বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণে আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৩, ২০:০৮
আমাদের দেশে বন্যপ্রাণী এবং পাখি শিকার ও নিধনের ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায় নানা ধরনের বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার বা নিধনের খবর। একশ্রেণির অসাধু, অর্থলোভী, অসচেতন ও ‘শিকারপ্রিয়’ লোক এসব বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার এবং নিধনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা না নেওয়াসহ এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে দেশে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকারসহ নিধনের ঘটনা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। অথচ বন্যপ্রাণী ও পাখি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অব্যাহতভাবে শিকার এবং নিধনের ঘটনা ঘটতে থাকলে তা আমাদের পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং এর কুফল আমাদেরই ভোগ করতে হবে। নির্বিচারে বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকারের ফলে আমাদের দেশ থেকে দ্রুত বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। Red Book of The Threatened Animals : IUCN-Bangladesh গ্রন্থে উল্লে¬খ করা হয়েছে যে বিগত শতাব্দীতে এদেশের বনাঞ্চল থেকে এক ডজনেরও বেশি প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এদের মধ্যে রয়েছে গোর, বসগোর, বুনো মহিষ, হগ ডিয়ার, নেকড়ে, খয়েরি মাথার ঘুঘু, মার্শ ক্রোকোডাইল, লজ্জাবতী বানর, হায়েনা, গন্ধগোকুল ইত্যাদি। এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৩৮৮ প্রজাতির দেশীয় পাখি রয়েছে। এছাড়াও প্রায় ২৪০ প্রজাতির অতিথি পাখি প্রতিবছর বাংলাদেশে আসে। কিন্তু বনভূমি উজাড়, জলাশয় ভরাট, নির্বিচারে পাখি শিকার এবং পরিবেশ দূষণের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় নানা জাতের পাখি যেমন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তেমনি অতিথি পাখিদের আগমনও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে। অথচ দেশীয় এবং অতিথি পাখি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বন্যপ্রাণী ও অতিথি পাখি সংরক্ষণের জন্য অনেক আগে থেকেই আইন রয়েছে। বৃটিশ আমলে এ সম্পর্কিত বেশকিছু বিশেষ আইন ও বিধিমালা ছিল, যার মাধ্যমে বন্যপ্রাণী, পাখি ও অন্যান্য প্রাণী সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ আইনগুলোর মধ্যে উল্লে¬খযোগ্য ছিল— Act for the Preservation of Wild Elephants, 1879; The Wild Birds and Animals Protection Act, 1912; The Bengal Rhinoceros Preservation Act, 1932 প্রভৃতি । এছাড়াও The Indian Forest Act, 1927-এর মাধ্যমে কোন কোন বনাঞ্চলে শিকার করা যাবে সেই সম্পর্কে বিস্তারিত বিধিবিধান করা হয়েছিল এবং সে অনুযায়ী সরকারকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সরকার বনভূমিসমূহকে দুই ভাগে ভাগ করেছিল। প্রথম শ্রেণির বনভূমিতে বন্যপ্রাণী ও পাখি ধরা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় শ্রেণির বনভূমিতে সীমিতভাবে সেই সকল ব্যক্তিকেই বন্যপ্রাণী শিকার ও পাখি ধরার অনুমতি দেওয়া হতো যাঁরা ১৯২৭ সালের ভারতীয় বন আইনের অধীনে বিভিন্ন শর্ত মেনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হতেন। এই আইনটি বাংলাদেশে The Forest Act, 1927 নামে কার্যকর আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ আইন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিশেষ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে Bangladesh Wildlife (Preservation) Act পাস করে। ১৯৭৪ সালে এ আইনের কিছু সংশোধন করা হয়। এ আইনের মোট ৪৭টি ধারা এবং তিনটি তফসিল রয়েছে। আইনটির মাধ্যমে Bangladesh