আসাদ চৌধুরী বাংলাদেশের কবিতায় একটি অনুপেক্ষণীয় স্বর; জন্ম ১৯৪৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বরিশালের উলানিয়া। ‘তবক দেওয়া পান’ দিয়ে তাঁর আবির্ভাব। কবিতার সমান্তরালে শিশুসাহিত্য ও অনুবাদেও সমান অবদান রেখেছেন, করেছেন বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনা। কর্মসূত্রে সুদীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন বাংলা একাডেমীতে; শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় পারদর্শী। ২০১৩ সালে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক; এ ছাড়া বাংলা একাডেমী পুরস্কারসহ উল্লেখযোগ্য প্রায় সকল পুরস্কার ও সম্মাননা আছে তাঁর শিল্পমূল্যের ঝুলিতে। আড্ডাবাজ-প্রাণখোলা এই কবির সঙ্গে কথা বলেছেন রাহেল রাজিব
সময়ের সঙ্গে কবিতার এই বসবাস। স্মৃতিময় কিছু ঘটনার কথা শুনতে চাই।
স্মৃতিময় অনেক ঘটনাই তো ঘটেছে। কবিতার সঙ্গে বসবাসের কথা বললে, আসলে কবিতার সঙ্গে এই বসবাসের ব্যাপারটা শৈশবেই গেরো হয়ে গেঁথে গেছে। আমার শৈশব-কৈশোরের এত ঘটনা যে, বলে শেষ হবে না। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে বেশকিছু ঘটনার কথা। আমি তখন পঞ্চম কি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। রবীন্দ্রনাথের ছুটি কবিতাটি পড়ে মনে গেঁথে যায়। সম্ভবত, মুক্তজীবনের একটা স্বাদ পেয়েছিলাম কবিতাটি পড়ে। কারণ, এরপর আমার জীবনে অনেক পরিবর্তন আসে। আমি বইমুখী হয়ে পড়ি। বাড়িতে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ছিল। কিন্তু এর প্রতি আগ্রহ জন্মে এই ঘটনার পর। এরপর সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’, নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘বিষের বাঁশী’ পড়া হয়ে যায়। প্রথমটা বাড়িতেই ছিল। নজরুলের বই দুটো দিয়েছিলেন আমার বাবার এক কমিউনিস্ট বন্ধু। তিনি খবরের কাগজে মুড়ে দিয়েছিলেন; কারণ আমি ছিলাম মাদ্রাসার ছাত্র। সময়টাও ছিল উত্তাল। এরপর আরও অনেক বই হুড়মুড়িয়ে পড়ে ফেলি—সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’, সুভাষের কবিতা—যদিও সেসব কবিতার মানে সেভাবে বুঝিনি। তবে একটা আলোড়ন তৈরি হয়েছিল মনের ভেতরে। এরপর কবিতা নিয়ে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যা এখনো আমাকে নাড়া দেয়। তখন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেব দেব প্রায়, হাতে পেলাম জীবনানন্দের কবিতার একটি সংকলন। তার পেছনে কবির ছবি দেওয়া! কবি বলতে রবীন্দ্র-নজরুলের ছবিই এত দিন মাথায় ছিল, এই ছবি আমাকে পাল্টে দিল। এ রকম সাধারণ চেহারা নিয়েও কবিতা লেখা যায়, কবি হওয়া যায়—এ রকম একটা ধারণা নিজের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। এরই মধ্যে নিজের টেবিলে খাতায় আঁকিবুকির ছলে কিছু লাইনও লেখা হয়ে গেছে। কবিতার সঙ্গে বসবাসের সূত্রপাত বলতে গেলে এখান থেকেই। এরপর ঢাকায় এলাম। আড্ডা, ঘোরাফেরা, বাংলা একাডেমীতে চাকরি। একটা ঘোরের জীবন—কবিতামাখা জীবন।
কবিতার কাছে নতজানু হয়ে লেখা শুরু করেছিলেন। প্রথম কাব্য ‘তবক দেওয়া পান’ প্রকাশিত হওয়ার পর বোদ্ধামহলে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন। অনেক আলোচনা-সমালোচনাও হয়েছে। এই অভিজ্ঞতার কথা শুনতে চাই।
কবিতা তো ঔরসজাত নয়, গর্ভজাত। গদ্যের বই অনেকটা ঔরসজাত সন্তানের মতো। খুব বুক ফুলিয়ে বলবার মতো আর কী। কিন্তু মায়ের কাছে নাড়িছেঁড়া ধন মানে পৃথিবীর সকল মায়ার আধার। প্রথম কাব্যের ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা বলতে ঠিক এ রকম। প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক শুভাশিস যেমন পেয়েছি, ঠিক বিপরীতে সমান সমালোচনাও পেয়েছি। তবে অভিজ্ঞতার ফেরে সুখস্মৃতিই বেশি নাড়া দেয়। আমাদের হারানো ঐতিহ্য লোকজ জীবনকে পেয়ে অনেকেই বলেছেন, লিখেছেন। আমি কৃতজ্ঞ।
কবিতার সমান্তরালে অনুবাদে ঝুঁকলেন কেন?
