চারতলা থেকে গুটুস গুটুস করে নামছিল জারিফ সময়। শরীরের উচ্চতা, পায়ের গঠন এবং গায়ের কাপড় সবমিলিয়ে দেখতে বেশ লাগলেও সাবধান হতে হচ্ছিল তার মা অহনাকে। আলতো করে ছেলের হাত ধরেছিল সে, যদিও সময় সেটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকেই। নতুন যে জ্যাকেটটা সে পরেছে আজ, সেটা ওজনে একটু বেশিই! রংটা কিন্তু দারুণ। উজ্জ্বল মেরুন। বাবা শখ করে কিনে এনেছে, না পরিয়ে উপায় আছে! অহনা মৃদু আপত্তি করেছিল কিন্তু শুনেই সময় চিত্কার করেছিল, না-আ আমি পরবো ওটা! বাবা এনেছে, বাবা আমার জন্য কিনে এনেছে, এই নাতি, তুই ধরবি না।
নাতি ওর চেয়ে আট বছরের বড় বোন। নাম নাতাশা। সময় বলে, নাতি। কিছুতেই আপু বলবে না ওকে। মা ডাকে নাতাশা বলে, বাবা ডাকে, চাচা, ফুপু সবাই ডাকে নাতাশা বলে, সে কেন তবে আপু ডাকবে!
আমি আপু ডাকবো না, মা, ওকে আপু ডাকবো না।
ঠিক আছে বাবা তুমি আপু ডেকো না। কিন্তু তুমিতো ঠিকমতো নামটাও বলতে পারছো না এখন। আবার চিত্কার করার আগেই মা তাকে থামায়।
বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। সময়ের দাদী অহনার দিকে তাকিয়ে আশ্বাস দেন।
কিন্তু মা, যদি ঠিক না হয়! অত বড় বোনকে নাম ধরে যদি ডাকে!
আরে এতো ভেবো না তো তুমি, আজকালকার মায়েদের এই এক সমস্যা তোমাদের। সব কিছুতেই আঁতেক ওঠা! আমরা এসব নিয়ে চিন্তাই করতাম না, বড় হলে সব....।
পুরোটা শেষ হওয়ার আগেই অহনা বাথরুমের দিকে চলে যায়। সময়’এর পটি পরিষ্কার করতে হবে। এখনও ছেলে পটিতে বসে, কোনো মানে হয়! তার শাশুড়ী যখন মা হয়েছিলেন তখন কি ছেলের পটি পরিষ্কার করতে হতো! বললেই হলো, সব ঠিক হয়ে যাবে! ওনাকে বাজার করে আনতে হতো তখন! কে বলে এসব কথা! অহনাকে বাজার করে এনেই আবার পটি পরিষ্কার করতে যেতে হয়!
তিনতলা পর্যন্ত সময় বেশ হেঁটে এলো, দোতলায় এসে একটু ট্যালর ব্যালর করলো। মা কোলে নিতে চাইলে গা মোচড় দিয়ে দু’ইঞ্চি মতো সরে গেল। সোয়া তিন চলছে। যখন তখন তো আর কোলে চড়া যায় না! কোনো কোনো সময় চড়া যেতে পারে, তাই বলে যখন তখন!
কি ব্যাপার সময় বাবু, কোথায় যাওয়া হচ্ছে? এই অহনা ওর গায়ে ক’টা চড়িয়েছো? ও এমন করে হাঁটছে কেন? শরীর তো ভারি হয়ে গেছে মনে হচ্ছে! দোতলার দরজা খুলে চাচী দাঁড়িয়ে। সময়’এর দিকে তাকিয়ে আঁতেক উঠেছেন বলে মনে হলো।
তিনটা।
তিনটা পরে ও হাঁটছে কেমন করে? এতোটুকুন একটা শরীর, কাপড়ের ভারে মনে হচ্ছে উল্টে পড়ে যাবে! মাথারটা ঠিক আছে, কান-টান ঢেকে বের হওয়াই উচিত, যা শীত, কিন্তু...।
না পরে ও বের হবে না। আমি দুটো পরতে দিলাম কিন্তু ও তিনটাই পরবে। জ্যাকেটটা একটু বড় হয়েছে, পরতে না করলাম, শুনলে তো। বাবা এনেছে, পরতেই হবে। কি করবো বলেন ভাবি।
অহনা আর একটু কথা বলতো কিন্তু সময়’এর মৃদু টানে এগিয়ে যেতে হলো। একজন সাহায্যকারিনীর দরকার, সেই কথাটা বলার দরকার ছিল, দো’তলার ভাবির কাছে এসবের সমাধান পাওয়া যায়। কিন্তু বলা হলো না।
বাসা থেকে বের হলেই দোকানপাট। জামা-কাপড় থেকে খেলনাপাতি, সব পাওয়া যায়। বাসা থেকে বের হওয়ার সময়, আর ঢোকার সময় অহনা দ্রুত জায়গাটা পার হয়। প্রায় সব দোকানের সেলসম্যানরাই মা আর ছেলেকে চিনে। দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সেলসম্যানগুলো সময়কে ডাকে।
এই যে, সময়বাবু, কোথায় যাওয়া হচ্ছে? নতুন খেলনা এসেছে, দেখে যাও।
ও ভাবি, আসেন না একবার, বাচ্চাদের ভালো গরম কাপড় এসেছে, দেখে যান।
