দেশের অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে আইএমএফ। ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতিকে নাজুকদশায় উপনীত করছে। ইউরোপের মন্দা, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হ্রাসে এমনিতেই অর্থনীতি সংকটাপন্ন। সেখানে অর্থনীতিতে যে সহিংসতা পেয়ে বসেছে তাতে সামনে ভালো কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে জিএসপি সুবিধা বাতিল করার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় অর্থনীতি নিয়ে চিন্তারই কথা। তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ এবং রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। গার্মেন্টস সেক্টরের অনেক অর্ডার ইতিমধ্যে বাংলাদেশ হারিয়েছে। তার পরিমাণ প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে দেশের আরেকটি গতিশীল অর্থনীতি হলো প্রবাসী রেমিটেন্স। সেখানেও উল্লেখযোগ্য হারে জনশক্তি রফতানি করা সম্ভব হচ্ছে না। সেজন্য দেশের অর্থনীতি যেভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল তা কাঙ্ক্ষিত রূপ লাভ করতে পারেনি। দেশের রিজার্ভ ইতিমধ্যে ১৪ বিলিয়ন কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এসব দিয়ে অর্থনীতির সার্বিক চিত্র পরিমাপ করা যায় না। বিশেষ করে উত্পাদনখাত যদি কাঙ্ক্ষিতভাবে উত্পাদনে না যেতে পারে তাহলে জিডিপির সূচক লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে পারবে না। প্রবৃদ্ধি অর্জন ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও তাতে অনেক বেগ পেতে হবে। দেশের অর্থনীতিতে যদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে তাহলে তা হবে ভয়াবহ। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা যদি দীর্ঘমেয়াদি হয় তাহলে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। এক গার্মেন্টস সেক্টরই চল্লিশ লাখ লোকের কর্মসংস্থান করছে। এ খাতে নৈরাজ্য দেখা দিলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটবে। তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ না এলে নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা তৈরি হবে না।
এমনিতেই ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ব্যবসায়ীরা টাকা পাচ্ছে না মিল চালু করতে। সেখানে কর্মসংস্থানের ঘাটতি লক্ষণীয়। বিশ্বের মন্দা মোকাবেলা করেও যেভাবে দেশ অর্থনীতিতে শক্তিশালী হচ্ছিল তা ছিল আশাব্যাঞ্জক। সে পরিস্থিতি শুধু রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে আমাদের হারাতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি জিএসপি বাতিল করে দেয় তাহলে গার্মেন্টস সেক্টরে ধাক্কা লাগবে। সে পরিস্থিতি উত্তরণে নেই কোনো কূটনৈতিক শক্ত পদক্ষেপ। বিশ্বের অনেক বড় বড় ক্রেতা আমাদের ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। তার মধ্যে ওয়াল মার্টও রয়েছে। এখানেই অর্থনীতি নিয়ে ভাবনার বিষয়। হরতাল নৈরাজ্যে প্রতিদিন ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে থাকে। তার মধ্যে গার্মেন্টস সেক্টরেই ক্ষতির পরিমাণ তিনশ ষাট কোটি টাকা। একটি উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক কারণে যদি এতোটা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় তবে তার আর অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ থাকে না। এমনিতেই দেশের অবকাঠামোগত নানা সমস্যা উত্পাদন বিঘ্নিত করছে। সে কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। সামনে আরো রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে হচ্ছে। সে কারণে অথনৈতিক ধস ঠেকানোর লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে আরো পরিকল্পিত হতে হবে। নিতে হবে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
যে খাত নিয়ে আমাদের অর্থনীতি গতিশীল তা যেন কোনো কারণেই ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সেদিকে দৃষ্টি প্রসারিত করতে হবে বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টর এবং জনশক্তি খাত ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী রয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে তা সব সময় এমনই থাকবে। শুধু প্রবাসী রেমিটেন্সের ওপর ভরসা করলেই আমাদের চলবে না। কোনো কারণে যদি রেমিটেন্স পাঠানো বাধাগ্রস্ত হয় তাহলেই দেশের রিজার্ভ নেমে যাবে। অনিশ্চিত একটি খাতকে আমরা রিজার্ভের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে পারি না। তাই আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হলে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক কমিটমেন্ট। অসহিষ্ণু পরিস্থিতির মধ্যে অর্থনীতি এগোতে পারে না। দেশ বৈশ্বিক মন্দা যেভাবে সামাল দিয়েছে সে পরিস্থিতির আলোকে অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনে ফলপ্রসূ ভূমিকা গ্রহণ করে অর্থনৈতিক শঙ্কা থেকে বের হয়ে আসবে সেটাই প্রত্যাশা।
মুন্সীগঞ্জ