অনুবাদ আমাকে স্বস্তি দেয়। এখনো আমি প্রচুর অনুবাদ করার চেষ্টা করি। সময় পেলেই করি। লেখার ফাঁকে এই অনুবাদ আমার একটা খেলার মতো। অন্য ভাষার প্রতি আগ্রহ আমার বরাবর একটু বেশি। ইংরেজি থেকে কিংবা উর্দু থেকে অনুবাদের চেষ্টা করেছি। বিনীতভাবে স্বীকার করছি, আমি ভাষাবিদ নই, ভাষা-পণ্ডিতও নই। তবে কবিতা পড়ে ও অভিধানের সহায়তায় যতটুকু পেরেছি অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়সহ অনেকের অনুবাদ করার প্রেরণাও ভেতরে কাজ করেছে। এর একটা বড় কারণ অন্য ভাষার সাহিত্যের প্রতি আমার অমোঘ আকর্ষণ। সময় ও সামর্থ্য থাকলে হয়তো আরও ভাষা শিখতাম। আরও অনুবাদ করতাম। প্রতিটি লেখকের একাধিক ভাষা জানা থাকা ভালো। অনুবাদের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের মধ্যে যে যোগসূত্র স্থাপিত হয়, তা প্রজন্মান্তরে পাঠকের খোরাক জোগায়। আদান-প্রদানের এই রীতি উভয় ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে।
কবিতা ও কথায় আপনাকে নাড়া দেয়, রেখাপাত করে কিংবা প্রভাবিত করে কারা?
রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ। এই দ্যাখো, সিথানে ‘গীতবিতান’—আমার সবকিছু! আমি ঢাকার বাইরে কোথাও গেলে ‘গীতবিতান’ সঙ্গে থাকে। ‘গীতবিতান’ থেকে আমি বাঁচার প্রেরণা পাই। প্রতিনিয়ত ‘গীতবিতান’ আমাকে শেখায়, চালায়, জ্বালায়, পোড়ায়, শান্তি দেয়, স্বস্তি দেয়। অন্যদিকে জীবননান্দ পড়ে জীবনের নিত্যনতুন অর্থ পাই। এখন এই ৭৩ বছর বয়সে এসেও জীবনানন্দ পড়ে পুলকিত হই, শিহরিত হই।
আপনার অখণ্ড এই অবসরে প্রীতিময় স্মৃতিগুলোকে নতুন করে রং দেওয়ার ইচ্ছে জাগে কি?
