বিএনপির অভিযোগ খণ্ডন করে চিঠি দেবে ইসি

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৫
প্রধান বিরোধীদল বিএনপির লিখিত অভিযোগ পর্যালোচনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে ‘ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা’ দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনসহ দলটি যে তিনটি দাবি জানিয়েছে তার জবাব প্রস্তুত করেছে ইসি সচিবালয়। কমিশন মনে করে, বিএনপির তিনটি দাবি যুক্তিসঙ্গত নয়। আরপিওতে আইন-শৃঙ্খলার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহ অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। সংসদীয় আসনের সীমানা পুন:নির্ধারণ সংক্রান্ত দাবির বিষয়ে বিএনপি সুনির্দিষ্ট কোন আসনের কথা উল্লেখ করেনি। অন্যদিকে ভোটার তালিকা পত্র-পত্রিকার রেফারেন্স হিসাবে যে সাড়ে পাঁচ লাখ ভোটারের কোন হদিস নেই বলে দাবি করা হচ্ছে তা আদৌ সত্য নয়। বিএনপির এই তিনটি অভিযোগ খণ্ডন করে চিঠি দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। গত ২০ মার্চ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত এক পত্রে সেনাবাহিনীকে ‘ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা’ দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন দাবি, সংসদীয় আসনের সীমানা পুন:নির্ধারণে আইনের লংঘন এবং ভোটার তালিকায় গরমিল থাকার অভিযোগ করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইসি সচিবালয় থেকে একটি কার্যপত্র প্রস্তুত করে কমিশন সভায় পাঠানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিএনপি যে চিঠি দিয়েছে তার বিষয়ে কমিশন সভায় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’ নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ ইত্তেফাককে বলেন, বিএনপির অভিযোগ পর্যালোচনা হবে। ইতিমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু আলোচনা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে শিগগিরই আলোচনা করা হবে। এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। ইসি সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, বিএনপিকে কমিশন থেকে পাল্টা চিঠি দেয়া হতে পারে। যে প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে তা কমিশন সভায় অনুমোদিত হলে চিঠির মাধ্যমে জানানো হতে পারে। সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে বিএনপির চিঠিতে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিধান বাতিল করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। সংশোধিত খসড়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ বাদ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন ব্যতিরেকে কোনভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না এবং জাতি সেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে না। প্রয়োজনীয় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী নিয়োগের বিধান সংযুক্ত করে আরপিও সংশোধনের জন্য জোর দাবি জানানো হয়। এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এ আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহ অন্তর্ভুক্ত নেই। নবম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আরপিওতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের ৯টি সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে ১ম, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয়েছিল। ২০০১ সালে প্রথম আরপিওতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আরপিওতে আইন-শৃঙ্খলার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগসমূহ অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও নির্বাচন কমিশন চাহিদা অনুসারে ইতিপূর্বে বিভিন্ন নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হয়েছিল। সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গত ৭ ফেব্রুয়ারি সারাদেশের ৮৭টি সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের খসড়া প্রকাশের পর জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারের বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দেয়ার জন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক সুবিধা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জনসংখ্যার বিভাজন বিবেচনায় রেখে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের বিধান থাকলেও এক্ষেত্রে পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি। বরং মহাজোটের মন্ত্রী, এমপিসহ প্রভাবশালীদের সুপারিশ অনুযায়ী বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, ‘সংবিধান ও ১৯৭৬ সালের সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুসারে ৮৮টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। খসড়া প্রকাশের পর এ পর্যন্ত ৮৯৯টি দাবি আপত্তি ও পরামর্শ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৮৪টি আসনের বিপরীতে আবেদন পাওয়া গেছে। ৭৫টি আসনের উপর আপত্তি পড়েছে ৩৭৬টি এবং ৩৪টি আসনের বিপরীতে পরামর্শ পাওয়া গেছে ৫২২টি। প্রাপ্ত দাবি ও সুপারিশসহ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক শুনানি গ্রহণ করে সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এক্ষেত্রে আবেদনকারীরা তাদের যুক্তি ও প্রমাণাদি শুনানির সময় তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। বিএনপির পত্রে সুনির্দিষ্ট কোন আসনের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। ভোটার তালিকায় গরমিলের বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, হালনাগাদ কার্যক্রম শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ জন ভোটারের হিসাব নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর সাড়ে পাঁচ লাখ ভোটারের হদিস নেই মর্মে পত্র-পত্রিকায় যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি। সংশ্লিষ্ট পত্রিকাগুলোতে পরে প্রতিবাদলিপির মাধ্যমে তা নিশ্চিতও করা হয়। ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নে প্রত্যেক ভোটারের বায়োমেট্রিক ডাটাসহ সকল ডাটা কয়েকটি পর্যায়ে সংরক্ষিত থাকে। এ কারণে কোন ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার কোন সুযোগ নেই। সেনাবাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘আরপিওতে সেনা মোতায়েনের বিধান না থাকলেও ইতিপূর্বে সেনাবাহিনীর সহায়তায় জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রয়োজনে আমরাও সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চাইব। শিগগিরই আরপিও’র চূড়ান্ত খসড়া ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে।’