জীবন বাজি রেখে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো ওরা। সমুদ্রই ছিল তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। অথচ জীবিকার তাগিদে ওই সমুদ্রে গিয়েই ডাকাতের গুলি আর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারাল বাঁশখালির শেখেরখীল এলাকার হতদরিদ্র ৩১ জেলে। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নার রোলে ভারি হয়ে উঠেছে বাঁশখালির উপকূলীয় টেকপাড়া, গুইল্লাখালি আর বড়ঘোনা জেলেপাড়ার পরিবেশ। উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে হতদরিদ্র এসব জেলে পরিবারে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ২১টি মৃতদেহ। সাগরে ভাসছে আরো ১০ জনের লাশ। তাদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী।
গতকাল বেলা ২টায় ট্রাকে করে ১৮টি লাশ গ্রামে আনার পর এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বুকফাটা আর্তনাদ করতে করতে প্রিয়জনের লাশ আনতে ট্রাকের পেছনে ছুটে যান পরিবারের সদস্যরা। তাদের পেছনে ছিলেন হাজার হাজার শোকবিহ্বল মানুষ। তারাও এসেছেন পরিচিতজনের মুখটি শেষবারের মতো দেখতে। পিতার লাশ নিতে পরিবারের সাথে ছুটে এসেছে ৭ বছর বয়সী সোহেল। তার বাবা আমীর হোসেনকে ডাকাতরা মেরে ফেলেছে। বাবা না থাকায় টাকা পয়সার অভাবে হয়তো তার স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ সংসারে মা আর চার ভাই-বোন ছাড়া আর কেউ নেই। টেকপাড়া গ্রামের শাকের উল্লাহকেও জলদস্যুরা হত্যা করে লাশ সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে। স্বামীর মৃত্যুতে দিশেহারা শাকের উল্লাহর স্ত্রী। তার ৫টি সন্তানের দায়িত্ব নেয়ার মতো কেউ নেই। বাপের বাড়িতেও আর কেউ বেঁচে নেই। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন, কার কাছে সাহায্য চাইবেন, কিছুই জানেন না তিনি। ডাকাতের হামলার সময় সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন নূর হোসেন মাঝি। সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়ার পরও ডাকাতরা তাকে লক্ষ্য করে ৭টি গুলি চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টা সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় থাকার পর অন্য একটি মাছ ধরার বোট তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার নিয়ে যায়। নূর হোসেন মাঝি জানালেন, চোখের সামনে বোটের অন্য জেলেদের গুলি খেয়ে মরতে দেখেছেন তিনি। সেই ভয়াবহ দৃশ্যের কথা কোনোদিনই ভুলে যাওয়ার মতো নয়। তবে তাকে গুলি করার আগেই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। ডাকাতের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার নজরুল মাঝির স্ত্রী মনোয়ারা জানালেন, তার সন্তান ৮টি। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আরো এক মেয়ের বিয়ের কথা চলছে। টেকপাড়া এলাকায় একটি বস্তি ঘরে মাসে ৫০০ টাকা ভাড়ায় থাকেন তারা। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে মেয়ের বিয়ে দূরে থাকুক ঘর ভাড়া দেয়ারও সঙ্গতি নেই তার। ফাঁড়ির মুখ এলাকায় ১৪ বছর বয়সী নাতী এনামুল হকের মৃতদেহের জন্য অপেক্ষা করছেন ৮০ বছরের বৃদ্ধ নানা মৌলবি আবদুর রহমান। জানালেন, ডাকাতের খপ্পরে পড়া বোটগুলোর একটিতে তার নাতীও ছিল। অনেকগুলো লাশ পাওয়া গেলেও তার নাতীর লাশের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।
বিকাল ৪টায় শেখেরখীল নতুন ব্রিজ সংলগ্ন মাঠে নিহতদের নামাজে জানাজায় ছিল শোকাতুর মানুষের ভিড়। নামাজ শুরুর আগে অনুষ্ঠিত শোকসভায় স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বাঁশখালিতে এর আগেও সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক জেলে। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে তারা বলেন, সমুদ্রে ডাকাতির সাথে জড়িতরা মুখচেনা। পুলিশ সচেষ্ট হলেই তাদের গ্রেফতার করতে পারে। জানাজার আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার পিছু ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়। স্থানীয় এমপি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী নিহতদের পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