আমি মনে করি আমার কোনো অবসর নেই। আমি আমার কাজের মধ্যে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমি প্রতিদিন পড়ার মধ্যে ডুবে থাকি। এটা ছাড়া আমি কিছু করতেও পারি না। তরুণদের লেখাও পড়ি নিয়মিত। তাদের দ্বারাও প্রভাবিত হই। তবে আক্ষেপের জায়গাও কম নয়। অনেকেই খুব ভালো লিখছে। কোনো কোনো তরুণদের কবিতার ক্ষেত্রে দেখি কবিতার কোলাজ তৈরিতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। তারা বিষণ্নতা-নিঃসঙ্গতাকে ধরতে পারছে না; ফলে পাঠকও বুঝে উঠতে পারছে না। কয়েকটা লাইন শুধু রেখাপাত করলে হবে না। পুরো বিষয়টাকে একত্র করে কিংবা দু-তিনটি চিত্রকল্পকে একত্র করে যদি একটি কোলাজ তৈরি না হয়, তাহলে কবিতা দাঁড়াবে কী করে! অতীতকে রং দেওয়ার ইচ্ছে নেই। যা পার হয়ে গেছে, তার জন্য আমার কোনো আক্ষেপ নেই। জীবনটা আমার কাছে নদীর মতো। আমি বরিশালের মানুষ, জলের ওপরেই আমাদের জীবন কেটেছে। ঢাকায় এই যন্ত্রণাময় শহরের স্মৃতিও বড় তরল। তাই জলকে যেমন হাতের তালুতে ধরতে পারি না, ফেলে আসা জীবনকেও ধরে রাখতে চাই না। জীবন ওর নিজের গতিতেই চলুক। তবে কখনো কখনো স্মৃতি বড় পীড়াদায়ক। তখন রং লাগাতে ইচ্ছে হয় বইকি!
দীর্ঘ পথচলায় কথাসাহিত্যে হাত দেওয়ার আগ্রহ জন্মেনি?
আমাদের বেড়ে ওঠা এমন একটা সময়ে, বর্তমানের অনেকে সেটাকে মেলাতে পারবে না। আমরা বেড়ে উঠেছি বাংলাদেশের সঙ্গে। সাতচল্লিশের পরে আমরা যারা বেড়ে উঠেছি, তারা এককথায় ইতিহাসের সমবয়সী। কারণ, সাতচল্লিশের পর থেকে আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের শৈশব-কৈশোরের সংযোগ; যৌবনে যুক্ত হলো মুক্তিযুদ্ধ। ফলে এই বিশাল ভূ-খণ্ডের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিচয়ের সঙ্গে আমাদের বেড়ে ওঠার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। আমি, ইলিয়াস (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস), মান্নান (আবদুল মান্নান সৈয়দ), দুই রফিক (রফিক আজাদ ও মোহাম্মদ রফিক) মিলে যৌবনের প্রথমভাগে যখন তুমুল আড্ডা দিয়েছি, অন্যরাও থাকত, অনেকের কাছে আড্ডা দিতেও যেতাম, তখন নানা প্রসঙ্গ আসত। মান্নান ও ইলিয়াস গদ্যে হাত মকশ করল; আমরা কবিতায়। আশ্চর্য বিষয়, আমরা তিনজনই সে অর্থে গদ্যে হাত দিইনি। এর একটা বড় কারণ আছে, ইলিয়াস ও মান্নানের গদ্যে এক শক্তি আছে। আমরা তাঁর বন্ধু ও গুণমুগ্ধ পাঠকও বলা চলে। বুদ্ধদেব বসুর গদ্য তখন আমাদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর ভূমিকা, শার্ল বোদলেয়ার ও তাঁর কবিতার ভূমিকা আমাদের চরমভাবে প্রভাবিত করেছে—বড় করে বললে We belongs to his school। এটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও সত্য। তাঁদের গদ্য পড়ে আমাদের ভেতরে গদ্যের দেবতা সেভাবে চড়াও হয়নি। কিন্তু ইলিয়াস ও মান্নান গদ্য নিয়ে খেলতে খুব ভালোবাসত। তাদের একাগ্রতা ও নিষ্ঠার কথাও ভোলবার নয়। গদ্য নিয়ে ইলিয়াসের সঙ্গে একটা অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছে। ’৭৭-’৭৮ সালের দিকের ঘটনা, ‘আমি আর ইলিয়াস রিকশায় ফিরছি নিউমার্কেট এলাকা থেকে। কথায় কথায় ইলিয়াস ওর একটা গল্পের প্রসঙ্গ নিয়ে বলছিল, দোস্ত, আমি চরিত্রগুলোকে ম্যানেজ করতে পারছি না, গল্পটাও শেষ করতে পারছি না আর টানতেও পারছি না। যেভাবে চাইছি সেভাবে আসছেও না। কী করা যায়!’ কথাগুলো বলার সময় ও কাঁপছিল। আমি ওর কথা শেষ না হতেই বলেছিলাম, তুমি না পারলে আর কেউ পারবে না। আমার কথা শুনে ইলিয়াস কোনো কিছু না বলে রিকশা থেকে নেমে গিয়েছিল। আমাদের বোঝাপড়াটা এমন ছিল। গদ্যের ক্ষেত্রেও জীবনের ক্ষেত্রেও।
আপনার পাঠ-অভিজ্ঞতা কি কখনো আপনার লেখায় বিশেষ প্রভাব রেখেছে?
