দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে। বিশ্বের যেসব বড় ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করেন তাদের প্রায় সবই ঢাকায় অফিস খুলেছেন। ক্রেতার পক্ষে ঢাকায় পোশাকের অর্ডারের তদারকি করেন তার একজন প্রতিনিধি। এছাড়া যারা সরাসরি পোশাক আমদানি করেন তাদের বাইরেও অনেকে এখানে বায়িং হাউস খুলে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু এসব অফিস এবং বায়িং হাউসের অধিকাংশই চালান বিদেশিরা। বাংলাদেশের সাথে কাজ করেন এমন ৬৪টি বৃহত্ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এদের শীর্ষ নির্বাহীদের ৫১ জনই বিদেশি নাগরিক। মূলত তাদের ওপর নির্ভর করে ক্রেতারা বাংলাদেশে অর্ডার দেবেন কিনা। এছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পখাতে এখন ১৮ হাজারেরও বেশি বিদেশি বিভিন্ন পদে কাজ করছে। এতে করে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে।
তবে রপ্তানিকারকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বয়স খুব বেশি নয়। অনেক উদ্যোক্তা বুঝে বা না বুঝে এ শিল্পে বিনিয়োগ করেছেন। নতুন নতুন মেশিনপত্র আসছে যেগুলো বিদেশি ছাড়া চালানো কল্পনাই করা যায় না। এজন্য বিদেশিদের নিয়ে আসতে হয়। তবে এখন কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের লোকজন এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি এবং বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদি বলেন, ‘আমাদের দেশে হঠাত্ করেই তৈরি পোশাক শিল্প খাত গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন মেশিন আসছে। এ খাতের কিছু কারিগরি দিক আছে যেগুলো আমাদের দেশের লোক দিয়ে করানো সম্ভব নয়। মার্চেন্ডাইজিং, ডিজাইন, নিত্য নতুন ফ্যাশন নিয়ে কাজ করতে হয়।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন শুধু ভারতীয় বা শ্রীলংকান নয়, অনেক ইউরোপীয়ও কাজ করছে।
এদিকে কোন বিদেশি ব্যক্তি যদি বাংলাদেশে কাজ করতে আসেন তাহলে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এক থেকে দুই বছরের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু কোন কোন বিদেশি এক বা দুই বছরের জন্য এখানে কাজ করতে এসে ১০ বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্পে কাজ করার নাম করে এসে কেউ কেউ এখানে অন্য কাজও করছে।
বিনিয়োগ বোর্ড থেকে যে ৬৪টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এবং বায়িং হাউসের তালিকা পাওয়া গেছে সেগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৫১টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীই বিদেশি। এদের অধিকাংশই ভারতীয় নাগরিক। কিছু আছে শ্রীলংকান। বাকিরা ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের। বিশ্বখ্যাত যেসব ব্রান্ডের বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রধান নির্বাহী বিদেশি তাদের মধ্যে গ্যাপ, সিয়ার্স, এইচ এন্ড এম, ওয়ালমার্ট, টার্গেট, সি এন্ড এ, টেসকো, মারুবেনি কর্পোরেশন, মার্কস এন্ড স্পেন্সার উল্লেখযোগ্য। জানা গেছে, তৈরি পোশাক শিল্পখাতের জন্য দক্ষ দেশীয় জনশক্তি গড়ে তুলতে না পারায় উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে বিদেশি কর্মকর্তাদের নিয়ে আসেন। এ বিষয়ে আব্দুস সালাম মুর্শেদি বলেন, দেশে এতবড় শিল্পখাত গড়ে উঠেছে কিন্তু দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠেনি। তিনি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল কোর্স চালুর পক্ষে মত দেন। তিনি জানান, বিজিএমইএ’র উদ্যোগে ইতিমধ্যে একটি ফ্যাশন ইন্সটিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। আরো দুই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কোর্স চালু করা হয়েছে। পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তি বের করতে পারলে বিদেশিদের আসা কমে যাবে বলে তিনি জানান।
এদিকে কয়েকজন উদ্যোক্তা অভিযোগ করে বলেছেন, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে যেসব ব্যক্তিকে শীর্ষ নির্বাহী করে পাঠান তাদের মর্জির ওপর কাজ পাওয়া নির্ভর করে। তাদের কথামতো না চললে নানা রকম ঝামেলা পোহাতে হয়। কথায় কথায় অর্ডার বাতিল করে দেন তারা। সামান্য ছুতো ধরে তৈরি পণ্য বাতিল করে দেন। এতে করে অনেক মাঝারি শিল্প বড় ক্ষতির সম্মুখীনও হয়েছে বলে তারা জানান।
