ব্রিকস ব্যাংক প্রতীকী না বাস্তব

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৩, ২০:৪৯
বিশ্বের পাঁচটি উদীয়মান অর্থনীতির জোট ব্রিকস (বিআরআইসিএস)। দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনীতি তথা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অবকাঠামোখাতে ঋণ দেয়ার উদ্দেশ্যে গঠন করেছে এই আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট। সমপ্রতি জোটের পঞ্চম সম্মেলনে দেশগুলোর নেতারা একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌছেছেন যার নাম দেয়া হয়েছে ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। বলা হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে এটা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু আসলে সেটা সম্ভব হবে কিনা সেটাই প্রশ্ন বিশ্লেষকদের। কারণ এটা বাস্তবের চেয়ে কেবল আদর্শিক হলে তাদের উদ্দেশ্য যে সফল হবে না সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ফলে নিজেদের মধ্যে নানা বিবাদে জড়ানো এই দেশগুলো কী তাদের আসল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারবেন? নাকি রাজনীতি এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ব্যাংক গঠনে এশিয়ার লাভ লোকসানের বিষয়টিও হিসাব করছেন অর্থনীতিবিদরা। লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, ইউরোপের রাশিয়া, এশিয়ার চীন, দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস। বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাতে, অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বাড়ানো এবং বিশ্বের উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থনীতিকে সহায়তা করতে ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিকস নেতারা। এ ব্যাংক আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে এবং খনিসমৃদ্ধ আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করবে। গত ২৬ ও ২৭ মার্চ নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সম্মেলনে এই ঘোষণা দেয়া হয়। পশ্চিমা নির্ভরতা কমাতে ফাইবারঅপটিক ক্যাবল নিয়েও আলোচনা করছেন ব্রিকস নেতারা। জোট নেতাদের অভিযোগ, ইউরোপ এবং আমেরিকার রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে কাজ করছে বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ। এই সংস্থা দুটির মোকাবেলায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে তোলা ও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন নেতারা। পাঁচ সদস্যের এ জোটের আওতায় বিশ্বের ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠী রয়েছে। এছাড়া ৩০ শতাংশ ভূমি ও ২০ শতাংশ পণ্য উত্পাদন ক্ষমতার অধিকারী জোটের সদস্য দেশগুলো। ২০০৯ সালে ‘ব্রিকস’ আত্মপ্রকাশ করে এক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে। নতুন ব্যাংকের প্রাথমিক পুঁজি হবে পাঁচ হাজার কোটি ডলার এবং প্রত্যেক সদস্য দেশ সম পরিমাণ তহবিল যোগান দেবে। ২০০৪ সালের সম্মেলনে ‘রাজনীতি যাতে উন্নয়নের পথে বাধা না হয়’ সেই বিষয়ে লক্ষ্য রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন জোটের রাষ্ট্র প্রধানগণ। আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলায় একজোট হয়ে কাজ করার ডাক দিয়েছিলেন তারা। উন্নয়ন ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারী? জোট কি অবকাঠামো এবং ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের আওতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে? একদিকে এটি বাস্তবের চেয়ে অনেকটা আদর্শিক সিদ্ধান্ত। এটা কি পুঁজিবাদী বিশ্বে ওয়াশিংটন ঐকমত্যের স্থলে সমাজতান্ত্রিক বেইজিং এর ঐকমত্য স্থাপন করতে পারবে? আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় তো উন্নয়ন ব্যাংক আছে। তাই এটা যে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিংবা অবশ্য প্রয়োজন সেটা বলা যাবে না। তবে ব্যাংক কার্যকরী করা এবং এর প্রকল্পগুলিকে কতটা ফলপ্রসূভাবে সম্পন্ন করা যায় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ জাতির প্রত্যেকে ১০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু এটা যথেষ্ট নয়। কারণ বিশ্ব ব্যাংক বছরে ঋণ দেয় ৩৬ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার। আর চীনের আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত এক্সিম ব্যাংক বছরে তার চেয়েও বেশি ঋণ দিয়ে থাকে। তবে এটা ভাল দিক যে দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও সবগুলো একই হারে মূলধন যোগান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে একটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে, জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একক কোনো দেশের কর্তৃত্ব থাকবে না। এটা রাজনৈতিক দিক দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এটা