু প্রকল্পে চীনের প্রস্তাবের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, চীনের প্রস্তাবটি সরকার দেয়নি। দিয়েছে একটি বেসরকারি সংস্থা। এ বিষয়ে সরকার জানেও না। তবে তাদের সঙ্গে সরকারি ব্যাংক রয়েছে। কিন্তু শুধু সরকারি ব্যাংক থাকলেই আমরা প্রস্তাব আমলে নেবো না। তিনি বলেন, আমি যখন চীনে গিয়েছি তখন ওখানকার অর্থমন্ত্রী এবং এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছি। কিন্তু পরে তারা পদ্মা সেতুর ব্যাপারে কোন আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর অর্থায়ন কীভাবে হবে এবং কীভাবে তা নির্মিত হবে এ বিষয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেয়া হবে।
বাজেটে বিদ্যুত্ খাত সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হবে। বর্তমান সরকারের আমলে মোট কতগুলো বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে, কতগুলো স্থাপিত হয়েছে, কতগুলো উত্পাদন শুরু করেছে, বাকিগুলো কবে উত্পাদনে যাবে এবং মোট উত্পাদন ক্ষমতা কত সব সেখানে থাকবে। ২০১৭ সাল নাগাদ দেশে বিদ্যুতের কোনো সমস্যা থাকবে না।
গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গ :গ্রামীণ ব্যাংক প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংককে টেকসই হতে দেননি। ২০১০ সালেই আমি তাকে চলে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু উনি রাজি হননি। তিনি এখনো মনে করেন যে, তিনি চলে গেলে গ্রামীণ ব্যাংক ধসে পড়বে। কিন্তু আমি এটা প্রমাণ করে দিয়েছি, উনি ছাড়াও এটা ভালোভাবে চলে। যদিও আমরা এখনো এমডি নিয়োগ করতে পারিনি। ‘গ্রামীণের সিস্টেম সুন্দর’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের সব সিস্টেমই ভালো। ব্রাঞ্চে সব কাজ হয়। ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে কোন ঝামেলা নেই। তিনি বলেন, গ্রামীণফোন ও গ্রামীণ টেলিকম ড. ইউনূসের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তিনি গ্রামীণ ব্যাংক থেকেও টাকা নিয়েছেন। এসব ব্যাপার কমিশনের রিপোর্ট পেলেই জানা যাবে।
হলমার্ক ও ডেসটিনি প্রসঙ্গ :অর্থমন্ত্রী বলেন, হলমার্কের প্রতি কোনো মহানুভবতা দেখানো হয়নি। হলমার্কের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে যে, তাদের কারখানাসমূহ বন্ধ থাকায় ৪০ হাজার পরিবার বেকার হয়ে পড়েছে এবং ৫ হাজার ৬শ’ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে হলমার্কের কারখানাগুলো সচল রেখে অর্থ আদায়ের জন্য আমি সোনালী ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছি। প্রয়োজনে এর জন্য প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি চিন্তা করতে বলেছি। যদিও এটা সম্ভব হবে কি না- জানি না। তাই এখানে মহানুভবতার কোন বিষয় আসেনি।
হলমার্ক অনেক বড় জালিয়াতি, অনেক অর্থ খোয়া গেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, কিন্তু এদের সম্পদের হিসাবও তো করা দরকার। একটি বড় বিনিয়োগ যদি চালু থাকে তাহলে সেখান থেকে আয় হবেই। সুতরাং আমার মতে, বড় কোনো বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া ভালো কোনো বিজনেস প্র্যাকটিস নয়।
সোনালী ব্যাংকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর হলমার্কের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি। আর্থিক খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি কমিশন গঠন করা হবে কি না, জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ সরকারের আমলে এটা হচ্ছে না। এটি আগামী সরকারের জন্য রেখে দিলাম। তবে আমার ধারণা, আগামীবার আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করবে।
তিনি বলেন, আর্থিক অপরাধের বিচার করা খুবই কঠিন। বাংলাদেশে এবারই প্রথম এ ধরনের বিচার হচ্ছে। তারপরও যতটুকু হচ্ছে, সেটা একেবারে খারাপ নয়। ব্যাংকের জেনারেল পর্যায়ে বিচারে আছে। কিন্তু এরও উপরের পর্যায়ে যাওয়া উচিত। বিশেষত এ ঘটনায় শুধু হলমার্ক নয়, একই সঙ্গে তাদের যারা ফেভার করেছেন সেইসব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমি দুদক-কে বলেছিলাম।
ডেসটিনি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ডেসটিনি একটা মারাত্মক সমস্যা। তবে এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভালো জানে। বাংলাদেশ ব্যাংকও কিছু জানে। তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
