আমাদের প্লে-ব্যাকের অস্থির দৌড়!

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৫৯
প্লে-ব্যাক নিয়ে বাংলাদেশি পরিচালকদের ভারত যাতায়াতটা বাড়ার কারণ আগের কিস্তিতে আমি উল্লেখ করেছি। ছবির পরিচালক-প্রযোজকদের এই ভিনদেশি শিল্পীদের গানের প্রক্রিয়াতেও খুব একটা সাফল্য আনতে পারেনি। অর্থাত্ গত কয়েক বছর ধরে একাধিক ভারতীয় শিল্পী প্লে-ব্যাকে কণ্ঠ দিলেও মিডিয়ায় প্রচারের তুলনায় গান আমজনতার ভালো লাগার তালিকায় ঠাঁই পায়নি। এদিকে সাম্প্রতিক কিছু রিয়েলিটি শোর তারকারা যখন নিজেই একটি সাউন্ড কার্ড ও ঘর ভাড়া করে স্টুডিও দেওয়া শুরু করলেন তখন তারা নামে মাত্র পারিশ্রমিকে সিনেমার গান তৈরি করা শুরু করলেন। ফলে এ ক্ষেত্রে আরও এক দফা অবক্ষয় ঘটল চলচ্চিত্রের গানের। দুয়েকজন ব্রোকার কাম গীতিকার থেকে যখন একটি-দুটি গান এফএম-এ হিট হতে শুরু করল। তখন তারা নিজেরাই গান লেখা, সুর, সংগীত সব শুরু করলেন। আত্মপ্রচারের জন্য নানান ফন্দি আঁটা শুরু করলেন। এ ছাড়া কলকাতার কিছু শিল্পীরাও যখন দেখলেন তাদের কণ্ঠের চাহিদা বাংলাদেশে খুব বেশি তখন তারা সুযোগটা কাজে লাগিয়ে দ্বিগুণ... কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনগুণ পারিশ্রমিক দাবি করে বসলেন। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, শ্রেয়া ঘোষাল ৪০ থেকে ৫০ হাজার ভারতীয় রুপি মুম্বাই ছবির জন্য নিলেও বাংলাদেশের নাম শুনলেই এখন এক থেকে দেড় লক্ষ রুপি হাঁকেন। হালের জনপ্রিয় শুভমিতাও বাংলাদেশি কোনো গান হলে তার পারিশ্রমিক দ্বিগুণ তিনগুণ হয়ে যায়। অথচ মাত্র ১০ বছর আগে এই চিত্র ছিল একেবারে উল্টো। পাঠক-শ্রোতাদের স্মরণে থাকলে উল্লেখ করা যায় যে, এক সময় আশা ভোসলের সাথে সাথে আমাদের প্রথিতযশা এক শিল্পীর অ্যালবাম করা হয়েছিল নামে মাত্র পারিশ্রমিকে। বাংলাদেশি সিনেমায় ব্যবহারের কথা বললেই অল্প বাজেটের ছোট বাজার ভেবে তারা দয়া দাক্ষিণ্য করে কম পারিশ্রমিকে গান গেয়ে দিতেন। পরে অনেক অ্যারেঞ্জারই সিনেমার নাম করে রেকর্ড করে আনা সেই গানগুলো অডিওর গান হিসেবে বাজারজাত করতেন। ঠিক একইভাবে চলচ্চিত্রের গানের ক্ষেত্রে কিছু কিছু শিল্পীও ভিন্ন ভিন্ন পথ অবলম্বন করেন। তাই সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন শিল্পীরা জিজ্ঞেস করবেন যে, আপনার ছবিটি মুক্তি পাবে নাকি শুধু মহরত? অর্থাত্ ছবি মুক্তি পেলে এক পারিশ্রমিক আর মুক্তি না পেলে আরেক! চলচ্চিত্রের গানের এই বিচিত্র দশায় তাই প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু নীতিমালা। কিন্তু বেড়ালের গলায় কে বাঁধবে সেই ঘণ্টা? সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। প্লে-ব্যাকের বনেদিয়ানা আরও একটি মাধ্যম নষ্ট করেছে। তা হলো ভুঁইফোড় কিছু নির্মাতার ‘ডিজিটাল’ নামের নিম্নমানের চিত্রায়ণ। যার তুলনায় কয়েক বছর আগের সঙ্গীতা থেকে প্রকাশিত বিতর্কিত মিউজিক ভিডিও যেন ভালো ছিল। আর এইসব নির্মাতা চলচ্চিত্রের ভাষা না বুঝেই তৈরি করছে চলচ্চিত্রের গান। এ ছাড়া গুটি কতক নির্মাতা আছেন যাদের ছবি হলে