২০১২ সালের মহা আড়ম্বরপূর্ণ অলিম্পিক গেমস আয়োজন সম্পন্ন করা ব্রিটেনের জন্য একদিকে যেমন গৌরবের আরেকদিকে চ্যালেঞ্জও বটে। কয়েক বছরের অর্থনৈতিক মন্দাকে টেনে নিয়ে ব্রিটেন এখন অলিম্পিকের বিনিয়োগ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এগার বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করে অবহেলিত ও অনগ্রসর পূর্ব লন্ডনের চেহারা পাল্টে ফেলেছে দেশটি। সে-সঙ্গে অলিম্পিক পার্ককে কেন্দ্র করে পরবর্তী চার বছর পর্যন্ত ১৬ বিলিয়ন পাউন্ড আয়ের টার্গেট নিয়েছে যুক্তরাজ্য। কয়েক লক্ষ অতিরিক্ত পর্যটক আকর্ষণ নতুন নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগ সৃষ্টির মাধ্যমেই এই আয় হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
লন্ডন অলিম্পিক ২০১২-এর আয়োজন বেশ সার্থকভাবেই সম্পন্ন করেছে ব্রিটেন। বিশ্বের বৃহত্ এ ক্রীড়াযজ্ঞ আয়োজনের প্রতিটা পরতেই ছিল অলিম্পিক আয়োজনের অতীতের যে কোন চমককে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর প্রভাব টিকিয়ে রাখা। এ কারণেই লন্ডন অলিম্পিকের মূল প্রতিপাদ্য দেয়া হয়েছিল ‘ইন্সপাইয়ার এ জেনারেশন’ (প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত কর)। তাই লন্ডন থেকে অলিম্পিক বিদায় নেয়ার পরও প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার কাজটি চলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। লন্ডন অলিম্পিকের প্রাপ্তি ধরে রাখতে গঠন করা হয়েছে ‘লন্ডন অলিম্পিক লিগ্যাসি কমিটি’।
লন্ডন অলিম্পিক আয়োজনে ব্রিটেনের মোট ব্যয় হয়েছিল ১১ বিলিয়ন পাউন্ড। এ ব্যয়ের সিংহভাগ খরচ হয়েছিল পূর্ব লন্ডনের স্ট্রাটফোর্টে অলিম্পিক ভিলেজের অবকাঠামো নির্মাণে। এসব অবকাঠামো নির্মাণের আসল উদ্দেশ্য অলিম্পিক আয়োজন হলেও এর মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে অবহেলিত পূর্ব লন্ডনের চেহারা বদলে দেয়ার প্রত্যাশাও ছিল। ২০০৫ সালে সিঙ্গাপুরে ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিক কমিটির ভোটাভুটিতে ব্রিটেন যখন লন্ডনকে অলিম্পিকের আয়োজক হিসেবে নির্বাচিত করার পক্ষে ভোট চাইছিল তখন তাদের আসল দাবিটাই ছিল, লন্ডন অলিম্পিক শুধু বিশ্ববাসীকে একটি জমজমাট ক্রীড়া উত্সবই উপহার দেবে না, এর মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের আবাসস্থল অবহেলিত পূর্ব লন্ডনের চেহারাও বদলে যাবে। এ এলাকাটি ভবিষ্যতের জন্য বিশ্বক্রীড়া আসরের তীর্থস্থান হিসেবে রয়ে যাবে। ব্রিটেন এখন তাদের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।
অলিম্পিকের লিগ্যাসি ধরে রাখতে এবং এর জন্য নির্মিত বিভিন্ন অবকাঠামোকে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজনের লক্ষ্যে নতুন করে ঢেলে সাজাতে ২ কোটি ৯২ লাখ পাউন্ডের বাজেট নিয়ে কাজ করছে অলিম্পিক লিগ্যাসি কমিটি। ইতিমধ্যে অলিম্পিকের মূল স্টেডিয়ামকে স্থানীয় একটি ফুটবল ক্লাব ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের কাছে ইজারা দেয়া হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে ৯৯ বছরের জন্য ক্লাবটি এ স্টেডিয়ামকে তাদের হোম গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করবে। এর জন্য ক্লাবটিকে ভাড়া গুণতে হবে বছরে বিশ লাখ পাউন্ড। ইতিমধ্যে অলিম্পিকের মূল স্টেডিয়ামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ফুটবল স্টেডিয়াম হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজে ব্যয় হচ্ছে ৬ কোটি পাউন্ড। এভাবে প্রায় সবক’টি ভ্যেনুই আরো ব্যাপক এবং সার্বজনীন ব্যবহারের লক্ষ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে।