সুনীলের ‘মায়াকানন’-এ ক্রিয়াপদের ব্যবহার কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এ ছাড়া ওর ‘রাধাকৃষ্ণ’-তে বৈষ্ণব কবিতার ঢঙকে সে নতুন রূপ দিতে পেরেছিল। সুনীলের পড়াশোনার ব্যাপকতায় বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। বিভিন্ন ভাষার কবিতা অনুবাদে তার দেওয়া নোটস সহজেই পাঠককে লেখার সঙ্গে যুক্ত করে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘দশমী’ পড়ে খুব আলোড়িত হয়েছি। প্রত্যেক লেখকের একাধিক ভাষা জানাটা খুব জরুরি। বিভিন্ন ভাষার অব্যয় ও ক্রিয়াপদের ব্যবহার জানা উচিত। কারণ অব্যয় ও ক্রিয়াপদের স্থানান্তরে বাক্যের অর্থ বদলে যায়। বাক্য নিয়ে এই খেলা বুদ্ধদেব করেছেন; সুধীন দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী, অরুণ মিত্র, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুনীল, শক্তিও করেছেন। অন্য ভাষা জানা থাকলে অনুবাদ করতে সুবিধে হয়। বাংলা ভাষায় প্রচুর অনুবাদ হওয়া উচিত। তাহলে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের পরিধি সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। আহসান আহমেদ আশক একজন উর্দু কবি। তাঁর কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে তাঁর আইডেনটিটি ক্রাইসিস আবিষ্কার করি, ‘জন্মভূমি সকলের স্বদেশ হয় না/ জন্মভূমি কারও গায়ের গেঞ্জি-মোজা নয়/ খুলে ফেললাম আর পাল্টে গেল।’ তিনি নিজেকে এই ভূ-খণ্ডের মনে করতেন। নিজেকে তিনি ‘বাংলাদেশের মশরুর কবি’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। ১৯৬৫ সালে ‘জাকতে জজিরে’ বাংলায় ‘নতুন চর’ শিরোনামে তাঁর কাব্য প্রকাশিত হয়েছিল।
আপনাদের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা কীভাবে আপনাদের লেখাকে ঋদ্ধ করেছে?
শৈশব গ্রামে কেটেছে বেশির ভাগ। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া গ্রাম। বাবার কর্মসূত্রে ঢাকায় থাকা হয়েছে। সদরঘাটে নৌকার মধ্যে ছিলাম প্রায় একমাস। সে এক বিশাল অভিজ্ঞতা! ঢাকাকে আমাদের প্রজন্ম বেড়ে উঠতে দেখেছে। উলানিয়র সাত মাইল অদূরে পালকি চড়ে গিয়েছি। নদীতে মাছ ধরেছি, ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় আমি ও সিডনি (অভিনেতা আলী আহসান সিডনি) গামছা দিয়ে মাছ ধরেছি। নদীভাঙনে এটি এখন ঘরের দোরগোড়ায়, নদী আশীর্বাদ হলেও, নদীভাঙন অভিশাপ। নদী আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করেছে, প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিপরীতে এখন আমরা নদীশাসন করার চেষ্টা করছি। ফলে নদীগুলো মরে যাচ্ছে, প্রকৃতি পাল্টে যাচ্ছে। আমরা সাম্প্রদায়িকতা দেখেছি, গণতন্ত্র দেখেছি, বুট ও বেয়োনটের শাসনও দেখেছি। এভাবে শৈশব-কৈশোরের এক বহুমুখী ধারা আমাদের জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। ঢাকাকে পাওয়া যাবে আমাদের সকল লেখকের লেখায়। প্রত্যেক লেখকের নিজ নিজ অঞ্চলকেও পাওয়া যাবে খুব সচেতনভাবেই।
আপনারা যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেছেন। মা-বাবা আপনাদের পঠন-পাঠনের বিষয়ে কি খেয়াল করতেন? না কি দুরন্তপনার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠেছেন? বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
