অডিও বাজারের ইমেজ যখন তলানিতে ঠেকেছে, তখন অধিকাংশ তারকাশিল্পী আর কম্পোজার তাদের ক্যারিয়ার গুটিয়ে চলচ্চিত্রের গানে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করেছেন। এ দেশের আধুনিক গানের সর্বশেষ সুপারস্টার আসিফ আকবর প্লে-ব্যাকে শিল্পীদের সম্মানী বাড়ানোর ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছিলেন প্রথম। পরবর্তীতে আসিফের প্রস্তাবনা আর প্রতিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে যখন প্যাকেজ প্লে-ব্যাক শুরু হয়, তখন তিনি অভিমান করে দূরে সরে আসেন। কিন্তু আসিফের সেই প্রতিবাদে কাজ হয়েছিল বলেই এন্ড্রু কিশোর, রুনা লায়লাসহ এ দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা প্লে-ব্যাকে তাদের নির্দিষ্ট অংকের পেমেন্ট থেকে অনেকটা বাড়িয়ে নিতে পেরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে আসিফ একাধিক ইন্টারভিউতে বলেন, ‘সে সময় কবির বকুল-শওকত আলী ইমন-আলী ইকরাম শুভসহ একটি বিশেষ সিন্ডিকেট করে প্যাকেজ বাজেটে চলচ্চিত্রের গানের কাজ শুরু করা হয়। বাজারটা নষ্ট হতে শুরু করে তখনই। ফলে শিল্পীরা তাদের প্রাপ্য সম্মানী থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হয়। পুরো প্লে-ব্যাক শিল্পের যে ঐতিহ্য তখন থেকেই নষ্ট হওয়া শুরু করে।’
এরপর সেই ধারাবাহিকতা চলতে চলতে প্লে-ব্যাকের সেই আদি অকৃত্রিম রীতি ভেঙে হাতে গোনা ক’জন চলচ্চিত্রকার বাইরের কয়েকজন মিউজিক ডিরেক্টরকে দিয়ে কাজ শুরু করে। অনিয়মের চূড়ান্ত হয় এখানেই। হাবিব তার আকাশচুম্বী বাজেট নিয়ে চলচ্চিত্রের গানের কাজ শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শওকত আলী ইমন, আলী একরাম শুভ, ইমন সাহাসহ যারা নিয়মিত প্লে-ব্যাক অন্তপ্রাণ মিউজিক ডিরেক্টর তাদের পেশাগত জায়গা ও ইমেজের জায়গা দুটিতেই আঘাত হানে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্লে-ব্যাকের দীর্ঘদিনের মূল্যবোধ! হাবিব ওয়াহিদ এ দেশের অডিও মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিকে যেমন বিভিন্ন অ্যাডভোকেসি যোগ করে প্রকাশক-শিল্পীদের ভেতরে এক ধরনের বৈরীতা প্রচলন করেছে, ঠিক তেমনি দেশীয় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও এক ধরনের রীতি নষ্ট করার জন্য বিশেষভাবে দায়ি তিনি। এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ হাবিব তার ‘তুমি আমার সন্ধ্যার মেঘমালা’ ছবির গানে গীতিকারদের এককালীন টাকা দিয়ে গানের পুরো স্বত্ব তিনি নিজের নামে করে নিয়েছেন। আর এই প্রক্রিয়ায় আবারও সেই একই গীতিকারেরা প্রতিবাদ না জানিয়ে নিজেদের মেধাস্বত্বকে টাকার পরিমাপে বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে এখন প্লে-ব্যাকে দুই ধরনের সংগীত বর্তমান। একটা প্রচলিত ধারা। আরেকটি এককালীন ধারা। আর হাবিবের বরাবরের নকলকারী আরফিন রুমীও যখন প্লে-ব্যাকে কাজ করতে শুরু করেন, ঠিক তখন শোনা যায় অধিকাংশ প্রযোজক-পরিচালকের টেনশনে মাথাব্যথা ধরার জোগাড়। কারণ চড়া মূল্যে ১ লক্ষ টাকা প্রতি গানে পারিশ্রমিক নিলেও কমিটমেন্ট রক্ষার কোনা বালাই থাকে না তাদের। গানের কাজ আর টাকা দিয়ে টেনশনে নিজেদের চুল ছিড়তে থাকেন ছবির পরিচালক-প্রযোজকেরা। ফলে নবাগত ভুঁইফোড় এই সংগীত পরিচালকেরা যে এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য সহায়ক না। তারা যে শুধুই নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করেই কাজ করেন, তাই প্রমাণিত হয় বারবার। আর এই বিরক্তি আর আকাশচুম্বী পারিশ্রমিক থেকে বাঁচতেই অনেকে তার চেয়েও কম মূল্যে ভারতীয় শিল্পীদের গান করে নিয়ে আসার পরিকল্পনা নেয় অনেকেই। এ প্রসঙ্গে তরুণ চিত্র পরিচালক নইম ইমতিয়াজ নিয়ামুল বলেন, ‘আমি এ দেশের তরুণ সংগীত পরিচালকের পক্ষে থাকতাম। তাদের দিয়েই আমি আমার চলচ্চিত্রের কাজ করাতাম। কিন্তু তারা কিছু না হওয়ার আগেই ইন্ডাস্ট্রিতে ১টি