প্রতীক্ষিত এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে পা হারানো লিমন

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৩
গতকাল সোমবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে র্যাবের গুলিতে পা হারানো ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের লিমন হোসেন। প্রথম দিনের বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নিতে সকাল সাড়ে নটায় কাউখালী উপজেলা সদরের উজিয়াল খান এলাকার ভাড়াবাসা থেকে মাকে নিয়ে রিকশাযোগে কাউখালী সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় কেন্দে পৌঁছে। সকাল দশটায় কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এইচএসসি ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। কাউখালীর কাঁঠালিয়া পিজিএস বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে লিমন পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। ২০১১ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ১২ দিন পূর্বে ২৩ মার্চ বাড়ির পাশে র্যাবের কথিত বন্ধুকযুদ্ধে পা হারায় লিমন। গতকাল সোমবার সকালে লিমন তার মা হেনোয়ারা বেগমকে নিয়ে কাউখালী সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় কেন্দে র সামনে উপস্থিত হলে উত্সুক জনতা ও পরীক্ষার্থীরা লিমনকে দেখার জন্য ভিড় জমায়। এসময় লিমন সাংবাদিকদের বলেঃ ‘র্যাবের নিষ্ঠুরতার কারণে আমি লেখাপড়ায় এক বছর পিছিয়ে পড়েছি । ভাল ফলাফল অর্জন করে প্রমাণ করবো আমি সন্ত্রাসী নই। মা হেনোয়ারা বেগম বলেনঃ ‘লিমনের আজ আসলপায়ে ভর করে পরীক্ষা কেন্দে আসার কথা। কিন্তু র্যাব গুলি করার কারণে আজ ওকে নকলপায়ে কষ্ট করে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। আমার এখন একটাই চাওয়া ও যেন ভাল পাস করে অনার্সে ভর্তি হতে পারে।’ কাঁঠালিয়া পিজিএস বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাসিরউদ্দিন মাহমুদ বলেনঃ লিমনের গতকালের বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা ভাল হয়েছে। আশাকরি সবগুলো পরীক্ষাই ওর ভাল হবে। লিমনের বাবা তোফাজ্জেল হোসেন বলেনঃ লিমন যে আবার পরীক্ষা দিতে পারছেঃ তাতেই আমি খুশি। ২০১১ সালের ২৩ মার্চ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ১২ দিন আগে রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে নিজ বাড়ির পাশে বরিশাল র্যাব-৮এর সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করলে পা হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায় ইটের ভাটায় কাজ করে পড়ালেখা চালানো মেধাবী ছাত্র লিমন। ২০১১ সালে সহপাঠীরা যখন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে এইচএসসি ব্যবসায় ব্যবসহাপনায় পরীক্ষা দিচ্ছে, লিমন তখন পা হারিয়ে কাতরাচ্ছিলো ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের বিছানায়। এভাবেই চিকিত্সা ও যন্ত্রণায় কেটে গেছে পঙ্গু লিমনের এক বছর। তবু হাল ছাড়েনি দরিদ্র পরিবারের লিমন। চিকিত্সাশেষে আবার মন দেয় লেখাপড়ায়। গত বছর প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে পাস করে। লিমনের ভাই হেমায়েত হোসেন সুমন জানান, লিমনের পরীক্ষা ভালো হয়েছে। বাকী পরীক্ষাগুলো যাতে ভাল হয়, সেজন্য দোয়া চেয়েছেন তিনি। রবিবার সন্ধ্যায় কাউখালীর বাসায় বসে কথা হয় লিমনের সঙ্গে। সে বলে, “২০১১ সালের ২৩ মার্চ র্যাব আমাকে গুলি করে ফেলে রাখে। আমি মরার মতো পড়েছিলাম, মনে হয়েছিল বাঁচবো না। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও র্যাবের নির্মমতায় আমার শিক্ষাজীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে গেছে। মা-বাবা, শিক্ষক, সহপাঠীসহ অসংখ্য মানুষের দোয়া আর ভালোবাসায় এইচএসসি প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাস করার পর এবার দ্বিতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছি। চিকিত্সাশেষে ফেরার পর কলেজের অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন মাহমুদ স্যার আমাকে ক্লাস করার সুযোগ দেয়ার পর অনেক কম টাকায় আমাকে পরীক্ষা দেয়ারও ব্যবস্থা করে দেন।” কাউখালীর কাঁঠালিয়া পিজিএস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাসিরউদ্দিন মাহমুদ বলেন, “লিমন পড়ালেখায় ভালো, আশা করি পরীক্ষায় সে ভালো করবে। র্যাবের দায়ের করা মামলা মিথ্যা উল্লেখ করে সীমাহীন হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে লিমন। ২০১১ সালের ২৩ মার্চ রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের লিমন হোসেন র্যাবের গুলিতে পা হারায়। র্যাব এ ঘটনায় লিমনসহ সাতজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে দুইটি মামলা করে। পুলিশ মামলা দুইটিতে লিমনসহ আসামিদের অভিযুক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।