শেয়ারবাজার :সাক্ষীর অভাবে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দেয়া যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ তার তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ সাক্ষী নেই। সাক্ষী নেই বলেই তিনি এ বিষয়ে শুধু অনুমান করেছেন। তারপরও সরকার এবং সরকারের বাইরে এ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে যে চারজনের কথা বলা হয়েছে, তাদের বিষয়ে আমাকে সাক্ষী পেতে হবে তো। সাক্ষী না পেলে আমি কীভাবে এগুবো।
হরতাল :হরতালের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রধান বিরোধী দল হরতাল দেয়ার কারণে অর্থনীতি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিরোধী দলের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, হরতাল দিয়ে অর্থনীতি অচল করে দেয়া। আমরা এটা দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করবো। এখন হরতাল দেয়া রাষ্ট্রবিরোধী কাজ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন যা হচ্ছে তা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ। আমি এজন্য ব্যবস্থা নেবো। উচিত ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে আলোচনা করা। কিন্তু তা না করে তারা হরতাল দিচ্ছে। যে সপ্তাহে তারা হরতাল দেবে সে সপ্তাহের শুক্র, শনিবার ব্যাংক এবং ইন্স্যুরেন্স খোলা থাকবে। বিশেষ করে বন্দরগুলোতে সবকিছু চালু থাকবে। আমরা যেহেতু আমদানি নির্ভর দেশ তাই এর যাতে কোন ক্ষতি না হয় সে ব্যবস্থা নেবো। আইন করে হরতাল বন্ধ করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইন করে হরতাল বন্ধে হাত দেবো না।
হরতালে শিল্প পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বলেন, শিল্প পুলিশের কিছু সমস্যা রয়েছে। শিল্প পুলিশ নেয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের নিজস্ব ধারায় সবকিছু করে এটি একটি সমস্যা। তবে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আগামী বাজেট :আগামী বাজেটে পদ্মা সেতু, রেলওয়ে খাত, রেলপথে ট্রানজিট, বন্দর উন্নয়ন, একটি জেলায় (টাঙ্গাইল) জেলা বাজেট প্রদান ইত্যদি বিষয় গুরুত্ব পাবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামো সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ও জেন্ডার বাজেট সম্প্রসারণ করা হবে। গত বছর ২৫টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বাজেট দেয়া হয়েছে। এবার ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বাজেট দেয়া হবে। এর বাইরে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়, দারিদ্র্য ও অসাম্যতা, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি, ডিজিটাল বাংলাদেশ সংক্রান্ত পৃথক পৃথক পুস্তিকা বাজেটে প্রকাশ করা হবে।
বাজেট বাস্তবায়ন বেড়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হার বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার বেড়েছে। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নের বিষয়টি আগামী বাজেটে তুলে ধরা হবে।
আগামী বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকবে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এটা নিয়ে তো আমি জেনারেল একটা রুল (নিয়ম) করে দিয়েছি। আমি বলেছি, ১০ শতাংশ পরিশোধ করে কালো টাকা সাদা করতে হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে এবং মেট্রোরেল প্রসঙ্গ : ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে বাস্তবায়ন না হওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ঢাকা-চিটাগং হাইওয়ের জন্য এডিপি এবং সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ভূমি একটি প্রধান সমস্যা। প্রকল্প এলাকায় মসজিদ, কবরস্থান থাকা এবং মাটি কাটার বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমতিও পাওয়া যাচ্ছে না। আমি অনেক তদবির করেছি। তারপরও কিছু হয়নি।
মেট্রোরেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বছরই এর কাজ শুরু হবে। তবে পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হবে না। কারণ যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এতে সম্পূর্ণ কাজ শেষ হবে না।
