নান্দনিক স্থাপনা, আড্ডার স্থল, পরিযায়ী পাখি আর বাহারী রঙের ফুল শোভিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রয়েছে নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন। প্রতিটি সংগঠনই আপন স্বকীয়তা বজায় রেখে ক্যাম্পাসকে গড়ে তুলেছে প্রাণচাঞ্চল্যময়। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম স্বতন্ত্র একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হল ‘আনন্দন’। ২০০০ সালের ২৫ অক্টোবর কবি শামসুর রাহমানের হাত ধরে ‘বিকশিত মেধায় লড়ব একুশ শতক’ স্লোগান ধারণ করে সংগঠনটির পথ চলা শুরু হয়। ব্যতিক্রমী গান আর কবিতার নিজস্ব প্রযোজনার মাধ্যমে সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই লাভ করে বিপুল জনপ্রিয়তা ও সুনাম।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. গোলাম রব্বানীর অনুপ্রেরণায় এবং উপদেষ্টা অধ্যাপক এটিএম আতিকুর রহমান ও বাংলা বিভাগের শিক্ষক কবি খালেদ হোসাইনের সহায়তায় আনন্দন পার করে ১২টি বছর। দীর্ঘ একযুগে আনন্দনকে সমৃদ্ধ করেন ১০ জন সভাপতি। এই ক্যাম্পাসে প্রায় প্রতিবছর মনোমুগ্ধকর ‘আনন্দন উত্সব’ আয়োজন করে এই সংগঠনটি। পাঠচক্র ও বাত্সরিক কর্মশালার মাধ্যমে নতুন সদস্যরা আনন্দনের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। কেবল সাংস্কৃতিক দিক দিয়েই নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথেও সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে এই সংগঠনটির। অন্যান্য সংগঠনের সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে সকলের সাথে সমান তালে চলার দক্ষতা রয়েছে আনন্দনের।
ক্যাম্পাসের চরম সংকটময় মুহূর্তে যখন সাংস্কৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে ছিল তখনও সাহসিকতার সাথে তা মোকাবেলায় অগ্রণী ভূমিকা ছিল এই সংগঠনের সদস্যবৃন্দের। নানা প্রতিকূলতা শর্তেও কখনো তারা থামিয়ে দেয়নি তাদের সাংস্কৃতিক চর্চা বরং দুর্দান্ত বেগে অসীম সাহসিকতার সাথে প্রতিটি বিরূপ পরিবেশে করেছে সংগ্রাম। টিকিয়ে রেখেছে প্রিয় সংগঠন ‘আনন্দন’কে। সপ্তাহে ৪ দিন (শনি, সোম, মঙ্গল, বুধ) বিকালে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের ৬ নম্বর কক্ষ মুখরিত হয় আনন্দন কর্মীদের কবিতা আর গানে। কোন কোন দিন বিভিন্ন খেলার মাধ্যমে কলহাস্যে ভরে উঠে আনন্দন কক্ষ। নিয়মিত মজার আড্ডা আর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রতিটি সদস্য একে অপরের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠে। যেন একদিন আনন্দন কক্ষে না এলে কারো ভাল লাগে না। ক্যাম্পাসকে উপভোগ করার জন্য এই সংগঠনটির বিকল্প নেই। এখানে একবারে আনকোরা নিরস সদস্যও অল্প দিনেই কর্মদক্ষ ও চঞ্চল হয়ে উঠে খুব সহজেই। সংগঠনের আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় প্রতিটি সদস্যের মত ক্যাম্পাসও সিক্ত হয়। পথচলার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘আনন্দন উত্সব-১৪১৯’।
‘আনন্দিত হও নন্দন নন্দিনী, নন্দিত আনন্দনে’ এই স্লোগানকে ধারণ করে ৪ দিনব্যাপী এই উত্সব পালিত হয়। গত মঙ্গলবার বেলা ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশের পাদদেশে র্যালির মাধ্যমে এই উত্সবের উদ্বোধন করেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও আনন্দনের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক এটিএম আতিকুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো. মনোয়ার হোসেন তুহিন ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী, আনন্দনের সভাপতি নাজিয়া ফেরদৌস, সম্পাদক মো. মুনিরুজ্জামান উজ্জলসহ আনন্দন কর্মীরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক এটিএম আতিকুর রহমান বলেন, সংকটের মধ্যে থেকেও আনন্দন এতবড় একটি উত্সব হাতে নিয়ে যে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে এটিই অনেক বড় ব্যাপার। উদ্বোধন শেষে র্যালিটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ক্যাফেটেরিয়া চত্বরে এসে শেষ হয়।
অনুষ্ঠানের প্রথম দিন মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয় আনন্দনের প্রযোজনায় সংগীতানুষ্ঠান ‘মানুষ ধর, মানুষ ভজো’ ও গুণীজন সম্মাননা। অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধা জাকির হোসেন চৌধুরীকে সম্মাননা দেয়া হয়। দ্বিতীয় দিন বুধবার প্রদর্শিত হয় নাট্য সংগঠন ‘বটতলা’র প্রযোজনায় নাটক ‘খনা’। তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার আনন্দনের প্রযোজনায় আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘হাড়ের ও ঘরখানি’ ও নৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ‘আনন্দন উত্সব-১৪১৯’-এর আহবায়ক উন্মেষ ধর আনন্দনের নতুন কমিটি ঘোষণা করেন। কমিটিতে সভাপতি হিসেবে নাজিয়া ফেরদৌস ও সম্পাদক হিসেবে মো. মুনিরুজ্জামান উজ্জলের নাম ঘোষণা করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আনন্দনের সাবেক সভাপতি মিল্টন গাইন ও নির্বাহী সদস্য স্বরুপ দাশ। শুক্রবার আনন্দনের প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্যদের মিলনমেলার মাধ্যমে শেষ হয় এই বছরের আনন্দন উত্সব।
