বঙ্গোপসাগরের বাঁশখালী-কুতুবদিয়া চ্যানেলের গভীর সাগর থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে আরো ১৮ জন জেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সদস্যরা ভাসমান এসব জেলেদের লাশ উদ্ধার করেন। গভীর সাগর থেকে উদ্ধার করা গলিত, অর্ধগলিত লাশগুলো গতকাল বিকেল ৫টার দিকে পেকুয়া উপজেলার মগনামা ঘাটের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন কোস্টগার্ড। এনিয়ে দু’দিনে ২১ জন মাঝি-মাল্লার লাশ উদ্ধার করা হল। ডাকাতির কবলে পড়া ৩৪ জেলের মধ্যে এখনো ১৩ জেলের কোন হদিস নেই। ধারণা করা হচ্ছে, তাদেরও হত্যা করে লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া দু’জনের মধ্যে জেলে কামাল উদ্দিন বাঁশখালী হাসপাতালে এবং জেলে আবুল কাসেম বড়ঘোনায় ও মাঝি নূর হোসেন শেখেরখীলের নিজ বাড়িতে চিকিত্সাধীন রয়েছেন।
কোস্টগার্ডের লে. কমান্ডার আতিকুর রহমান ও পিও মোহাম্মদ আলমগীর জানান, গতকাল মঙ্গলবার গভীর সাগর থেকে নৌবাহিনীর সহযোগিতায় আগের দিনের ৩টিসহ ২১ জেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশগুলো পেকুয়ার মগনামা ঘাটে প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। বাঁশখালী থানার ওসি কামরুল হাছান আরো ১৪ লাশ উদ্ধারের কথা স্বীকার করেন।
প্রশাসন ও উদ্ধার হওয়া জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায়, এক সপ্তাহ আগে ডাকাত ও নৌ-দস্যুদের কবলে পড়া ৩টি ফিশিং ট্রলারের মধ্যে সর্বমোট ৩৪ জন মাঝি-মাল্লা ছিল। গত ২৫ মার্চ সোমবার বাঁশখালী-কুতুবদিয়া চ্যানেলের গভীর সাগরে ৩টি ফিশিং ট্রলার ডাকাতি ও নৌ-দস্যুদের কবলে পড়ে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে বাঁশখালীর শেখেরখীলের আবুল হোসেনের মালিকানাধীন ফিশিং ট্রলারের মাঝি নূর হোসেন, জেলে কামাল উদ্দিন ও আবুল কাসেম সাগরে লাফিয়ে পড়ে। স্থানীয় জেলেরা তাদের জীবিত উদ্ধার করে কক্সবাজার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। বাঁশখালী হাসপাতালে চিকিত্সাধীন জেলে কামাল উদ্দিন জানান, তাদের ট্রলারটিতে সদস্য ছিল ১৩ জন। ডাকাতরা তাদের উপর হামলা ও গুলিবর্ষণ করলে মাঝি নূর হোসেন ও জেলে আবুল কাসেমসহ জেলে কামাল উদ্দিন জীবন বাঁচতে সাগরে লাফিয়ে পড়েন। তিনি জানান, তাদের ট্রলারের নিখোঁজ ১০ জনের মধ্যে সোমবার শেখেরখীলের নুরুল কাদেরের ছেলে নেজাম উদ্দিনের লাশ পাওয়া গেলেও বাকি ৯ জনের ভাগ্যে কি ঘটেছে তিনি বলতে পারেননি।
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১ কোটি দরিদ্র মানুষ সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব জেলেদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেয়ার জন্য কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীকে আরও ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। তিনি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এদিকে ডাকাতদের বেপরোয়া তত্পরতায় উত্তপ্ত সাগর। মাছ ধরার মৌসুমের শুরুতেই বেড়েছে ডাকাতি। জানমালের ভয়ে সাগরে ফিশিং বোট পাঠানো কমে গেছে। কর্ণফুলী নদীর ফিশারিঘাট এলাকায় হাজারো ফিশিং বোট নোঙর করে বসে রয়েছে। বোট মালিকরা জানান, ১০/১২টি গ্রুপ সাগরকে জিম্মি করে রেখেছে। কোস্টগার্ড ও পুলিশের কাছে এসব ডাকাতদের ব্যাপারে তথ্য থাকলেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন সাগরে মাছ ধরার ভরা মৌসুম। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরার মৌসুম। এ সময় সাগরও শান্ত থাকে। কিন্তু প্রকৃতি শান্ত থাকলেও ডাকাতরা সাগরকে উত্তপ্ত করে রেখেছে। জেলেরা মাছ ধরতে যেতে সাহস করছে না। ডাকাতির ভয়ে ৫/৬টি বোট একত্রে মাছ ধরতে যাচ্ছে। সূত্র জানায়, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, মহেষখালী ও বাঁশখালী নিয়ে গঠিত চারটি জোনে জেলেরা মাছ আহরণ করে। মাছ আহরণের এই চারটি জোন এখন ডাকাতদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্যে ডাকাতরা বোটসহ জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। বোট জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। অন্যথায় দরিদ্র জেলেদের মেরে সাগরে ফেলে দিচ্ছে। মাছ ধরার জালসহ বোট ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।