Wildlife Advisory Board গঠনসহ ন্যাশনাল পার্ক ঘোষণা ও প্রাণী অভয়ারণ্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আইন লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা। ভ্রাম্যমাণ আদালত স্থাপন, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়দায়িত্বসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিভিন্ন বিধিবিধান বর্ণনা করা হয়েছে আইনটিতে। তফসিলগুলোতে এমনকিছু বন্যপ্রাণীর নাম উল্লে¬খ আছে, যেগুলো শিকার করতে সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে। আবার তফসিলে এমন কতিপয় প্রাণীর নাম আছে, যেগুলো কোনোভাবেই শিকার করা যাবে না। প্রথম তফসিলের দ্বিতীয় অংশে কতিপয় সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর নাম আছে যেমন: কোলা ব্যাঙ, সবুজ ব্যাঙ, হলুদ পাহাড়ি কাছিম, পিয়ং হাঁস, রাংগামুরি, রাজহাঁস, জলার চা পক্ষী, ডুবুরী, বন্য শূকর ইত্যাদি শিকার করতে সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে। কোনো বন্যপ্রাণীর বৃদ্ধি যদি সেই এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় হুমকি হিসেবে দেখা দেয় অথবা কোনো বন্যপ্রাণী যদি মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হয় যেমন মানুষখেকো বাঘ কিংবা বন্য খ্যাপা হাতি, তবে সেই ধরনের প্রাণী হত্যা করা যাবে। আইনের দ্বিতীয় তফসিলে কতিপয় প্রাণীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর চামড়া আইনগত সার্টিফিকেট ছাড়া কোনোভাবেই দখলে রাখা যাবে না। অর্থাত্ কোনো ব্যক্তি যদি সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া ঘরের শোভাবৃদ্ধি করার জন্য হরিণ বা বাঘের চামড়া দেয়ালে টাঙিয়ে রাখেন তবে তা বেআইনি হবে। তৃতীয় তফসিলে ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৬১ প্রজাতির পাখি এবং ৬৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর নাম উল্লে¬খ করা হয়েছে, যেগুলো সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং এগুলো কোনোভাবেই শিকার, হত্যা বা ধরা যাবে না। এ প্রাণীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাঘ, চিতাবাঘ, ভাল¬ুক, বনরুই, উল্লুক, লজ্জাবতী বানর, হাতি, হনুমান, চিত্রা হরিণ, মায়ামৃগ, কুমির, শকুন, বাজ, ধনেশ, মদনটাক, নীলকণ্ঠ, বেগুনি কবুতর, লাল ঘুঘু, ময়ুর, কোকিল ইত্যাদি। আইনটির ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সরকারের অনুমতি ছাড়া বন্যপ্রাণী আমদানি বা রপ্তানি করতে পারবে না। ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি পেশা বা ব্যবসা হিসাবে বন্যপ্রাণী ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না, করলে তার ছয় মাসের জেলসহ জরিমানা হবে। আবার কোনো ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র কিংবা ফাঁদ বা অন্য কোনো উপায়ে বন্যপ্রাণী শিকার করলে তার এক থেকে দুই বছরের জেলসহ জরিমানা হবে। পরিতাপের বিষয় এই যে, দেশে বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য আইন ও বিধি-বিধান থাকলেও সেগুলো পর্যাপ্ত লোকবল সংকট, তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবসহ নানা কারণে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে দিনে দিনে দেশে বন্যপ্রাণী এবং পাখি শিকার ও নিধনের ঘটনা বেড়েই চলেছে, যা ভবিষ্যতে আমাদের পরিবেশের জন্য এক অশনি সংকেতই বটে। এসব সমস্যা সমাধানে ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ জরুরিভিত্তিতে এসব বন্যপ্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। এজন্য সরকার, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সকলেরই দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন যেন বাংলার এই সবুজ প্রাকৃতিক ভূমি বন্যপ্রাণী ও অতিথি পাখিদের জন্য নিরাপদ অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ঢাকা