একজন কলাওয়ালা ডালিতে কলা নিয়ে বসে থাকে মোড়টায়। মোড়টা পার হওয়ার সময় অহনাকে আরও বেশি দ্রুত হাঁটতে হয়। সময়’এর চোখে পড়লেই হলো, কলা না কিনে বাসায় ঢোকা মুশকিল হয়ে যায়। অহনা যতই বলে, বাসায় কলা আছে, কিন্তু কে শোনে! সংসারের নানান কাজে বের হতেই হয় তাকে, সময়কে ছাড়া বের হওয়াও যায় না। আঠার মতো লেগে থাকে ছেলেটা। এক-আধবার ওর দাদীর কাছে রেখে গেলেও বেশিরভাগ সময়ই ওকে সাথে নিতে হয়। এক আঁটি শাক কিনতে প্রায়ই নিচে নামে অহনা। শাক ওর দাদীর পছন্দ। বাসার কাছেই এক মহিলা শাকের ডালি নিয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে ওর কাছ থেকে শাক কিনে অহনা। তারপরেও দরদাম করতে হয়। দোকানগুলো পার হয়ে শাকের ডালির কাছে যায় অহনা। শাকওয়ালী পয়সা গুনছিল। সময়’এর ছোট ছোট পায়ের দিকে তাকিয়ে মুখে চোখ রাখে।
কি বাবু সোনা, শাক কিনবা? কোন শাক খাইবা, পালং, না মূলা, লালশাক দেই, ভাতের সাথে মাখাইয়া খাইবা দেখবা কি সোন্দর লাল রং হইবো। দেই তিন আঁটি?
তিন আঁটি! অত শাক দিয়ে কি করবো। দুই আঁটি দেন। এক আঁটি লাল, এক আঁটি পালং, দুটো মিলিয়ে দেন। অহনা তাড়াতাড়ি বলে। তা না হলে এখনই মহিলা তিন আঁটি লালশাক ছেলের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।
কত দাম? সময় বলে।
ওরে বাবা, বাবুসোনা দাম করতে জানে? পনেরো টাকা।
না, দশটাকা। সময় মুখ শক্ত করে বলে।
অহনা তাকিয়ে থাকে সময়’এর দিকে। সে অবাক হয়। ওকে কে শেখালো দশটাকা দাম বলতে হবে!
না, বাবুসোনা দশটাকায় হবে না। পনেরো টাকাই লাগবে।
নিব না। রাখেন।
সময় মায়ের হাত ধরে টানে।
অহনা মহিলার দিকে তাকিয়ে হাসে। বোঝেন খালা, এরপর থেকে আমার ছেলে আসবে শাক কিনতে। আমাকে আর আসতে হবে না।
ঠিক আছে যাও, বাবু সোনার জন্য আমি দশটাকাই রাখলাম। ব্যাগের ভেতর শাক ঢোকায় শাকওয়ালী। অহনা টাকা বের করে দেয়। চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই শাকওয়ালীর কাছে একটি ছেলেকে আসতে দেখে সে দাঁড়ায়। বয়স সময়’এর চেয়ে একটু বেশি হবে।
কে হয়? অহনা জিজ্ঞেস করে।
নাতি। হাসতে হাসতে বলে শাকওয়ালী।
ওর গরম জামা নাই? ঠাণ্ডা লাগছে না ওর?
আছে একটা। ধুয়ে দিছে ওর মা। এখন রোদ উঠছে। রোদে হাঁটলেই আর ঠাণ্ডা লাগবো না।
কি যে বলেন খালা। রোদে হাঁটলেই আর ঠাণ্ডা লাগবে না, এটা একটা কথা হলো। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। ঠিক আছে, আমার সাথে ওকে দেন, আমি ওকে একটা গরম জামা দেব। নাতাশার কয়েকটা গরম জামা আছে, যেগুলো আর ওর প্রয়োজন হয় না। অ্যাই, আমার সাথে আয়।
বাসায় ঢুকে অহনা নাতাশার গরম জামার ড্রয়ারটা খোলে। দুটো সোয়েটার বের করে, যেগুলো ছেলেটার গায়ে লাগবে। সোয়েটার দুটো নিয়ে ড্রয়ার বন্ধ করে দেখে, সময় তার কাপড়ের ঝুড়ি থেকে একটা সোয়েটার হাতে নিয়ে ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মা, ওকে দাও। সময় হাত বাড়িয়ে দেয়।
না বাবা, তোমারটা হবে না। তোমারটা ওর ছোট হবে। নাতাশারটা হবে। তোমারটাও দিব। আরও ছোট কাউকে পেলে তোমারটা দিব, ঠিক আছে? এখন রেখে দেই?
ঠিক আছে, আমারটাও কিন্তু দিবে, দিতেই হবে। নাতি আপুরটা দিলে আমারটাও দিতে হবে। দিতেই হবে।
অহনা ছেলেকে চকাস করে চুমু খেয়ে কোলে তুলে নেয়। আপু বলেছে! মুগ্ধ চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকে অহনা। এবার আর সময় কোল থেকে নামার চেষ্টা করে না।