বোট মালিক সমিতির নেতারা জানান, ডাকাতদলগুলো সাগরে ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এদের টাকা না দিয়ে সাগরে মাছ ধরা যাচ্ছে না। এসব ডাকাত সর্দার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার শহরে বসেই সাগরে ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে বোট মালিকরা জানান। এছাড়া আরো ছোট ছোট কয়েকটি ডাকাতদের গ্রুপ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি নূর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, সাগরে মাছ ধরতে কেউ বোট পাঠাচ্ছে না। শতশত বোট ফিশারী ঘাটে নোঙর করে রয়েছে। অথচ এখন ভরা মৌসুম। জেলেদের প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ডাকাতরা বোটকে আটকে রেখে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছে। অন্যথায় ফেরত দিচ্ছে না। সমিতির যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী মাঝি বলেন, ‘বাঁশখালীর এক ডাকাত সর্দার চট্টগ্রাম শহরে বসে সাগরে ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রশাসনের সহযোগিতা পাচ্ছি না। বর্তমান সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করলে তিনি কোস্টগার্ডকে ব্যবস্থা নিতে লিখে দেন। কিন্তু কোন সুফল মিলছে না।’ বোট মালিক সাইদুর রহমান বলেন, ‘সাগরে একা যেতে কেউ সাহস পাচ্ছে না। কোস্টগার্ডের মামলা নেয়ার ক্ষমতা নেই। তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিলে ডাকাতি অনেকাংশে কমে যেতো। এখন কোস্টগার্ড ডাকাতদের ধরে সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করে থাকে। দেখা যায় কয়েকদিনের মধ্যে তারা বেরিয়ে আসছে।’
বোট মালিকরা জানান, একটি বোট মাছ ধরতে সাগরে গেলে ফিরে আসতে ৭/৮ দিন সময় লাগে। এই সময়ের জন্য বোটের জ্বালানি তেল, বরফ, জেলেদের খাবার সামগ্রীসহ প্রায় পৌণে ২ লাখ টাকা খরচ হয়। আর একটি ফিশিং বোট তৈরি করতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচ হয়। অথচ গত ৪/৫ বছরে অসংখ্য ফিশিং বোট ডাকাতরা গায়েব করে ফেলেছে।
সন্দ্বীপ থেকে টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন পর্যাপ্ত এলাকা নিয়ে কোস্টগার্ডের পূর্ব জোন গঠিত। সাগরে জলদস্যুতা, চুরি, ডাকাতিসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কোস্টগার্ড ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। কিন্তু অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য তাদের পর্যাপ্ত জনবল, জাহাজ, স্পীডবোটের চরম সংকট রয়েছে।
রামগতি সংবাদদাতা জানান, বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলারসহ জলদস্যুদের কবলে পড়ে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন চর গজারিয়া এলাকার ৯ জেলে গত ৯ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ জেলেরা হচ্ছেন- মো. মহিউদ্দিন, মো. ফারুক, মো. ফজলুল হক, মো. আবু, মো. শাজাহান, হেলাল উদ্দিন, মাকসুদ, শাহাদাত হোসেন ও মো. ইদ্রিছ মাঝি। বাঁশখালী-কুতুবদিয়া চ্যানেলে গভীর সাগরে গত দু’ দিন ধরে ভাসমান জেলেদের লাশের মধ্যে তারাও রয়েছেন বলে এসব নিখোঁজ জেলের পরিবারের লোকজন ধারণা করছেন।
নিখোঁজ জেলে মো. মহিউদ্দিনের ভাই রামগতির চর আবদুল্যাহ (চর গজারিয়া-তেলিরচর) ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) মো. মনির উদ্দিন জানান, তার ভাই মহিউদ্দিনসহ রামগতির ওই ৯ জেলে চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকার আবদুর রহিম কোম্পানির ট্রলারে করে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে গত ২৬ মার্চ মঙ্গলবার জলদস্যুদের কবলে পড়েন। এর পর থেকে ট্রলারসহ তারা নিখোঁজ রয়েছেন।