সাঁতারের জন্য নির্মিত এ্যকুয়াটিক সেন্টারটির দায়িত্ব পেয়েছে ব্যায়ামাগার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জিএলএল। তারা এ সেন্টারটিকে সর্বসাধারণের জন্য একটি পরিপূর্ণ ব্যায়ামাগার হিসেবে গড়ে তুলবে। অলিম্পিক ব্রডকাস্ট সেন্টারে স্থানান্তরিত হচ্ছে প্রিমিয়ার লিগ ফুটবল কাভারেজ স্টুডিও। বাস্কেটবল এ্যরিনা সরিয়ে শিশু-কিশোরদের জন্য গড়ে তোলা হবে একটি ক্রীড়া একাডেমি যাতে থাকবে একটি অত্যাধুনিক প্লে গ্রাউন্ড। কুইন এলিজাবেথ অলিম্পিক পার্কটির সংস্কার শেষ হয়ে আসছে। জুলাই মাসে খুলে দেয়া হবে। এ মাসের ২৭ তারিখেই পূর্ণ হবে অলিম্পিক আয়োজনের এক বছর। এ উপলক্ষে অলিম্পিক স্মরণে অনুষ্ঠিত হবে জমকালো ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
লন্ডন মেয়রের অলিম্পিক লিগ্যাসি এডভাইজার নিল কোলম্যান বলেছেন, আগামীতে যে কোন ক্রীড়া আসর অনুষ্ঠানের জন্য লন্ডনের বড় সুযোগ রয়েছে। কেননা অলিম্পিক ভিলেজে যেসব অবকাঠামো রয়েছে সেসবের কারণে ব্রিটেন অন্য যে কোন দেশের চেয়ে খেলা আয়োজনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। ২০২২ সালের কমনওয়েল্থ গেমসের আয়োজক হওয়ার ইচ্ছার কথাও জানালেন তিনি। এর আগে ২০১৪ সালে এ ভিলেজে অনুষ্ঠিত হবে গ্লাসগো কমনওয়েল্থ গেমস। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত হবে রাগবি বিশ্বকাপ। ২০১৭ সালে ওয়ার্ল্ড এ্যাথলেটিকস চ্যম্পিয়ানশিপ এবং ওয়ার্ল্ড প্যারালম্পিক এ্যাথলেটিকস চ্যম্পিয়ানশিপেরও হোস্ট ভ্যেনু হবে এই অলিম্পিক ভিলেজ। এসব ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে লন্ডন বারবার বিশ্ববাসীর স্মৃতিপটে ফিরে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে লন্ডন অলিম্পিক পূর্ব লন্ডনের চেহারা আমূল বদলে দিয়েছে। অলিম্পিক উপলক্ষে এ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার যেমন উন্নয়ন হয়েছে তেমনি বেড়েছে বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য। স্থাপিত হয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় শপিং সেন্টার ‘ওয়েস্ট ফিল্ড’। এসবের পাশাপাশি বেড়েছে কর্মসংস্থান। অলিম্পিক ভিলেজেই কর্মরত রয়েছেন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার লোক। এছাড়া অলিম্পিকের জন্য নির্মিত আবাসিকে বাসস্থান হয়েছে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের।
২০১২ সালের আগে ব্রিটেন আরো দুই বার (১৯০৮ ও ১৯৪৮) অলিম্পিকের আয়োজন করেছিল। কিন্তু এবারের অলিম্পিক নিয়ে তারা খানিকটা অন্যরকম গর্ববোধ করছেন। তাদের মতে, এ অলিম্পিকের মাধ্যমে তারা আধুনিক অলিম্পিকের জন্ম দিয়েছেন। অলিম্পিক যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যেতে পারে তারও অনন্য উদাহরণ লন্ডন অলিম্পিক। ব্রিটেনের পর্যটন বিজ্ঞাপনেও প্রধান স্থান দখল করে নিয়েছে কুইন্স অলিম্পিক এলিজাবেথ পার্ক। অলিম্পিকের স্মরণে লন্ডনের রাস্তায় শোভা পাচ্ছে রঙ-বেরঙের বিলবোর্ড। যেখানে অসাধারণ অনুভূতির জানান দিতে খুব সাধারণভাবে লেখা ‘মেমোরিজ আর গ্রেইট’।
