অফিস শেষে স্বামী, শশুর, শাশুড়ীর সেবা-শুশ্রূষা করে নিজ সন্তানের সব চাহিদা পূরণ করে, তাদের ভাল রাখতে গিয়ে কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি যে নিজে কেমন আছি? নিজ জীবনে ভাল থাকার জন্য সেখানে কি কোন সময় আছে? অফিস থেকে ক্লান্ত মনে ফিরে বাড়ির কোন কিছুতেই যেন আর মন লাগে না। কারণ জানা নেই, তবুও যেন এক অজানা ব্যাথা। ক্লান্ত মন ও দেহ নিয়ে দাওয়াতে গেলেও যেন সেই মন ভাল হয় না। খুব কাছের আত্মীয়ের সাথে দেখা হলেও মুখে লেগে থাকে এক নকল হাসি, যার মধ্যে কোন সত্যতা নেই, নেই কোন প্রাণের ছোঁয়া। এ ঘটনাগুলো প্রতিটি নারীর জীবনে খুবই চেনা।
একজন নারীর মন যদি ভাল থাকে, সেখানে যদি লেগে থাকে সুখের ছোঁয়া তবে তাই এনে দিবে সুখের সংসার, সুখের কর্মক্ষেত্র। সেসময় কর্মজীবন, সংসার জীবনের কাজের বোঝাকে চাপ বলে আর মনে হবে না। সব কাজের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে আনন্দ। তাই দশজনের জীবন আনন্দময় করার জন্য তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের জীবনকেও আনন্দময় করে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
একজন নারীর মা, মেয়ে, বউ ও অফিসকর্মীর গুরু দায়িত্ব পালন, একসাথে সব কাজ সামলানো সহজ কথা নয়। এসময় মেজাজ খারাপ হওয়া, কারণ ছাড়া রেগে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। একসাথে সব কাজ সামলাতে হলে সবার আগে নিজের মন ও শরীর ভালো রাখতে হবে। সেজন্য প্রতিদিন সকাল শুরু করতে হবে সুন্দরভাবে। ঘুম থেকে উঠেই সারাদিনের রাজ্যের কাজের কথা মনে করে মুখ কালো করে ফেললে চলবে না। সেসময় সব কাজ ভুলে অন্তত পনেরো মিনিট সময় হলেও নিজের জন্য রাখতে হবে। তখন বারান্দায় হাঁটলে, একটু বাইরের মুক্ত আকাশকে উপলব্ধি করলেও মন শান্ত হবে। ইচ্ছা সেসময় যোগব্যায়ামও করা যেতে পারে যা শরীরে পজিটিভ শক্তির যোগান দিবে। রোজ ব্যায়াম করলে বা ভোরে উঠে হাঁটলে শরীর থাকবে সুস্থ যা মনকেও ফুরফুরে রাখবে।
অফিসে যাবার পথে ভিড়, কাজে ভুলের জন্য বসের বকা, পারিবারিক কলহের জের ধরে সাংসারিক অশান্তি - সব প্রতিকূল পরিবেশেও মন ভাল রাখতে অন্যতম সহায়ক সংগীত। খুব অল্প সময়ে মনের সব দুঃখ-ব্যথা দূর করতে সংগীতের কোন বিকল্প নেই। দিনের শুরু যদি হয় আনন্দের সংগীত দিয়ে তবে সারাদিন যাবে আনন্দে। অফিসে যাবার পথে বাসে বসে বসে সংগীত শুনতে থাকলে রাস্তায় যাওয়া-আসার সময় প্রচণ্ড ভিড়েও মাথা থাকবে ঠাণ্ডা।
একসাথে অনেক কাজ সামলানোর অন্যতম শর্ত নিজের উপর আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীদের মনে নেতিবাচক চিন্তাই বেশি ভিড় করে। তাই ‘আমি পারব না, একসাথে এত কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেন আমার এই ভুল হল?’ এসব চিন্তা বাদ দিয়ে, নিজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্জনগুলোর কথা বেশি ভাবতে হবে। কর্মক্ষেত্রে কোন প্রকল্প সম্পন্ন হলে সে উপলক্ষে বাড়িতেও বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা যেতে পারে, যা সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিবে। বারবার নিজেকে নিজের প্রাপ্তির কথাগুলো বলতে হবে এবং অপ্রাপ্তির জায়গাগুলো ভুলে যেতে হবে। এই ক্ষুদ্র প্রাপ্তিগুলোর মধ্যেই সুখ খুঁজে নিতে হবে।
অফিসে যাবার আগে কোন কারণে হঠাত্ রেগে উঠলে নিজে একটু সুন্দর শাড়ি পরে ভালোভাবে সাজগোজ করে যাওয়া যেতে পারে যা মনকে উত্ফুল্ল রাখবে। রোজ না হলেও সপ্তাহে একদিন বাগানও করা যেতে পারে। নিজ বাগানে ফুল ফোটানর আনন্দে দূর হয়ে যায় মনের চাপা কষ্ট। সন্তানকে কাজের ব্যস্ততায় যথেষ্ট সময় দেয়া না গেলে, সব হোমওয়ার্ক করিয়ে দিতে না পারলে আত্মগ্লানিতে ভোগার কিছু নেই। অল্পসময়ে পড়া দেখিয়ে, অবসরে গল্প বলে তাকে একই পরিমাণ মমতা দেয়া সম্ভব।
অফিসে একসাথে অনেক এ্যাসাইনমেন্ট জড় হলে নিজ সাধ্যির বাইরে লক্ষ্য স্থির করা উচিত নয়। যেটুকু কাজ সম্ভব সেটুকুই লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করতে হবে। অল্প কাজ করলেও ভালভাবে করেই মনে মনে সন্তুষ্ট হতে হবে। একসাথে সব এ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে সব আধাআধি করলে মনও খারাপ হবে, কাজেও খারাপ প্রভাব পড়বে।
সন্তানের পড়াশোনার সাহায্য, শ্বশুর-শাশুড়ীকে সব কাজে সাহায্য, স্বামীর লাঞ্চপ্যাক তৈরি করা ও ভাই-বোনের জীবন আরো সুন্দর করতে গিয়ে এসব চাপে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ছোটবেলার বন্ধুরা। নিজের মনকে ভাল করতে মাসে একবার হলেও ছোটবেলার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করে পুরনো স্মৃতি রোমন্থনের লক্ষ্যে দেখার ব্যবস্থা করতে হবে। নিজ জীবনে বন্ধুদের সাথে কাটানো সেই এক ঘন্টা পরের মাসে হাসতে হাসতে কাটানোর শক্তির জোগান দিবে। এসব পন্থাই প্রতিটি নারীর সংসার ও চাকরিজীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে নিজের মনকে উত্ফুল্ল করতে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
