সৃষ্টির রহস্যের ধূম্রজালে আবদ্ধ হয়ে কেবলমাত্র দুই চাকার চেয়ারের ভেতর জীবনটাকে থামিয়ে না রেখে বিশ্বের ইতিহাসে ইতিহাস হয়ে জীবনটাকে যে আরো মধুময় করে তোলা যায় এমনই বাস্তবসম্মত ও সর্বজনস্বীকৃত কিছু নারী স্থান করে নিয়েছেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ দৈনিক দ্যা গার্ডিয়ান। কেলি হোলমস, এলিন কলিন্স, ক্যাথে ফ্রিম্যান, তান্নি গ্রে-থম্পসনসহ আরো অনেকেই আছেন এই তালিকায়। লিখেছেন— মরিয়ম চম্পা
এলিন কলিন্স
এলিন কলিন্স’ই হচ্ছেন মার্কিন মহাকাশযানের প্রথম নারী পাইলট ও কমান্ডার যিনি ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে শাটল মিশন এসটিএস-৯৩ পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে চাঁদে এক্স-রে পর্যবেক্ষণ যন্ত্র স্থাপন করা হয়। নভোচারী কলিন্স’র জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৯ নভেম্বর নিউইয়র্ক শহরে। কলিন্স তার এ কাজের জন্য এ যাবত্ বিভিন্ন পদকে ভূষিত হয়েছেন। মহাকাশ অভিযানের সময় তার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে- তিনি ৩৮ দিন ৮ ঘণ্টা ১০ মিনিট মহাকাশযানে আটকে ছিলেন। কলিন্স পরিচালিত এসটিএস-১১৪ নাসার ফ্লাইট ফিরে আসার পরবর্তী মিশনের নিরাপত্তার ব্যবস্থার উন্নতি ও ইন্টারন্যাশনাল স্পেস (আইএসএস) ’র পুনঃবণ্টন ব্যবস্থা করা হয়। কলিন্স এসটিএস-১১৪-এর প্রথম নভোচারী যিনি একটি সম্পূর্ণ রণকৌশলের মাধ্যমে ৩৬০ ডিগ্রী স্পেস শাটলে উড়েন। এই পদ্ধতিতে একজন নভোচারী খুব সহজেই আইএসএস জাহাজের বাইরে বসেই মহাকাশচারী শাটলের বহির্ভাগের ছবি তোলা থেকে শুরু করে যে কোন প্রকার ধ্বংসাবশেষ এবং শাটলের উপর হুমকি সংক্রান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। কলিন্সের কর্মজীবন সমগ্র নারী জাতির জন্য দানবীয় লক্ষবস্তুর শামিল।
ক্যাথে ফ্রিম্যান
৪০ বছর বয়সী ক্যাথে ফ্রিম্যান একজন প্রক্তন অস্ট্রেলীয় দৌড়বিদ যিনি ৪০০ মিটারের আলোচিত দৌড় বিশেষজ্ঞ। ১৯৯০ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি সর্বপ্রথম আদিবাসী কমনওয়েলথ গেমসে এ পদক পান। এরপর থেকে ফ্রিম্যানকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি ১৯৯৭ সালে ৪০০ মিটার ইভেন্টের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। ফ্রিম্যান জন্মগ্রহণ করেন স্লাড পয়েন্টে, ম্যাকে কুইন্সল্যান্ড যেখানে স্থানীয়ভাবে একটি শরীরচর্চার ক্লাব ছিল যা, পরে তার নামানুসারে নামকরণ করা হয়। তার ক্রীড়াবিদ জীবনের শিক্ষাগুরু ছিলেন পিটার ফরচুন। ১৯৯৯ সালে ফ্রিম্যান স্যান্ডি বোডেকারের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেও তা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ৩৮ বছর বয়সে তিনি সর্বপ্রথম আদিবাসী ক্রীড়াবিদ হিসেবে অলিম্পিক পদক জয়ের মাধ্যমে বিশ্বরেকর্ড করেন। ফ্রিম্যানের বিজয় ধ্বনির চলমান নগ্নপদ সিডনিতে ২০০০ সালের রেকর্ড তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। ফ্রিম্যান বলেন, একজন আদিবাসী নারী হিসেবে সর্বদা সকলের কাছে অবহেলা এবং সমালোচনার পাত্রী হলেও আমি আমার সুস্থ দুটি পায়ের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে আজ সকলের হূদয়ে স্থান করে নিয়েছি।
তান্নি গ্রে-থম্পসন
১৯৬৭ সালের ২৬ জুলাই কার্ডিফ ওয়েলশএ জন্মগ্রহণ করা তান্নি গ্রে- থম্পসন একজন সাবেক হুইলচেয়ারের ক্রীড়াবিদ প্রতিযোগী। বর্তমানে তিনি সংসদের একজন বিচক্ষণ বক্তা ও টেলিভিশন উপস্থাপক। গ্রে- থম্পসন স্পাইনা বিফিডায় আক্রান্ত হয়ে দুটি পা’ই না থাকায় জন্মের পর থেকেই স্থায়ীভাবে হুইলচেয়ার নির্ভর জীবন যাপন শুরু করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের সবচাইতে সফল প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। গ্রে-থম্পসন ১৯৯১ সালে লাফার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি এবং সামাজিক প্রশাসনের উপর স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। ২০০১ সালে তার প্রকাশিত আত্মজীবনী হোডার এবং স্টগটন কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। গ্রে-থম্পসন হচ্ছেন ব্রিটেনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্যারালিম্পিয়ান, যিনি প্যারালিম্পিক খেলার পুরো ধারণাটাই পাল্টে দেন তার সাহসী ও সৌখিন মনোবৃত্তির মাধ্যমে অভিজাতক ক্রীড়াবিদদের অভিভূত করে। হূদরোগে আক্রান্ত গ্রে-থম্পসন সাত বছর বয়স থেকে হুইলচেয়ার রেসে অংশ নিয়ে এ যাবত্ তিনি চারটি স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন পদকে ভূষিত হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তিনি বলেন, আমি পেরেছি, আমি পেরেছি তা প্রমাণ করতে যে আমরা প্রতিবন্ধীরা অক্ষম নই।
