হাওয়ার দুপুর উড়ে যায় পালে পালে, দূরে দিগন্তে, আকাশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে একরাশ নীল। বিকেলের লাল সূর্য আলো ছড়ায় নদীর জল আর সবুজ প্রান্তরে। অলকেশ ঘোষ নিসর্গ আঁকেন। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে জামালপুরের নদ-নদীবিধৌত গ্রামে। সেখানকার তামাটে মুখের মানুষ তাঁর চোখে লেগে আছে। পরবর্তীকালে বাংলার প্রকৃতি—নদ-নদী, নগরের কোলাহল, সব বাস্তবধর্মী অংকনরীতিতে ক্যানভাস সাজান অলকেশ ঘোষ। গত ২৯ মার্চ ঢাকা আর্ট সেন্টারে শুরু হওয়া তাঁর একক প্রদর্শনীতে কাজের সংখ্যা ১৪৭টি। প্রতিকৃতি চিত্রে দক্ষ অলকেশ ঘোষ কাগজে পেন্সিল, চারকোলে, জলরঙের ব্যবহারে বাস্তবধর্মী প্রতিকৃতি এঁকেছেন। কালি, কলম পেন্সিলের রেখাচিত্র এঁকেছেন ৩২টি। কোনো কোনো কাজে শুধু রেখার ব্যবহার আর কোনো কোনো কাজে আলো-ছায়ার ব্যবহার করেছেন। গত চার দশকের শিল্পকর্ম চর্চায় শিল্পী অলকেশ একক প্রদর্শনী করেছেন দুটি। এ প্রসঙ্গে অলকেশ ঘোষ বলেন, আবেদিন স্যারের একটা কথা খুব মনে পড়ে। তিনি বলতেন, কিবরিয়ার মতো তুমি মুখচোরা হয়ো না। শিল্পী অলকেশ ঘোষ নিজেকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন। শিল্পকর্ম নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হওয়া তাঁর অভ্যাসে নেই।
বাংলার প্রকৃতির সান্নিধ্যে এলেই অলকেশ ঘোষ রং-রেখা মুখস্থ করেন। ক্যানভাসে বাস্তবে দেখা নদী পারাপার, গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাওয়া পথিকের সারি, এই নগরের কোলাহল, রিকশার সারি, পাহাড়ি জনপদের কোলাহল আর সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা জনবসতি তাঁর এ প্রদর্শনীর বিষয়। প্রকৃতির কাছে বারবার শিল্পী ফিরে যান। ১৯৭২ থেকে প্রকৃতির রং-রূপ-রেখা নিয়ে ক্যানভাসে হাজির হন। বান্দরবানের পাহাড়ঘেরা হ্রদের জলে আছড়ে পড়া পাহাড়ি সবুজ আর মেঘের নীল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কাগজে জলরং মাধ্যমে। পালতোলা নৌকার সারি এঁকেছেন জলরঙে। নদীর জলে আকাশের ছায়া স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন ‘সেইলিং বোট’ বা ‘পালতোলা নৌকা’। চরের জমিতে হেঁটেচলা মানুষের সারি সারি মিছিলে যোগ করেছেন দিগন্তের আকাশ। তুরাগ নদের দু-পাশে গাঢ় হালকা সবুজ রঙের ওয়াশ। নদীর জলে ভেসে চলা ইঞ্জিনবোট এঁকেছেন অতি সূক্ষ্ম রেখা ও আলো-ছায়ার ব্যবহারে। অলকেশ ঘোষের বাস্তবধর্মী চিত্রে গতানুগতিক ফটোগ্রাফিক ইমেজের প্রতিরূপ মনে হয় না। কাগজের গায়ে জলরঙের প্রয়োগে নিজস্ব রীতির ছাপ স্পষ্ট। ছবিতে আলো-ছায়ার যথাযথ ব্যবহার ও চিত্রতলে স্পেসের ব্যবস্থাপনায় তিনি সিদ্ধহস্ত। জমিনের কোনো এক স্থানে জলরঙের ধোয়া অথবা তেলরঙের ছবিতে চড়া রঙের প্রলেপ দিয়ে নিজস্বরীতির আভাস রাখেন।
প্রকৃতির ছবির বাইরে এসে এ প্রদর্শনীতে খ্যাতিমান মানুষের প্রতিকৃতি রেখেছেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্গবন্ধুর একাধিক প্রতিকৃতি প্যাস্টেল, চারকোল, জলরং ও পেন্সিল মাধ্যমে এঁকেছেন।
প্রথাগত বাস্তবধর্মী চিত্ররচনায় অলকেশ স্থির হন না। নিজের মতো করে রং প্রয়োগ ছবির গতি আর ক্যানভাসের ব্যবস্থাপনায় অলকেশ সদা মনোযোগী। বিমূর্ত শিল্পকলার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া দুর্বোধ্যতার খেদ হয়তো দর্শক এ প্রদর্শনীতে এসে করবেন না। কিন্তু তিনটি কক্ষের এ গ্যালারির দেয়ালে ১৪৭টি ছবির প্রদর্শনী ভারী বলে মনে হয়েছে। শিল্পী এতে নতুন কোনো ভাবনা আমাদের কাছে হাজির করছেন হয়তো। ব্যতিক্রমী এ আয়োজনে এসে শিল্পবোদ্ধারা মুগ্ধ হবেন নিশ্চিত। প্রদর্শনী শেষ হবে আগামী ৭ এপ্রিল।
অলকেশ ঘোষ :জন্ম ১৯৫০ জামালপুর, বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালে তত্কালীন গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১ সালে আমেরিকার বোস্টনে প্রথম একক প্রদর্শনী করেন। ২০০৭ সালে বেঙ্গল গ্যালারী অব ফাইন আর্টসে দ্বিতীয়; ২০১৩ সালের বর্তমান প্রদর্শনীটি তাঁর তৃতীয় একক প্রদর্শনী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ১০০টিরও বেশি দলীয় প্রদর্শনী এবং ১১টি ছবি চিত্রকর্মশালায় অংশ নেন। ১৯৯০ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিল্পকর্মের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে তিনি স্বাধীন শিল্পী হিসেবে ঢাকায় শিল্পচর্চা করছেন।