বাবা-মা সেভাবে সিরিয়াস ছিলেন না আমাদের বেড়ে ওঠায়। বলা ভালো উন্মুক্তভাবেই আমরা বেড়ে উঠেছি। একটা ঘটনার কথা বলি। তখন আমি ক্লাস টুতে পড়ি, ঘরে মেহমান এসেছে। মা হাতে পয়সা গুঁজে দিয়ে নিমকি-মিষ্টি কিনে আনতে বললেন। আমাদের এলাকার বাজারে কাঁলাচাদ গন্ধবণিক ও সীতারাম মিষ্টান্ন ভান্ডার খুব বিখ্যাত ছিল। মিষ্টি কিনে ফিরছি গলির ভেতর দিয়ে। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল, ভিজে যাচ্ছিলাম। আমপট্টি বলে একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে ভিজছি। হঠাত্ এক মেয়ে আমার হাত ধরে একটা ঘরে টেনে নিয়ে গেল। আমার মা-বাবাকে গালি দিল—কেন একা এভাবে বাজারে পাঠিয়েছে। মেয়েটি আমার ভেজা হাত-পা-মাথা মুছে দিল। আমাকে মুড়ি খেতে দিল। ফেরার সময় আমার গাল টিপে দিয়ে বলেছিলেন, তোর বাপকে পাঠিয়ে দিস! পরে জেনেছি ওটা খারাপ জায়গা। কিন্তু আমার পাওয়া ওই স্নেহের কারণেই হোক কিংবা উন্মুক্ত জীবনের কারণেই হোক সেই বয়সেই বুঝেছি—কোনো মানুষই খারাপ নয়। তাই কোনো মেয়েকে খারাপ ভাবতে পারিনি। আমার অনেক লেখার মধ্যে এর কথা আছেও। আমরা তো শরত্চন্দ্রের হাতে মানুষ; নারীর সম্মানটা ওখান থেকেই শেখা।
আপনাদের যৌবনকালে সমগ্র পৃথিবীই উত্তাল—দেশভাগ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ-পাকিস্তান শাসনের মিশেল। একটা ভঙ্গুর ও অস্থির সময়। সচেতনভাবে আপনার লেখায় এসব আনার কথা কি কখনো ভেবেছেন?
হ্যাঁ, কখনো কখনো তো সচেতনভাবেও এসেছে। আমরা যারা ছিন্নমূল সময়ের মানুষ, তাদের আলাদা করে কোনো ছকে ফেলাবার ইচ্ছে আমার কখনোই ছিল না। আন্তর্জাতিকতার ভেতর দিয়ে আমরা এখন চলছি। কিন্তু এর ধারাবাহিকতা খুঁজতে গেলে হাজার বছর আগেও যাওয়া যায়। তুমি যাবে কি না—এটা তোমার ব্যাপার। আমরা যারা লিখি, তারা খুঁজতে যাই। এটা তুমিও বোঝো। তুমি নিজেও কবি। তোমার ভেতরে এটা কাজ করে থাকবে। মানুষের ভেতরে যে দরদ, তা এই ভূ-খণ্ডের মানুষের মধ্যে প্রবল। ব্রিটিশরা এই বিষয়টি অনুধাবন করেছিল। মুসলমানরা তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল, ফলে তাদের মধ্যে বিরোধের বীজ বুনে দেওয়া খুব সহজ, তারা সেটাই করেছে। আমরা তার ভুক্তভোগী। কারণ, আমরা নিজেদের বিভাজন চেয়েছি, দু-পক্ষই কোনো না কোনোভাবে দ্বিজাতিতত্ত্বকে সমর্থন দিয়েছি। মাঝে সুবিধা আদায় করল ব্রিটিশরা, এর মধ্যে আবার পূর্ব বাংলার মানুষরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়ে গেছি। আমাদের জোড়া হলো পাকিস্তানের সঙ্গে। কী অদ্ভুত নৃশংস এক সিদ্ধান্ত! আমরা এই যাঁতাকলে পড়লাম। ফলটা কদিন পরেই পেলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এর কিছুটা দেখে গেছেন, এই বিষয়ে ‘প্রবাসী’ সম্পাদকের সঙ্গে তাঁর বিরোধও লেগেছে। সুভাষ বসুও এই বিষয় নিয়ে লিখেছেন। দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী হওয়াটা চরম ভুল ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল।
রাজনৈতিক ভুলের মতো বাংলা কবিতার ধারায় ত্রিশের ধারাটি কি আমাদের বিভ্রান্ত করেনি? শেকড়সন্ধানী বাংলা কবিতা মধ্যযুগের লোকজ ও মিথগত না হয়ে পাশ্চাত্য ধারায় চলে গেল—এটা কি ভুল পথে চলা নয়!