গিয়ে দেখলে মনে হয় বড় পর্দায় নাটক দেখছি। সেই সব ছবিতে আবার গানের কোনো চিত্রায়ণ থাকে না। অথচ তাদের চলচ্চিত্রের গানের অডিও অ্যালবাম ঠিকই বের হয়। এমনকি সেই অডিও অ্যালবাম নিয়ে টিভি লাইভেও নির্মাতারা বড় বড় কথা বলেন। অনেকে যুক্তি দেখান কোরিয়ান ফিল্মে তো গান ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু প্রশ্ন থাকে যে, আমাদের এই দেশটি তবে কী কোরিয়ার কালচারে চালিত হয়? নাকি তারা আমাদের সংস্কৃতিকেই হত্যা করতে চান। তাই সাধারণ দর্শক এই সব ছবিকে ছুড়ে ফেলে দেন নিমিষেই। শুধু তাদের নানান খোঁড়া যুক্তির কারণে আজ প্লে-ব্যাক শব্দটি হয়ে ওঠে বড়ই প্রশ্নবিদ্ধ। এরপরও কিছু নির্মাতাদের ক্ষেত্রে ছবির গল্প ও চিত্রায়ণের চেয়ে তাদের গানের চিত্রায়ণ ভালো হয়। কারণ ছবির শুটিং করার আগে তারা গানের শুটিং করে ফেলেন। এরপর টিভি, ইউটিউব বা ফেসবুকে তার শেয়ার চলতে থাকে। এতে একটি লাভ ও ক্ষতি হয়। তা হলো দর্শকেরা ঝকঝকে দৃশ্যায়ন দেখে গানটা শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও পরে ছবি দেখে তাদের বিরক্তির চূড়ান্ত হয়। যখন দেখা যায় ছবির সাথে গানের কোনো সঙ্গতি নেই তখন মুখ ফিরিয়ে নেয় চলচ্চিত্রের কাছ থেকে। এই সমন্বয়হীনতার কারণেই ছবির গান কালোত্তীর্ণের প্রশ্ন তো অনেক দূরের, আলোচনার টেবিলেও থাকছে না। এ ছাড়া এখন স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রতিটি স্টেশনেই প্রায় সিনেমার গানের কাউন্টডাউন অনুষ্ঠান প্রচার হয়। কিন্তু বিচিত্র এই দেশের সেলুকাসের মতোই একেক স্টেশনের টপচার্ট হয় একেক রকম। কারণ যে দেশে বক্স অফিস নেই সে দেশে প্লে-ব্যাকের টপচার্ট কে নির্ণয় করবে। প্রডিউসারকে প্রশ্ন করলে একগাল হেসে তারা উত্তর দেন, ‘যখন যার ভিডিও টেপটা ভালো পাই তাকে টপচার্টের শীর্ষে রাখি।’ এভাবেই চলছে সম্পর্কের বাণিজ্যে মূল্যায়ন। কিন্তু এই সম্পর্কের রসায়ন হয়তো আমরা যারা গুটিকয়েক লিখিয়েরা বুঝি। দূর মফস্বলের সাধারণ দর্শক যখন দেখছেন তখন তার তো বুঝার কথা না। তাই তিনি বিভ্রান্ত হয়ে হিন্দি বা ইউকে টপচার্টেই বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। কারণ এখানে যে নির্মাতার সাথে চ্যানেলের সবচেয়ে ভালো যোগাযোগ তার ছবির গানটাই থাকে হিট লিস্টে! এই অদ্ভুত চক্রে ঘোরা প্লে-ব্যাকের চাকা তাই রাস্তা ছেড়ে ঘুরছে এখন মাঠ-প্রান্তরে। কখনও ফুটপাতে সেই চাকা উঠে সাধারণ দর্শকদের অসুবিধা তৈরি করছে। তবে এত এলোপাথাড়ির ভেতরেও একসময় স্থিতিশীলতা আসবে এটাই সকলের প্রত্যাশা। কারণ গানের ক্ষেত্রে এখনও একটিই আশার বিষয় এখানেই। এখন প্লে-ব্যাক নাম করেই স্টুডিওগুলো সচল আছে। প্রতিমাসে অডিও রিলিজ না হলেও বিভিন্ন চলচ্চিত্রের গানের নামে একাধিক গান বের হচ্ছে। শিল্পী-মিউজিশিয়ান আর কিছু গীতিকার তাদের পরিচয় টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে টিকে থাকছেন বা থাকার চেষ্টা করছেন। স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়? (আগামীকাল থাকবে ‘পুরস্কারের জন্য সিনেমা বনাম সিনেমার জন্য পুরস্কার’)