কেবল আলোচনার দোকানে পরিণত হবে না। দেশগুলোর অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ব্রিকস-এর সদস্য চীন এবং ভারত উভয়েরই নজর আফ্রিকার কাঁচামালের দিকে। নিজেদের পণ্যের উপযুক্ত বাজারের খোঁজে বিশ্বব্যাপী প্রতিদ্বন্দ্বী তারা। চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্য মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে দেড়শ কোটি ডলার থেকে ছয় হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। গত বছর চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে বাণিজ্য হয়েছিল ৬০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া চীন দক্ষিণ আফ্রিকায় বিনিয়োগ করেছে প্রায় এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার। আফ্রিকা মহাদেশে দক্ষিণ আফ্রিকাই হল চীনের বৃহত্তম বাণিজ্যিক সহযোগী। গোটা আফ্রিকার সঙ্গে চীনের বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি ডলার। সেই সঙ্গে আছে পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ। আফ্রিকায় চীন কিছুটা এগিয়ে থাকলেও তাদের পরেই আছে ভারত। আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের পরিমাণ ৩ হাজার তিনশ কোটি ডলার। ২০১৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে ৯ হাজার কোটি ডলার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত স্থানীয় লোকদের কাজ দেয়ার চেষ্টা করে। আর চীন করে ঠিক তার উল্টোটা। আফ্রিকায় নিজ দেশের শ্রমিক কর্মচারি নিয়োগ করে। এজন্য চীনের সমালোচনাও হচ্ছে। চীন আফ্রিকা থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে নিয়ে দেশে তা পণ্যে রূপান্তরিত করে এবং সেই পণ্য আবার আফ্রিকায় বিক্রয় করে। চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার কূটনৈতিক সম্পর্ক মাত্র ১৫ বছরের। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় বহুদিন কাটিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের চলমান পরিস্থিতিতে এই মুহূর্তে চীনের মাথা ব্যথার বড় কারণ ভারত নয়। নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান আর দক্ষিণ চীন সমুদ্র। দুটি দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ছে। বর্তমানে যার পরিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ান মার্কিন ডলার। ব্রিকস কি বিশ্বে ক্ষমতাধর হবে এই ব্যাংক সফল হবে কিনা সেটা বলা মুশকিল। কারণ বিশ্বে অনেক উন্নয়ন ব্যাংক রয়েছে। চীন এবং ভারতের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব রয়েছে। ব্রাজিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সাইবেরিয়ায় পাইপ লাইন স্থাপন, তেলের মূল্য এবং জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের বিবাদ রয়েছে। চীনের জিডিপি অন্যান্য চার দেশের সমন্বিত জিডিপির চার ভাগের এক ভাগ। আর দক্ষিণ আফ্রিকার ২২ গুণ বেশি। ভারত উন্নতি লাভ করলেও সংগ্রাম করছে। ব্রাজিলের জিডিপি প্রবৃদ্ধি খুবই ধীরগতির। বছরে এক শতাংশেরও কম। ১৯৮০ সালে বিশ্ব বাণিজ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা ১৬ নম্বরে ছিল। এখন আছে ৪১ নম্বরে। রাশিয়ার জিডিপি কমছে। তবে সমন্বিতভাবে ব্রিকস দেশগুলোর অর্থনীতি যে উন্নতির দিকে যাচ্ছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির ধারণা অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে চীন, ভারত এবং ব্রাজিলের অর্থনীতি কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বাড়তে পারে। ব্রাজিল এবং চীনের চুক্তি চীন ও ব্রাজিল তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলারের মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করেছে। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সংকট মোকাবেলা এবং চীনের নিজ মুদ্রা ইউয়ানকে বিকল্প বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই চুক্তির উদ্দেশ্য। এই অর্থ দিয়ে চীন থেকে ব্রাজিলের আট মাসের এবং ব্রাজিল থেকে চীনের দশ মাসের আমদানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। ২০১২ সালে কলম্বিয়া এবং ইয়েল ইউনিভার্সিটি এনভায়রনমেন্টাল পারফরমেন্স ইনডেক্সে দেখা যায়, ৫টি রাষ্ট্রের মধ্যে ব্রাজিল বাদে ৪টিতে পরিবেশের ভারসাম্য অধিক পরিমাণে নষ্ট হচ্ছে। রাশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে। চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারত গ্রিন হাউজ গ্যাস কমানোর ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করেছে। দেশগুলোকে অবশ্য স্বীকার করতে হবে যে, তাদের দেশগুলোতে গ্রিন হাউজ গ্যাস কমাতে হবে। এ বছরের সম্মেলনে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিনিয়োগে গুরুত্ব দেয়ার কথা ছিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার সেটাই আশা করেছিল। কিন্তু সেই আশা তাদের পূরণ হয়নি। দেশটিতে ৩৫ বছরের নিচে ৭৩ শতাংশ নাগরিক বেকার।