গ্রেফতারের পর তিন ব্লগার রিমান্ডে

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩১
মহানবী (স.) সম্পর্কে বিভিন্ন ব্লগ ও ওয়েবসাইটে কটূক্তি করার অভিযোগে তিন জন ব্লগারকে গত সোমবার রাতে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার আটক তিন ব্লগারকে ৭ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। গ্রেফতার-কৃত ব্লগাররা হলেন— মশিউর রহমান বিপ্লব (৪২), রাসেল পারভেজ (৩৬) ও সুব্রত অধিকারী শুভ (২৪)। ডিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃতরা ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলাম ও মহানবী (স.) এবং অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি, ব্যঙ্গচিত্র ও অশালীন বক্তব্য প্রচার করে জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে আসছেন। এদিকে গ্রেফতারকৃত ব্লগাদের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল এক ব্রিফিংয়ে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, গণজাগরণ মঞ্চ কারো রক্ত চক্ষুকে ভয় করে না। গতকাল দুপুরে মহানগর ডিবির পরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন গ্রেফতারকৃত তিন ব্লগারকে ঢাকার সিএমএম আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে মেট্টোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট মোহাম্মদ তারেক মঈনুল ইসলাম ভুঁইয়া প্রত্যেকের ৭ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, আসামিরা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের নাস্তিক ও প্রকৃতিবাদী এবং বিভিন্ন ব্লগে ছদ্মনাম ব্যবহার করে ইসলামসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। ডিবি জানিয়েছে, মশিউর রহমান বিপ্লবের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাখরনগরে। তার পিতার নাম সিদ্দিকুর রহমান। রাসেলের বাড়ি ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ডিস্টিলারি রোডে। তার পিতার নাম আব্দুল মতিন এবং সুব্রত অধিকারী শুভ’র বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার বাঞ্চনগরে। তার পিতার নাম সুরেশ অধিকারী। রাজধানীর পলাশী, ইন্দিরা রোড ও মনিপুরিপাড়া এলাকায় সোমবার রাতভর অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয় বলে এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আসামিদের গ্রেফতারের পর তাদের ব্যবহূত ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত মশিউর রহমান বিপ্লব ফেসবুকে আল্লামা ‘শয়তান’, সামহোয়ারইন ব্লগে ‘শয়তান’, নাগরিক ব্লগে শয়তান এবং আমার ব্লগে ‘নেমেসিস’ ছদ্মনামে লিখতেন। রাসেল পারভেজ আমার ব্লগে ‘রাসেল পারভেজ’, সামহোয়ারইন ব্লগে ‘রাসেল’ এবং ‘অপবাক’ ছদ্মনামে লিখতেন। আর সুব্রত শুভ সামহোয়ারইন ব্লগে ‘সাদা মুখোশ’, আমার ব্লগে ‘সুব্রত শুভ’, নাগরিক ব্লগে ‘আজাদ’, ইস্টেশন ব্লগে ‘লাল কসাই’ ছদ্মনামে লিখতেন বলেও ডিবি কর্মকর্তারা জানান। শুধু হজরত মুহম্মদকে (স.) নিয়েই নয়, তারা হিন্দু ধর্মের সাধক পুরুষ রামকৃষ্ণ সম্পর্কেও বিভিন্ন ব্লগ ও ওয়েবসাইটে কটূক্তি ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বলেও ব্রিফিংয়ে দাবি করেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মোল্লা নজরুল ইসলাম। জব্দকৃত ল্যাপটপ ও ডেস্কটপে পাওয়া তথ্যে মহানবী (স.) সম্পর্কে বিভিন্ন ব্লগ ও ওয়েবসাইটে কটূক্তি ও কুরুচিপূর্ণ লেখার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে মোল্লা নজরুল দাবি করলেও তা সাংবাদিকদের দেখাতে পারেননি। আটককৃতরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে পড়াশোনা করেছেন। তাদের মধ্যে সুব্রত শুভ বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী, রাসেল পারভেজ কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেন, আর মশিউর রহমান বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করা হয়েছে। অপরদিকে আটককৃতদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, হয়রানি করার জন্য পরিকল্পিতভাবে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। রাসেল পারভেজের বড় বোন এডভোকেট সনিয়া অভিযোগ করেন, আগামী ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলাম ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি দিয়েছে। সেখানে ব্লগার আর নাস্তিকদের নিষিদ্ধ করার দাবি করেছে তারা । ব্লগারদের আটক দেখিয়ে তাই পুলিশ ও সরকার বোঝাতে চাইছে, তারা ব্লগারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছে। আটক সুব্রত শুভ’র এক নিকট-আত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুভ কখনও ধর্ম নিয়ে কোনো লেখা ব্লগে পোস্ট করতেন না। তাকে বলির পাঠা বানানোর চেষ্টা চলছে। গণজাগরণ মঞ্চ কারো রক্তচক্ষুকে ভয় করে না—ডা. ইমরান গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, গণজাগরণ মঞ্চ কারো রক্তচক্ষুকে ভয় করে না। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মঞ্চ তৈরি হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর গণজাগরণ মঞ্চ নির্ভর করেনি, করবেও না। কারো নির্দেশে এ মঞ্চ তার আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াবে না। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায় গণজাগরণ মঞ্চের মিডিয়া সেলের সামনে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. ইমরান বলেন, আমরা প্রথম থেকেই লক্ষ্য করে আসছি, ইন্টারনেট বা ব্লগ বিষয়ে সরকার যে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তার সবকটি সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়েছে এমনসব ব্যক্তিদের দ্বারা, যারা কোনোভাবেই ব্লগ বা ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচিত নন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন গ্রেফতারকৃত তিন ব্লগারের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বক্তারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শুভসহ ৩ জনকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ কাজ মুক্ত চিন্তা-চেতনার বিরোধিতায় সরকারের অবস্থানকেই প্রমাণ করে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের যে সকল সংগঠক তারা সকলেই মুক্ত-চিন্তা চেতনার অধিকারী। শুভ তাদেরই একজন। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন- বাংলা বিভাগের চেয়ারপারসন সিদ্দিকা মাহমুদা। একই দাবিতে গতকাল বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন করেছে জাতীয় স্বার্থে ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম। মানববন্ধনে সরকার ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে গিয়ে ভোটের রাজনীতি’ করছে বলে অভিযোগ করা হয়। মানববন্ধনে অংশ নেন ব্লগার পারভেজ আলম, বাকী বিল্লাহ, মাহবুব রশিদ প্রমুখ। এর আগে বিকাল চারটায় গ্রেফতার ব্লগারদের মুক্তি দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এক সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আমরা একটি ক্রান্তিলগ্ন অতিক্রম করছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্টদের শুরু করা আন্দোলনে সারা দেশের মানুষের মাঝে যে ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো, ৪২ বছরের কলঙ্কমোচনের সুযোগ তৈরি হয়েছিলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্জাগরণের পথ প্রশস্ত হয়েছিল নানামুখী প্রতিক্রিয়াশীল তত্পরতায় তা এখন শুধু বাধাগ্রস্তই হচ্ছে না বরং বিভিন্ন মহলের আক্রমণে এই ঐক্য ও চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ৩ জন ব্লগারকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। ডিবি পুলিশ গতরাতে (সোমবার) তাদের তুলে নিয়ে যায় এবং এই তিন ব্লগারের নিখোঁজ সংবাদ ছড়িয়ে যাওয়ার পরে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে আজ সকালে। ডিবি পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে তাদের হাজির করেছে দাগি আসামির মতো। ডিবি পুলিশ থেকে দাবি করা হচ্ছে তাদের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আটক করা হয়েছে। কিন্তু তারা কেউই পলাতক ছিলেন না যে তাদের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আটক করতে হবে। রাসেল পারভেজ প্রায় প্রতিদিনই শাহবাগে আসতেন আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত হতে। অন্য দুই ব্লগারও প্রথম থেকেই অনলাইনে এবং শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সক্রিয় ছিলেন। ফাহমিদুল হক বলেন, ডিবি পুলিশ দাবি করছে যে শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায় নাই। শুভকে সকাল বেলা গ্রেফতার করা হয়েছে দাবি করলেও আমরা জানি সোমবার রাত ১১টার সময় তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ফাহমিদুল হক বলেন, ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ‘ব্লগার রাজিব হত্যা এবং আসিফ মহিউদ্দীনের উপর হামলার ঘটনার পরে ডিবি পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ নাস্তিক ব্লগারদের উপর নজর রাখতে শুরু করে যার ধারাবাহিকতায় এই গ্রেফতার’। আমরা বলতে চাই যে এ ধরনের বক্তব্য একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে সারাদেশে ব্লগাররা মৌলবাদী সামপ্রদায়িক শক্তির হামলার শিকার হচ্ছে সেখানে ব্লগারদেরই গ্রেফতার করার এ ধরনের বক্তব্য হতাশাজনক। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, একদিকে মৌলবাদীরা ব্লগারদের টুকরো টুকরো করে হত্যা করার ঘোষণা দিচ্ছে, আরেকদিকে সরকার ব্লগারদের হয়রানি করতে, গ্রেফতার, সেন্সরশিপ ইত্যাদি ভূমিকা গ্রহণ করছে। সরকারের এই ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি হিসাবে পরিচিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের এই ভূমিকা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সাংবাদিক সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন ব্লগার আরিফ জেবতিক ও বাকী বিল্লাহ। সিপিবি তীব্র নিন্দা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এক বিবৃতিতে ৩ জন ব্লগারের গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। নেতৃবৃন্দ গ্রেফতারকৃত ব্লগারদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেন। গতকাল এক লিখিত বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, কোনো নাগরিকের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানাকে প্রশ্রয় দেয়া যায় না। কিন্তু একই সাথে দেশের জন্য বড় বিপদ হলো সাম্প্রদায়িকতা। সিপিবি নেতৃবৃন্দ বলেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে যারা পত্রিকায় মিথ্যা-বানোয়াট ছবি ও খবর প্রকাশ করে দেশব্যাপী প্রচার করেছে, তাদের গ্রেফতার করে শাস্তি বিধান করাটা সরকারের জরুরি কর্তব্য। যারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়, বসতবাড়ি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগিয়েছে, ভাংচুর করেছে, আঘাত হেনেছে, লুটপাট করেছে, তাদের শক্ত হাতে দমন করা সরকারের সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য।