মূলধারার সাহিত্য খুব দ্রুত প্রভাবিত হয়। এখনো দেখলে সেই বিষয়টিই স্পষ্ট দেখতে পাবে। বিশ্বের কোনো একটি ঘটনা খুব সহজেই আমাদের লেখায় প্রভাব ফেলছে। কারণ যোগাযোগ। আমাদের ত্রিশের দশক উল্টোপথে হেঁটেছে, আমি বলব না। বরং তারা একটি বিশেষ পথে হেঁটেছে। মূল পথটা সবসময়ই ঠিক থাকে। মহুয়া-মলুয়া নিয়ে অবন ঠাকুর কাজ করেছেন; ভারতীয় চিত্রকলায় আত্মাটা আবিষ্কার করেছেন। জসীমউদ্দীনের ভেতরে একটা গ্রাম বাস করত। পাঁচের দশকের কবিদের মধ্যে একধরনের গীতলতা ছিল। হাসান হাফিজুর রহমান, সিকানদার আবু জাফর, আবদুল গণি হাজারী থেকে শুরু করে অনেকের লেখায় এই ধারাটি স্পষ্ট এবং এ কারণেই সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে এই বাংলার কবিতাকে আমরা আলাদা করতে পারি খুব সহজেই। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আমাদের আলাদা করেছে পৃথিবীর সব ভাষা থেকে। আমাদের এই অভিজ্ঞতা অন্য কোনো ভাষা-ভাষীদের নেই। ফলে আমাদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ আর নেই। আমরা নিজেদের শেকড় চিনে নিয়েছি রবীন্দ্রনাথ-নজরুলসহ সকল লেখকের হাত ধরে।
আপনার কবিতায় মধ্যপ্রাচ্যীয় মিথের ব্যবহার নিয়ে অনেকে সমালোচনা করে থাকেন, এ ছাড়া লোকজ জীবনের ব্যবহার নিয়ে অনেকে সমালোচনা করে থাকেন—এই বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
দ্যাখো, আমাদের এখানের মানুষের একধরনের সংকীর্ণতা সবসময়ই কাজ করে। মাঝে একবার বললাম না, মুসলমানরা রক্ষণশীল—সে জায়গা থেকেই এর উত্তর পেয়ে যাবে। মধুসূদন ভারতীয় মিথ নিয়ে প্রচুর লিখেছেন, তাঁকে কিন্তু আমরা সেই কাতারে ফেলি না, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, পঞ্চকবি, পঞ্চপাণ্ডবরা মিথের প্রচুর ব্যবহার করেছেন। তাতেও সমস্যা নেই। আমাদের এখানে এখনো কেউ মধ্যপ্রাচ্যীয় মিথ নিয়ে লিখলে বা কাজ করলে বাঁকা দৃষ্টিতে পড়তে হয়—এটা আমাদেরই সংকীর্ণতা। আমাদের সাহিত্যে সমগ্র পৃথিবীর সকল বিষয় অনুষঙ্গ হিসেবে আসতে পারে—এটা আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের গ্রহণ ক্ষমতা ও একধরনের অভিযোজন ও অভিবাসনক্ষমতাও বলতে পারো। সেই দিকটিকে কেউ বিচার করার চেষ্টা করেন না। করলে ভালো হতো। আমাদের সাহিত্যে চীনা মিথের ব্যবহার নেই, কিন্তু বলা হয়ে থাকে কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এ প্রাচীন চীনা কাব্যের প্রভাব আছে। এটা শিল্পের বিশেষ মাত্রা। এটাকে গ্রহণ করার বৈশ্বিক মানসিকতা থাকতে হবে। অন্য ভাষার লেখা ও ইতিহাস জানতে হবে। জানলে বরং আমাদের ভাষা ও সাহিত্য সমৃদ্ধ হবে। লোকজ ও গ্রামীণ জীবনের বিষয়ে একটা প্রসঙ্গ মনে এল। মোহিতলাল মজুমদার জসীমউদ্দীনের ‘ধানক্ষেত’ কাব্যকে ‘ধানখেত’ বলে ব্যঙ্গ করতেন। তিনি জসীমউদ্দীনকে আধুনিক মানতে চাইতেন না, গেঁয়োদের কবি বলে বিদ্রূপ করতেন। আবদুর রাজ্জাক স্যার খুব কাঠখোট্টা ও ঠোঁটকাটা মানুষ ছিলেন। তিনি এর জবাব দিয়েছিলেন এ রকম, ‘আপনাকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে চার লাইন লেখা হলে, জসীমকে নিয়ে চারপাতা লেখা হবে।’ আবদুর রাজ্জাক স্যারের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। মোহিতলালের লেখা কজন পড়ে! জসীমউদ্দীন এখনো সমানভাবে বর্তমান।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস অনেক বেশি রূঢ়। হাজার বছর ধরেই এর ধারা নৃশংস। বর্তমানেও দেশে মৌলবাদী শক্তির ঔদ্ধত্য ও উচ্ছৃঙ্খলতা চরম পর্যায়ে, সামরিক শাসনের বুট ও বেয়োনেটের খবরদারিও আমরা দেখেছি, গণতান্ত্রিক দলগুলোর মধ্যেও লেজুড়বৃত্তি মানসিকতা—এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী হতে পারে?
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমাদের জাতিতত্ত্বকে ব্যবহার করেছে, টিকতে পারেনি। পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আক্রমণ করেছে, টিকতে পারেনি। সামরিক সরকার আমাদের প্রগতিশীল চেতনাকে আঘাত করেছে, টিকতে পারেনি। মৌলবাদের উত্থানের পেছনে এদেরই অবদান কমবেশি সবার। এরাও টিকতে পারবে না। এ কারণেই তরুণ সমাজ জেগেছে। শাহবাগের জাগরণ শুধু কয়েকদিনের উন্মাদনা নয়। চার দশকের সুদীর্ঘ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এটি। মৌলবাদ কখনোই এই বাংলায় ঠাঁই পায়নি, পাবেও না। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির জন্য দায়ী অনেকটা সাধারণ জনগণ—আমরা কেন খুনি, দুর্নীতিবাজদের ভোট দেব! প্রান্তিক জায়গা থেকে যাঁরা রাজনীতি করছেন এবং নেতৃত্বপর্যায়ে আসছেন তাঁদের আমরা রক্ষা করতে পারিনি। এই ব্যর্থতার দায় আমাদের সকলের। আমাদের প্রকৃত নেতাদের সবসময় ব্রুটালি খুন করা হয়েছে, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, জেলখানায় চার নেতাকে খুন করা হয়েছে, সর্বশেষ আহসান উল্লাহ মাস্টারকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। এঁরা গণমানুষের রাজনীতি করেছেন, গণমানুষের কথা বলেছেন, তাই তাঁদের জীবন দিতে হয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই নেতাদের আমরা রক্ষা করতে পারিনি। রাজনীতির চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি আমাদের এখানে সক্রিয়, মৌলবাদী শক্তি সবসময় পাকিস্তানি মনোভাব ব্যক্ত করেছে। শাহবাগ আমাদের সবার কথা বলছে, কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক দলগুলোও লেজুড়বৃত্তি করছে। তাদের ভুল রাজনীতির খেসারত দিতে হবে। মনে রাখা উচিত, শাহবাগের তরুণরা জাতির অন্তরের কথাই বলছে।
নিজের মূল্যায়ন করতে বললে কীভাবে করবেন?
আমি অল্পে প্রভাবিত হই, সহজে প্রসারিত হই।
