নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত গাইবান্ধার মতিন মেহেদীর মাধ্যমে ‘আল্লার দলে’ ২০০৪ সালের শেষের দিকে যোগ দিয়েছিলেন শিবিরের সাবেক ক্যাডার মিজানুর রহমান। গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। কিন্তু ২০০৫ সালে মেহেদী গ্রেফতার হওয়ার পর গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জড়িয়ে পড়েন এমএলএম কোম্পানির দালালীতে। দালালি করে ভালই কামিয়েছেন। শেষটায় গ্রাহকদের ৬০ লাখ টাকা মেরে দিয়ে আত্মগোপনে যান। কখনোই তাকে পুলিশের ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ২০১২ সালে পরিচয় হয় জামায়াত নেতা ডা. ফরিদউদ্দিন আহম্মদের সঙ্গে। তার প্ররোচনায় আবার জঙ্গি তত্পরতায় উদ্বুদ্ধ হন। তবে চালচলনে কোন অবস্থায় বোঝার উপায় ছিল না যে তিনি কোন জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে যুক্ত। বেশ কিছুদিন আগে তিনি মিরপুর থানায় যান গ্রেফতার হওয়া তার এক চাচাকে ছাড়াতে। যাকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। এ সময় মিজানুর রহমানের কিছু কথাবার্তায় থানা পুলিশের সন্দেহ হয়। এ অবস্থায় মিরপুর থানা পুলিশ বিষয়টি গোয়েন্দাদের অবহিত করে। এরপর থেকেই গোয়েন্দারা তাকে অনুসরণ করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা পুলিশ কাঁঠালবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি বাসা থেকে মিজানুর রহমান, ডা. ফরিদউদ্দিন , আফগান ফেরত মুজাহিদ ফরিদউদ্দিন মাসুদ ও মাহফুজুর রহমানকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে ৮টি বোমাসহ উদ্ধার করে বিভিন্ন মালামাল। অভিযানে অংশ নেয়া একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জঙ্গি ধরার অভিযান সম্পর্কে এভাবেই বর্ণনা করেন।
ঐ কর্মকর্তা আরও বলেন, শুরুতে গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল এরা জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে যুক্ত হলেও বড় মাপের নয়। কিন্তু ধরার পর পরই জানা গেল তাদের বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনার কথা। পাশাপাশি তাদের মাধ্যমেই গ্রেফতার করা হয় জাল রুপীচক্রের চার পাকিস্তানি নাগরিকসহ আরও ১২ জনকে। এসব ঘটনায় রাজধানীর কাঁঠালবাগান, খিলক্ষেত ও বংশাল থানায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। কলাবাগান থানায় দায়ের করা মামলায় গোয়েন্দা পুলিশ ডা. ফরিদউদ্দিন আহম্মদ, মুজাহিদ ফরিদউদ্দিন মাসুদ, মিজানুর রহমান ও মাহফুজুর রহমানকে শনিবার তিনদিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। অপরদিকে খিলক্ষেত থানায় দায়ের করা মামলায় জাল রুপীর ব্যবসায়ী মোস্তফা, মামুনুর রশীদ এবং তার স্ত্রী ডলি আক্তার, মোঃ আবুল বাশার, রেজাউল করিম এবং রোকসানা বেগমকে চারদিনের রিমান্ডে নিয়েছে গোয়েন্দারা। এছাড়া বংশাল থানায় দায়ের করা মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পাকিস্তানি নাগরিক সায়িদ উদ্দিন, মোহাম্মদ ফারহান, রুবিনা বেগম এবং নারগিস আক্তারকে। গতকাল রবিবার ছিল সবারই রিমান্ডের প্রথম দিন।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, আফগান ফেরত মুজাহিদ ফরিদউদ্দিন মাসুদের বাড়ি চট্টগ্রামে। তিনি একে-৪৭ রাইফেলসহ একবার পাকিস্তানে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরে মুক্তি পাওয়ার পর ২০০৫ সালের শুরুতে দেশে ফেরেন। জড়িয়ে পড়েন আবারও জঙ্গি তত্পরতায়। তবে দেশে ফেরার পর পুলিশের হাতে তিনি কখনোই গ্রেফতার হননি।
অপরদিকে ডা. ফরিদউদ্দিন এক বছর আগে থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে দল গঠনের পরিকল্পনা করেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি কাঁঠালবাগান এলাকায় বাসা ভাড়া করেছিলেন। মূলত এটা ছিল ডা. ফরিদউদ্দিনের নাশকতার মূল আস্তানা। ডা. ফরিদউদ্দিনের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে। রাজধানীতে তার বাসা মোহাম্মদপুরে। ডা. ফরিদের অন্যতম সহযোগী মাহফুজুর রহমানের বাড়ি বরিশালে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আরও জানান, এ গ্রুপে আরও একজন রয়েছেন। তিনিও অবস্থান করতেন কাঁঠালবাগানের ভাড়া বাসায়। অভিযানের সময় তিনি ছিলেন বাসার বাইরে। তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তাকে গ্রেফতার করা হলেও আরও অনেক তথ্য জানা যাবে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এসব জঙ্গি প্রতিদিন ভোরে চন্দ্রিমা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে কারাতের পাশাপাশি নিজেদেরকে জিহাদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে থাকেন। অপরদিকে জাল রুপীসহ গ্রেফতারকৃতরা আগে কখনো পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়নি। পাকিস্তানি চার নাগরিকের পাসপোর্ট থেকে জানা যায়, তারা গত দুই বছরে ১২ থেকে ১৪ বার বাংলাদেশে এসেছে।