কালোত্তীর্ণ গান না দিতেই যে ভাব ও অহঙ্কার দেখান তাতে বিরক্ত হয়ে আমরা পাশের দেশে যেতে বাধ্য হই। অনর্থক অযাচিত পারিশ্রমিক তারা দাবি করেন। এ ছাড়া আগে শিল্পী-গীতিকার-সুরকারদের ক্ষেত্রে প্লে-ব্যাকে এক ধরনের গ্রেডেশন ছিল। তাদের একটি পারিবারিক বন্ধন ছিল। সবকিছুর বাজেট নির্ধারিত ছিল কিন্তু নিত্য নতুন শিল্পীরা যে যার মতো পারিশ্রমিক দাবি করে বসছেন। তাই প্লে-ব্যাকের এই সুন্দর স্বচ্ছতা নষ্ট করার জন্য গুটি কয়েক প্যাকেজ ব্রোকার কাম গীতিকাররাই দায়ী। ফলে তাদের কাছ থেকে বারবার বিরক্ত হয়ে তারা চলে গেছেন দেশের বাইরে। এ প্রসঙ্গে পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, ‘আমাদের ভেতরে সম্মিলিতভাবে একটা নীতিমালা তৈরি করা দরকার। সব সময় শুনেছি, তরুণরা পুরোনোদের ভুল রীতিকে শুধরে নতুন পথ দেখায়। কিন্তু ওরা তো উল্টো সবকিছুতেই তালগোল পাকিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টা খুবই লজ্জার এবং আমাকে খুবই আহত করে। আর একটা বিষয়ে আমার খুব বড় আপত্তি রয়েছে। তা হলো এখন ছবিতে দেখি শিল্পীদের চেয়ে কম্পোজারদের সংখ্যা বেশি। বিশ্বের কোন দেশে একটি ছবিতে একাধিক কম্পোজার আছে—আমার জানতে হবে। পুরো ছবির মুড যদি একরকম না থাকে তাহলে কোন অর্থে এই জগাখিচুড়ি বানানো হচ্ছে। এটাও কি ডিজিটাল জগাখিচুড়ি?’
চাষী নজরুল ইসলামের এই আপত্তির যুক্তি থাকলেও এখন অধিকাংশ তরুণ প্রযোজক-পরিচালক একাধিক কম্পোজারকে নিয়ে জড়াখিচুড়ি তৈরির আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত রয়েছেন। আদতে কারোরই গান বেরিয়ে আসছে না সাফল্যের রাস্তায়। বরং একটি ছবিতে অনেককে খুশি করার একটি নতুন প্রজেক্ট বলা যেতে পারে একে।
এদিকে চলচ্চিত্র হোক আর না হোক, ছবির গান হতে হবে। কিন্তু এত এত গান হলেও চলচ্চিত্রের গান দর্শক বা শ্রোতাদের ভেতর ভালো লাগা জন্মাচ্ছে না। কারণ প্রথমত অনেক চলচ্চিত্রের গানের অডিও বের হলেও তার ভিডিও বের হয় আরও কয়েকমাস বা ক’বছর পরে। কোনো কোনোটির বেরই হয় না। ধরা যাক সোহেল আরমানের ‘এইতো প্রেম’-এর অডিও অ্যালবাম বের হয়েছে ক’বছর আগে। প্রিয় পাঠক আপনারও নিশ্চয়ই সেটা মনে নেই। অথচ আজ অবধি সেই গানের ভিডিও দেখেনি দর্শকেরা। দর্শকেরাও ভুলতে বসেছেন যে, আদৌ সেটি কোনো সিনেমার গান ছিল কি না? এ ছাড়াও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছবির অডিও রিলিজ হওয়ার পর গান মোটামুটি দরের হিট হলেই তার রিং টোন বা ওয়েলকাম টিউনে কিছু অর্থ পাওয়া গেলে পরিচালক নিজেই ভুলে যান ছবিটির চিত্রায়ণ প্রয়োজন আছে কী না। কারণ গান থেকেই যখন লাভের অংশ এসে গেছে। তখন খামাখা চিত্রায়ণের খরচ করে কী হবে? আর করলেও আস্তে ধীরে করা যাবে। শাহীন কবির টুটুলসহ ভুঁইফোড় অর্বাচীন কিছু পরিচালকের কারণে তাই তরুণ চলচ্চিত্রকারদের এই ইমেজের জায়গাটাও নষ্ট হতে চলেছে। এতসব অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা এসেছে এই তরুণ চিত্র পরিচালকের হাত ধরেই। যারা আসলে মুখে বলছে ‘এক্সপেরিমেন্ট’ কিন্তু তাদের সেই খামখেয়ালি ঝড়ে ইন্ডাস্ট্রির দশাও এখন অভিজ্ঞ ডাক্তার থেকে ইন্টার্নি ডাক্তারে অধঃপতিত হয়েছে। প্লে-ব্যাকের ঘড়ি যেন বারোটায় আটকে আছে। এ ক্ষেত্রেও কিছু কিছু মিডিয়ারও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তারাও ইন্ডাস্ট্রির কথা চিন্তা না করে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য যে যার মতো করে সাপোর্ট দিয়ে অবস্থা আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
(চলচ্চিত্রের গান নিয়ে আরো একটি লেখা প্রকাশ হবে আগামীদিন)
বি.দ্র. ঢালিউড কড়চা নিয়ে এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন নিয়ে কারও কোনো ধরনের আপত্তি বা কোনো বক্তব্য থাকলে যৌক্তিকভাবে লিখিত পাঠাতে পারেন আমাদের ঠিকানায়। আমরা অবশ্যই আমাদের নিজস্ব বক্তব্যসহ আপনার যৌক্তিক যেকোনো মতামত প্রকাশ করব।
